ঘটা করে ৩২ ক্লাব নিয়ে শুরু হওয়া ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ থেকে ঝড়ে পড়তে হয়েছে এক-তৃতীয়াংশ দলকে। বাকি থাকা আট ক্লাব নিজেদের মুখোমুখি হতে চলেছে কোয়ার্টার ফাইনাল দ্বৈরথে। যার শুরুটা হচ্ছে দুই চমক দেখানো ক্লাব ব্রাজিলের ফ্লুমিনেন্স ও ব্রাজিলিয়ান শেকড়ে গাথা সৌদি আরবের আল হিলালের মধ্য দিয়ে। ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোর কাম্পিং ওয়ার্ল্ড স্টেডিয়ামে আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় সেমিফাইনালের চার আসনের একটি নিশ্চিতের লড়াইয়ে নামবে এ দুদল।
ম্যানচেস্টার সিটির মতো বিশ্বনন্দিত ক্লাবকে হারিয়ে কোয়ার্টারে ওঠা আল হিলাল সৌদির ক্লাব হলেও শেকড় ঘাটতে গেলে ব্রাজিলের নাম চলে আসে। সৌদি প্রিমিয়ার লিগ (২০০৮ সালে নাম পরিবর্তন করে হয় সৌদি প্রো লিগ) তখনো প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, যখন ১৯৭৮ সালে বিশ্ব ফুটবলের এক কিংবদন্তি আল হিলালে যোগ দেন। ১৯৭৮ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার কয়েক মাস পরই রিয়াদে পৌঁছান রিভেলিনো। ‘তখন সৌদিতে ফুটবল কেবল শুরু হচ্ছিল’, সাও পাওলোভিত্তিক সংবাদপত্র ফোলহা দে সাও পাওলোকে বলেছিলেন তিনি। ‘সবাই একই স্টেডিয়ামে অনুশীলন করতাম, যেখানে খেলা হতো। শহরে তিনটি দল ছিল; আমরা সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত প্রতিটি দল এক ঘণ্টা করে অনুশীলনের সুযোগ পেতাম।’ ব্রাজিলের ১৯৭০ বিশ্বকাপজয়ী দলের ১১ নম্বর জার্সিধারী কিংবদন্তি রিভেলিনোর সঙ্গে ছিলেন আরেক ব্রাজিলীয় কিংবদন্তি মারিও জাগালো, যিনি তখন আল হিলালের কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন। এই জুটি তাদের প্রথম মৌসুমেই সৌদি চ্যাম্পিয়ন হন। ‘দ্য ওল্ড উলফ’ নামে পরিচিত জাগালো ওই মৌসুম শেষে ব্রাজিলে ফিরে গেলেও রিভেলিনো আল হিলালে তিনটি মৌসুম কাটান এবং এই ‘ব্লু ওয়েভ’ দলটি এরপর মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ান ফুটবলের এক মহাশক্তিতে পরিণত হয়। এখানেই শেষ হয় রিভেলিনোর উজ্জ্বল ক্যারিয়ার। আজকের দিনে আল হিলালের ব্রাজিলিয়ান চতুষ্টয় মারকোস লিওনার্দো, ম্যালকম, রেনান লোদি এবং কাইও সিজার, এই ক্লাব বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে গর্বের সঙ্গে বহন করছেন প্রায় অর্ধশতকের ব্রাজিলিয়ান ঐতিহ্য।
