বিএনপিকে চাপে রাখতে সক্রিয় হচ্ছে প্রেশার গ্রুপ, আড়ালেই জামায়াত

  • ধর্মভিত্তিক দলগুলো একত্র, সরকারও দেখছে সুবিধার সম্ভাবনা
আপডেট : ৩০ জুন ২০২৫, ০৮:৩৭ এএম

বিএনপির রাজনীতিকে চাপে রাখতে পরিকল্পিতভাবে একটি প্রেশার গ্রুপ গঠনের চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। এই উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়—যেখানে জামায়াত ইসলামীর সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও দলটি সামনে আসছে না কৌশলগত কারণে। প্রেশার গ্রুপের লক্ষ্য শুধু নির্বাচন নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্যেও প্রভাব রাখা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন একাধিক রাজনৈতিক নেতা ও সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র। তারা জানান, গত শনিবার ঢাকায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসমাবেশ মূলত এই গ্রুপ তৈরিরই আভাস বহন করে। ওই সমাবেশে জামায়াতসহ আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল জনবল দিয়ে সহযোগিতা করে।

তথ্য অনুযায়ী, ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে তারা এক ছাতার নিচে আসার চেষ্টা করছে। ঢাকার মহাসমাবেশে বিভিন্ন দলের উপস্থিতি তার ইঙ্গিতই দেয়। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

সূত্রমতে, জামায়াত এখনো পর্দার অন্তরালেই থাকতে চায়, যাতে পুরো সংগঠনের দায় নিতে না হয়। অন্যদিকে এনসিপি, গণ অধিকার পরিষদসহ নানা রাজনৈতিক দল থেকেও ওই সমাবেশে অংশগ্রহণ করা হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, একটি অন্তর্নিহিত ঐক্য গড়ে উঠছে, যার মাধ্যমে গঠন হতে পারে শক্তিশালী একটি চাপসৃষ্টি দল।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘নির্বাচন বিলম্বিত করার কোনো চেষ্টা দেশের জনগণ মেনে নেবে না। নির্বাচন বিলম্বিত করতে যে ঐক্যের চেষ্টা চলছে, জনদাবির কাছে তা বানের জলের মতো ভেসে যাবে।’

এ নিয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘নির্বাচন যেমন জরুরি, তেমনি একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করাও ভীষণ জরুরি। আমরা নির্বাচনও চাই, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিনির্মাণে সংস্কারও চাই।’ তাঁর ভাষায়, ‘একটি স্থায়ী কাঠামোর বিনির্মাণে নির্বাচন কিছুটা পেছালেও জনগণ আপত্তি তুলবে না। নির্বাচনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো গুরুত্বহীন করে তুললে সংকট থেকেই যাবে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপিকে সরাসরি মোকাবিলা করা কঠিন। ভোট হলেই বিএনপি জিতে যাবে—এমন ধারণা অনেকেরই। বিএনপির ভিতরেও রয়েছে তেমন বিশ্বাস। ফলে যারা ভোটে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম মনে করছে, তারা চাইছে প্রেশার গ্রুপের মাধ্যমে বিএনপির সঙ্গে দর-কষাকষি করতে।

সরকারও মনে করছে, বিএনপিকে সরাসরি প্রতিহত না করে প্রেশার গ্রুপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করাটা হবে বেশি কার্যকর। এতে বিএনপির রাজনৈতিক শক্তিকে ঠেকানো যাবে, আবার নিজেদের শাসনের সময়টুকুও দীর্ঘায়িত করা সম্ভব হবে।

বর্তমানে বিএনপি ছাড়া আর কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন নেই বললেই চলে। তাই জামায়াত, এনসিপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সুবিধা আদায়ে বিএনপির সঙ্গে কৌশলী অবস্থান নিতে চাইছে। যদিও নির্বাচন নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব তৈরি হয়েছে, আবার সেই দূরত্ব ঘোচাতেও উভয়পক্ষ সক্রিয়। অন্তর্বর্তী সরকারসহ অন্য অনেক রাজনৈতিক শক্তিও সেই দূরত্ব কমিয়ে একটি ব্যবস্থাপনামূলক কাঠামো গড়ার স্বার্থে প্রেশার গ্রুপ তৈরিতে আগ্রহী।

প্রায় দুই দশক ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি চায় দ্রুত নির্বাচন—তবে এমনভাবে, যাতে সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক থাকে। তাদের লক্ষ্য, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন আদায় করা। এর পেছনে রয়েছে জনসমর্থনের আত্মবিশ্বাস। তবে প্রেশার গ্রুপ তৈরির খবর তারা গুরুত্ব দিচ্ছে না, কিংবা গুরুত্ব দিলেও প্রকাশ্যে তা আমলে নিচ্ছে না।

তবে, যেসব দল নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না, তারাও এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব পাচ্ছে। জামায়াত, এনসিপি বা অন্তর্বর্তী সরকার বেশি জোর দিচ্ছে ‘সংস্কার’-এর ওপর। নির্বাচনের চাপ মোকাবিলায় তাই প্রেশার গ্রুপকেই এগিয়ে রাখছে তারা।

যদি এনসিপিসহ বিভিন্ন দলকে একত্র করে প্রেশার গ্রুপ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়, তাহলে সেটি বিএনপির ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির নতুন এক ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। তখন জামায়াতসহ অন্যান্য দল নির্বাচন এবং ক্ষমতাবণ্টনসহ নানা ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে দর-কষাকষিতে নামবে। ফলে সরকারও স্বস্তিতে দেশ চালাতে পারবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছে সংশ্লিষ্টরা।

এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘আপনারা যেভাবে টাইমলাইন করে ভোটের দাবি জানাচ্ছেন, ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন চাচ্ছেন, ঠিক সেভাবে টাইমলাইন করে ভোটের দাবির সঙ্গে বিচার ও সংস্কারের দাবিও করুন।’

এ বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, এনসিপির কাছে নির্বাচন দ্বিতীয় বিবেচনায় থাকলেও, তারা চাইছে একটি বৃহত্তর রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে—যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে বিএনপিকে চাপের মুখে ফেলা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত