কোনো দেশের রূপকথা হলো সে দেশের মানুষের মুখে মুখে প্রচারিত, বিকশিত ও পরিবর্তিত জাদুময় গল্প, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যায়। রূপকথা হলো স্বপ্ন ও বাস্তবের মোহনীয় এক জগৎ। সুন্দর এক কল্পলোক। পার্থিব জীবনের উপাদান দিয়ে তৈরি হয় সেখানে অপার্থিব হাসি-কান্না, সত্য-মিথ্যা, আনন্দ-বেদনার জগৎ। রূপকথা তাই বাস্তবের উপাদান দিয়ে গঠিত মায়াময় চিরকালীন সৌন্দর্যের এক অমলিন এক জগৎ।
এই গল্পগুলো সেই দেশের মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে। যুগের পর যুগ ধরে লক্ষণ বিচার করে নিজেদের যেসব শক্তি ও দুর্বলতা নির্ণয় করে তারা সে সবই গল্পচ্ছলে জানিয়ে দেয় পরবর্তী প্রজন্মকে।
নিজের উত্তরাধিকারীকে জানানো এই গল্পের প্রাথমিক উদ্দেশ্য থাকলেও এসব গল্প আসলে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-জাতি নির্বিশেষে সবার জন্য শিক্ষণীয় বার্তা বহন করে। তবে শিক্ষণীয় বলতে শুধু রসকষহীন পুঁথিবিদ্যা ভাবলে চরম ভুল হবে। কারণ এই গল্প আনন্দের ফল্গুধারা। আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করা যায় আর শিক্ষণীয় বিষয়টি বুঝতে কোনো কষ্ট করার বা অভিধান ঘাটার প্রয়োজন হয় না।
রূপকথার গল্পের উৎপত্তি সেই প্রাচীনকালে হলেও আজও তাই এর সমাদর রয়েছে। রূপকথার শক্তি এমনই যে, জাতি ধ্বংস হয়ে গেলেও সেই জাতির লোককাহিনি বা রূপকথা থেকে যায়। ‘রেড ইন্ডিয়ান রূপকথা’ বইটিও তুলে ধরেছে এমন কিছু দুর্লভ কাহিনি যেগুলো টিকে আছে কিন্তু সময়ের গহ্বরে হারিয়ে গেছে সেই জাতিটি।
সাদা মানুষের অত্যাচারে ঝাড়েবংশে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া রেড ইন্ডিয়ান জাতির জ্ঞান, দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞার নির্দশন পাওয়া যায় তাদের এ রূপকথাগুলোতে। কী নেই এই রূপকথায়! কল্পনার সীমাহীন ব্যবহার, চিত্তহারী ঘটনাসূত্র, জাদুময় বাস্তবতা, আর পরিশেষে ন্যায়বোধের জয়।
গল্পগুলোর ধরনই এমন যে, শিশুদের পাশাপাশি উপভোগ করতে পারবেন প্রাপ্তবয়স্করাও। রূপকথার গল্প মানেই রাজকন্যা, রাজপুত্র, রাজা-রানী, রাক্ষস- খোক্কস আর দৈত্যি-দানোর গল্প। পরী, পাতালপুরী, জাদুকর, পঙ্খীরাজ ঘোড়া আর ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমির গল্প। শুভ বুদ্ধি আর অশুভ শক্তির যুদ্ধ। কিন্তু শুভ বুদ্ধির মানুষদের সম্মিলিত শক্তির কাছে সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়। এই আশাবাদ জাগরূক রাখা রূপকথার অন্যতম কাজ। রেড ইন্ডিয়ান রূপকথাও এই দায়িত্ব পালন করেছে নিপুণভাবে।
আমীরুল ইসলামের অনুবাদে ‘রেড ইন্ডিয়ান রূপকথা’ বইটিতে রয়েছে মোট সাতটি গল্প। তারার রাজ্যে তারাকুমারী, ভালো লোক আর মন্দ লোক, পাইন গাছের কান্না, এক সুন্দরীর গল্প, সূর্যবীর, ছোট্ট জাদু-নুড়ি, খরগোশ আর হায়েনার গল্প।
তারার দেশের তারাকুমারী গল্পে দেখা যায় এক রেড ইন্ডিয়ান যুবক এলোগান একদিন এক পরীকে দেখে। পরীর রূপে মুগ্ধ হয়ে সে উপায় খোঁজে কীভাবে পরীর দেখা পাওয়া যায়। বৈদ্যের পরামর্শে সে পরীকে পৃথিবীতে ধরে রাখে বটে, কিন্তু নিজের দেশে একদিন সে ঠিকই ফিরে যায়। পরে ছেলের বায়নার কারণে ফিরে এলে এলোগান তার ভুল বুঝতে পেরে পৃথিবী ছেড়ে পাড়ি জমায় পরীর দেশে। কাউকে ভালোবাসলে যে তাকে বন্দি নয়, বরং সবকিছু ছেড়ে তার কাছে যেতে হয় সেটি দেরিতে হলেও বোঝে এলো গান।
বিশে^র অনেক গল্পেই দেখানো হয়, নারীই যত অনর্থের মূল। কিন্তু এক সুন্দরীর গল্প তার ব্যতিক্রম। বরং দেখা যায়, সুন্দরী রূপসী কন্যার জন্যই গ্রামের সরল সাধারণ ছেলের সঙ্গে দেখা হয় অসাধারণ কিছু মানুষের সঙ্গে। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তারা শক্তিশালী জাদুকরকে শুধু পরাজিতই করে না বরং দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানও করে চিরতরে।
সরল সাধারণ ছেলেটি শুধু অন্যের ভালো চেয়েছিল আর মনের দিক থেকে সৎ ছিল। মনের দিক থেকে সৎ আর অন্যদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার ফলে পুরস্কার পেয়েছিল ‘ভালো লোক আর মন্দ লোক’ গল্পের ভালো লোকটাও। আর শাস্তি পেয়েছিল মন্দ লোক। সততাই যে উৎকৃষ্ট পন্থা তা এই গল্পগুলো পড়তে পড়তে ফুটে উঠেছে।
শিশুদের ইতিবাচক মননে গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি প্রয়োজন সেটি এই বইয়ের গল্পগুলোতে ফুটে উঠেছে।
যে কথা মুখস্থ করিয়ে তাদের মনে গেঁথে দেওয়া সম্ভব না সে কথায় মনের অন্তঃস্থলে প্রোথিত হয়ে যায় চিরতরে। গল্পের শক্তি এখানেই। গল্প আমাদের শেখায়, কেউ যদি সৎপথে থাকে, কর্মফলে বিশ্বাস করে এবং সৎ নিয়তে কোনো কাজ করে তাহলে সে সেই কাজে সফল হবেই।
এভাবেই শুভবোধ জাগ্রত রাখে পৃথিবীতে। হয়তো কালের আবর্তে জাতিটি বিলুপ্ত হয়ে যায় কিন্তু নিঃশেষ হয় না। গল্পের মাঝে এবং অর্জিত শিক্ষার মাঝে বেঁচে থাকে, বাঁচিয়ে রাখে।
সুলতানা রাজিয়া