মজার বিষয় হলো, রিভেলিনো ১৯৭০-এর দশকে ফ্লুমিনেন্সের হয়েই খেলতেন। ১৯৭৫ ও ১৯৭৬ সালে রিও স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে তিনি ক্লাবটির ইতিহাসে জায়গা করে নেন। জাগালোরও রয়েছে ফ্লুমিনেন্সে কোচ হিসেবে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা। আল হিলালে কাটানো সময় নিয়ে রিভেলিনো তখনো নিজেকে উচ্চ মানের খেলোয়াড় ভাবতেন এবং ১৯৮২ বিশ্বকাপে টেলে সান্তানার ব্রাজিল দলে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। তিনি বলেন, ‘সৌদিতে খেলতে খেলতে আমাকে সেলেসাও দলে বিবেচনা করা হয়েছিল এটা সম্মানের ব্যাপার।’
আল হিলালে রিভেলিনোর প্রভাব এতটাই ছিল যে, আল হিলাল এখন পর্যন্ত ৩৭ জন ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় ও ২০ জন কোচ নিয়োগ করেছে। এদের মধ্যে প্রথম ছিলেন পাওলো আমারাল ব্রাজিলের ১৯৫৮ বিশ্বজয়ী দলের ফিটনেস কোচ, যিনি ইতালির জুভেন্টাসেও কাজ করেছেন। শেষ ম্যাচে সিটির বিপক্ষে জয়ে ব্রাজিলিয়ানদের ছিল মারাত্মক ভূমিকা। ম্যালকম দ্বিতীয় গোলটি করে দলকে এগিয়ে নেন এবং তার দুর্দান্ত দৌড়ানোর ক্ষমতা প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে। পরে তিনি কাইও সিজারের সঙ্গে বদলি হন। সিজারের দীর্ঘ পাস ওই চাপ অব্যাহত রাখে। রেনান লোদি রক্ষণে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখান, সেট পিস থেকে জোগান দেন নিখুঁত পাস ও ক্রস। তবে অতিরিক্ত সময়ে শেষ হাসি হাসেন মারকোস লিওনার্দো। হিলালের প্রথম ও চতুর্থ গোলটি করে আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে জায়গা করে নেন। লিওনার্দো বলেন, ‘ম্যাচটি খুব কঠিন ছিল, কিন্তু আমরা জিতে ফিরেছি। এটা ইতিহাসের মুহূর্ত।’ এশিয়ার সবচেয়ে সফল ক্লাব হিসেবে আল হিলালের চারবারের মহাদেশীয় শিরোপার পেছনে রয়েছে এই ব্রাজিলিয়ান শক্তির বড় অবদান। যাদের মধ্যে অনেকেরই রয়েছে ফ্লুমিনেন্সের সঙ্গে যোগসূত্র।
শেষ ষোলোয় ইন্তার মিলানকে হারিয়ে আসা ক্লাবটি শক্তির চেয়ে ঐতিহ্যে ঢের এগিয়ে হিলালের চেয়ে। এবার তারা মুখোমুখি হবে সেই ইন্তারেরই সবশেষ কোচ সিমোন ইনজাঘির কৌশলের। অবশ্য শেষ ১০ ম্যাচ ধরে তারা রয়েছে অপরাজিত। দেশটির ঘরোয়া লিগে এই মুহূর্তে অবস্থান ছয়ে। শীর্ষে থাকা ফ্ল্যামেঙ্গোর চেয়ে পিছিয়ে মাত্র ৪ পয়েন্টে। ফ্ল্যামেঙ্গো অবশ্য শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিয়েছে। ব্রাজিলিয়ান আউটলেট গ্লোবোর তথ্যমতে ফ্লুমিনেন্স এই শেষ আট দলের মধ্যে সবচেয়ে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। দলের তারকাদের বয়সও বেশ। এ মৌসুমেই ফ্লুমিনেন্সে যোগ দিয়েছেন ব্রাজিলের তারকা ডিফেন্ডার থিয়াগো সিলভা। ৪০ ছোঁয়া এই তারকার সঙ্গে ৪৫ দিন পর হাঁটুর ইনজুরি কাটিয়ে একাদশে ফিরেছেন ৩৭ বছরের আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড জার্মান কানো। প্রথম গোলটি আসে তারই হেডারে। বয়সের সঙ্গে আসে অভিজ্ঞতাও। তাই শেষ চারে ওঠার এ দুই দলের লড়াই উত্তেজনা ছড়াবে নিশ্চিতভাবেই।
