সরকারি কর্মচারীদের তদন্ত ছাড়া শাস্তি নয়

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৫, ০৬:১২ এএম

কর্মচারীদের আপত্তির মুখে সরকারি চাকরি অধ্যাদেশ সংশোধনের প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। যেখানে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া নারী কর্মচারীদের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।

পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়,  লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে ‘সরকারি চাকরি (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ চূড়ান্ত অনুমোদন করা হয়েছে। তবে অধ্যাদেশের কোন কোন বিষয়গুলো সংশোধন করা হচ্ছে সে বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে কিছু বলা হয়নি।

উপদেষ্টা পরিষদের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকার কর্মচারীদের উদ্বেগের বিষয়টি আমলে নিয়েছে, আশা করা যায়, আর কোনো সমস্যা থাকবে না। প্রস্তাবিত সংশোধনে নারী কর্মচারীদের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। কোনো নারী কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত কমিটিতে একজন নারী কর্মকর্তা রাখতে হবে।

কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি, শৃঙ্খলাভঙ্গ, অসদাচরণসহ বিভিন্ন অপরাধের দায়ে এক মাসের নোটিসে সরকারি কর্মচারীদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার বিধান রেখে গত ২৫ মে সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছিল সরকার। বিদ্যমান অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সরকারের দৃষ্টিতে দোষী কর্মচারীকে দুই দফায় মোট ১৪ দিনের নোটিসে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা নি¤œপদে নামিয়ে দেওয়ার মতো শাস্তির সুযোগ আছে। কর্মচারীদের পক্ষ থেকে এ নিয়ে প্রবল আপত্তি তোলা হয়। গত একমাস ধরে সচিবালয়ে বিক্ষোভ, অবরোধসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন কর্মচারীরা। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার আইনটি সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে গত সপ্তাহে নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে তাদের আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়। কর্মচারীদের দাবি ছিল অধ্যাদেশ পুরোপুরি প্রত্যাহার করা। তা না করে অধ্যাদেশটি প্রণয়নের দেড় মাসের মধ্যে সংশোধন প্রস্তাব অনুমোদন করল সরকার।

এ ছাড়া বৈঠকে নির্মাণাধীন রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পে পারমাণবিক জ্বালানি এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) কর্তৃক ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বরে গৃহীত ‘ব্যবহৃত জ্বালানি ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা বিষয়ক যৌথ কনভেনশনে’ সইয়ের প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়।

অন্যদিকে ‘বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস’ ১৫ মার্চের পরিবর্তে ৩ ডিসেম্বর, ‘আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস ও জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস’ ‘খ’ শ্রেণি হিসেবে অন্তর্ভুক্তকরণ এবং ২ এপ্রিল ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয় বৈঠকে। পাশাপাশি ওআইসি লেবার সেন্টারের সংবিধিতে সই প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।

জাপানের সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আহ্বান : প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিনিয়োগ, মৎস্য, রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা এবং যুব উন্নয়ন বিশেষ করে শিক্ষা ও খেলাধুলা ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে জাপানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) নির্বাহী সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মিয়াজাকি কাতসুরার সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘জাপান সবসময়ই একটি বিশ্বস্ত বন্ধু। আমি সম্প্রতি আপনার দেশ সফর করেছি এবং আমি ও আমার প্রতিনিধিদলের প্রতি যেভাবে আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা দেখানো হয়েছে, তা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।’

মিয়াজাকি জানান, এশিয়ায় বাংলাদেশ জাপানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় জাপানের অব্যাহত সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন ও আহত হয়েছেন, আমরা তাদের জন্য গভীরভাবে শোকাহত।’

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা মাতারবাড়ী প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং এটিকে ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল’ হিসেবে অভিহিত করেন। বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্ভাবনার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি জাপানে জাইকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাকে জানিয়েছি আমরা একটি সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতিতে পরিণত হতে চাই।’

অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশের তরুণদের জন্য জাপানে পড়াশোনার বৃত্তি বাড়ানো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘অনেক তরুণ জাপানে কাজ করতে যেতে চায়। সমস্যা হচ্ছে ভাষা। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি, জাপানি শিক্ষকরা এখানে এসে বা দূরশিক্ষণের মাধ্যমে ভাষা ও কর্মস্থলের আচরণ শেখাতে পারেন।’

প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি একটি দুঃখজনক অবস্থা। হাজার হাজার তরুণ ক্যাম্পে বেড়ে উঠছে কোনো আশা ছাড়াই। তারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে।’

মিয়াজাকি জানান, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জাইকা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারে সহায়তা দিচ্ছে।

তিনি আরও জানান, আইসিটি মানবসম্পদ-বিষয়ক প্রশিক্ষণ চালু করতে জাইকা বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যা উভয় দেশের স্থানীয় সরকার, কোম্পানি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় পরিচালিত হবে।

যুব উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের নারীদের খেলাধুলায় সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মেয়েরা সবখানে জয়লাভ করছে। গতকাল তারা আরেকটি ম্যাচ জিতে চূড়ান্ত পর্বে উঠেছে। আমরা হোস্টেল সুবিধা বাড়াচ্ছি, তবে তাদের স্বাস্থ্য ও প্রশিক্ষণে সহায়তা দরকার।’ এর জবাবে মিয়াজাকি ইতিবাচক সাড়া দিয়ে জানান, জাপান ইতিমধ্যে অনেক দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবক পাঠাচ্ছে এবং নারীদের খেলাধুলায় আরও সহযোগিতার কথা বিবেচনা করবে।

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অর্থনৈতিক সংস্কার, রেলপথ নির্মাণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের ঋণ ও অনুদান চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য জাপানকে ধন্যবাদ জানান এবং আরও বেশিসংখ্যক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তার (ওডিএ) সীমা ৩০০ বিলিয়ন ইয়েন থেকে ৪৫০ বিলিয়ন ইয়েনে বাড়ানোর অনুরোধ জানান।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশ সবসময় জাপানের বন্ধুত্ব ও অবদানের কথা মনে রাখবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত