হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধ অভিযোগ গঠন শুনানি শুরু

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৫, ০৭:১৮ এএম

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে এ কার্যক্রম শুরু হয়।

চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম অভিযোগের পক্ষে শুনানি করেন। আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। এই মামলার কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচার করেছে। তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের ওপর প্রসিকিউশনের শুনানি শেষ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় খরচে নিযুক্ত স্টেট ডিফেন্স অ্যাডভোকেট মো. আমির হোসেনের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী সোমবার পরবর্তী দিন ঠিক করে ট্রাইব্যুনাল। শুনানিতে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতাকে দমাতে সারা দেশে ৩ লাখ ৫ হাজার ৩১১ রাউন্ড গুলি ছোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে শুধু ঢাকায় ছোড়া হয় ৯৫ হাজার ৩১৩ রাউন্ড তাজা বুলেট। শেখ হাসিনা, কামাল ও মামুনের নির্দেশে সারা দেশে পদ্ধতিগতভাবে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।’

এদিকে পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন বলেছেন, ‘আসামিদের নির্দোষ প্রমাণ করে নজির গড়তে চাই।’ তিনি বলেন, ‘এটি একটি ঐতিহাসিক মামলা। আমি এই মামলার নথিপত্র গত ২৫ জুন পেয়েছি। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পাইনি। তা ছাড়া আমি অসুস্থ ছিলাম। তাই আমার প্রস্তুতির জন্য ১৫ দিন সময় প্রয়োজন।’

গতকাল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার ছাড়া অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। সকালে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। শুনানির সময় কাঠগড়ায় নিশ্চুপ ছিলেন সাবেক আইজিপি আবদুুল্লাহ আল মামুন। মামলার এ পর্যায়ে কোনো বক্তব্য না দেওয়ার কথা ট্রাইব্যুনালকে জানান তার আইনজীবী।

শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক পুলিশপ্রধান (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ মোট আট হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার। এর মধ্যে তথ্যসূত্র দুই হাজার ১৮ পৃষ্ঠার, জব্দ তালিকা ও দালিলিক প্রমাণাদি চার হাজার পাঁচ পৃষ্ঠার এবং শহীদদের তালিকার বিবরণ রয়েছে দুই হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠাব্যাপী। সাক্ষী হিসেবে রয়েছেন ৮১ জন।

এর আগে ২৪ জুন এ মামলায় পরবর্তী সময়ে শুনানির জন্য আজকের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেয়। একইসঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে আইনজীবী নিয়োগের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। এ ছাড়াও ১৬ জুন এ মামলায় পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ১ জুন শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।

উল্লেখ্য, এ মামলায় বর্তমানে গ্রেপ্তার রয়েছেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এখনো পলাতক।

গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে প্রথম মামলাটি (মিস কেস বা বিবিধ মামলা) হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। এই মামলাটি ছাড়াও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আরও দুটি মামলা রয়েছে। যার মধ্যে একটি মামলায় আওয়ামী লীগ শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছরে গুম-খুনের ঘটনায় তাকে আসামি করা হয়েছে। অন্য মামলাটি হয়েছে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বওে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকা-ের ঘটনায়।

গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন নির্মূলে আওয়ামী লীগ সরকার, তার দলীয় ক্যাডার ও অনুগত প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে বলে একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ে। জাজ্বল্যমান এসব অপরাধের বিচার অনুষ্ঠিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত