এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৫, ০৭:০১ এএম

মৃত্যু অমোঘ, কিন্তু কিছু মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। যেমন দিয়োগো জোটার ক্ষেত্রে হলো। লিভারপুলের পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড দিয়োগো জোটা, যিনি লিভারপুলকে ইংলিশ লিগ শিরোপা জিতিয়ে, পর্তুগালকে নেশনস লিগে চ্যাম্পিয়ন করে ছুটি কাটাচ্ছিলেন। কদিন আগে বিয়ে করেছেন দীর্ঘ দিনের প্রেমিয়াকে। সেই জোটা ২ জুলাই মধ্যরাতে স্পেনে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

জোটা ও তার ছোটা ভাই আন্দ্রে সিলভা ভাড়া করা একটি বিলাসবহুল ল্যাম্বরগিনি উরুস গাড়িতে জামোরার সেরনাদিয়ায় একটা হাইওয়েতে যাচ্ছিলেন। ১২০ কিলোমিটার গতিতে গাড়িটি আরেকটি গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে পেছনের একটি টায়ার ফেটে যায়, গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তা থেকে ছিটকে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গেই গাড়িতে আগুন ধরে যায় এবং তা রাস্তার পাশের জমিতেও ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে পুড়ে ঘটনাস্থলেই দুই ভাইয়ের মৃত্যু হয়। স্থানীয় পুলিশের তথ্যমতে, দুর্ঘটনার সময় গাড়ির গতি ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল এবং অসমান রাস্তায় অতিরিক্ত গতির কারণে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।

ঘটনার পরপরই কাস্তিয়া ও লেওনের ১১২ জরুরি সেবায় একাধিক কল যায়। জরুরি টিম জামোরা প্রাদেশিক দমকল বাহিনী, সিভিল গার্ড ট্রাফিক ইউনিট এবং মেডিকেল টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও গাড়ির আরোহীদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। দুর্ঘটনার পর দগ্ধ দেহ দুটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আনুষ্ঠানিক শনাক্তকরণের জন্য মরদেহ দুটি জামোরার ফরেনসিক ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।

জোটা চলতি মাসে লিভারপুলের প্রি-সিজন ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে চেলসির বিরুদ্ধে চোট পেয়ে দুই মাস মাঠের বাইরে ছিলেন তিনি। ফেরার পরেও বেঞ্চ থেকে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে দলের শিরোপা লড়াইয়ে অবদান রেখেছেন। তার ভাই আন্দ্রে ফেলিপে পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের দল পেনাফিয়েলের হয়ে খেলতেন।

জোটার মৃত্যু বিশ্বাস হচ্ছে না ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর, ‘কিছুতেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। এই তো সেদিন আমরা এক সঙ্গে ছিলাম জাতীয় দলে, এই তো সেদিন তুমি বিয়ে করলে। তোমার পরিবার, স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি রইল আমার সমবেদনা এবং পৃথিবীর সব শক্তি তাদের জন্য কামনা করছি। আমি জানি, তুমি সবসময় তাদের সঙ্গে থাকবে। শান্তিতে বিশ্রাম নাও, দিয়োগো ও আন্দ্রে। আমরা সবাই তোমাকে খুব মিস করব।’

উলভস থেকে জোটাকে লিভারপুলে আনা কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ বলেছেন, ‘এটা এমন এক মুহূর্ত, যেখানে আমি নিজেই ভেঙে পড়ছি। অবশ্যই এর পেছনে কোনো গভীরতর উদ্দেশ্য আছে! কিন্তু আমি তা খুঁজে পাচ্ছি না! আমি গভীরভাবে মর্মাহত। দিয়োগো শুধু অসাধারণ একজন খেলোয়াড়ই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দারুণ বন্ধু, ভালোবাসাপূর্ণ স্বামী এবং যতœশীল বাবা! তোমাকে আমরা সবাই খুব মিস করব!’

জোটার সতীর্থ উরুগুইয়ান ফরোয়ার্ড দারউইন নুনেজ বলেছে, ‘এত কষ্টের মধ্যে সান্ত্বনার কোনো শব্দ নেই। তোমার হাসিমাখা মুখটা মনে রাখব চিরকাল, মাঠের ভেতরে আর বাইরে তুমি ছিলে এক দারুণ সঙ্গী। আমি জানি, তুমি যেখানেই থাকো না কেন, সবসময় তাদের পাশে থাকবে বিশেষ করে তোমার স্ত্রী ও তিন সন্তানদের। চিরশান্তিতে বিশ্রাম নাও, দিয়োগো ও আন্দ্রে।’

সহজাত গোল স্কোরার প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের জন্য আতঙ্ক দিয়োগো জোটা ছিলেন একজন সহজাত গোলস্কোরার। গত কয়েক বছরে লিভারপুলের সাফল্যে এবং পর্তুগালের নেশনস লিগ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

জোটার পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু হয় পর্তুগালের পাসোস দে ফেরেইরায়। সেখান থেকে ২০১৬ সালে যোগ দেন লা লিগায়, আতলেতিকো মাদ্রিদে। তবে প্রথম মৌসুমেই ধারে খেলে যান পোর্তোতে, যেখানে তার ভাই আন্দ্রে সিলভাও জুনিয়র পর্যায়ের খেলোয়াড় ছিলেন।

ইংল্যান্ডে জোটার যাত্রা শুরু হয় ২০১৭ সালে, আতলেতিকো থেকে ধারে উলভসের হয়ে। সেই মৌসুমে ৪৬ ম্যাচে ১৮ গোল করে চ্যাম্পিয়নশিপ জয় ও প্রিমিয়ার লিগে উলভসের ফেরার নায়ক হয়ে ওঠেন জোটা। তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে উলভস তাকে স্থায়ীভাবে দলে নেয়। মোট ১৩১ ম্যাচে ৪৪ গোল করেন তিনি মলিনিউক্সে।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ৪৫ মিলিয়ন পাউন্ডে দিয়োগো জোটাকে লিভারপুলে নিয়ে আসার কারণ জানিয়েছিলেন লিভারপুলের তখনকার কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ, ‘সে আমাদের স্কোয়াডে নানা পজিশনে খেলার অপশন এনে দেয়। মাত্র ২৩ বছর বয়সী, এখনো পূর্ণতা পায়নি, তবে তার মধ্যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।’

জোটার গতি, প্লেসিং, রক্ষণে সহযোগিতা এবং গোল করার নিখুঁত ক্ষমতা লিভারপুলকে দেয় নতুন মাত্রা। ২০২১-২২ মৌসুম ছিল তার ক্যারিয়ারের সেরা, ৫৫ ম্যাচে জোটা করেন ২১ গোল। সব মিলিয়ে লিভারপুলের হয়ে ১৮২ ম্যাচে ৬৫ গোল করেছেন তিনি। এমনকি গত মৌসুমেও ইনজুরির পর ফেরা জোটা গোল করেন নটিংহ্যাম ফরেস্টের বিপক্ষে পরিবর্তিত খেলোয়াড় হিসেবে নামার কয়েক সেকেন্ড পরই। এরপর এভারটনের বিপক্ষে মরসিসাইড ডার্বিতে ‘জোটা-ম্যাজিক’ জয়সূচক গোল এনে দেন। সেই গোলটি ছিল তার খেলোয়াড়ি বুদ্ধিমত্তার প্রতীক, পেনাল্টি বক্সে দুটি স্পর্শে ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেছিলেন দারুণ এক ডান পায়ের শটে। লিভারপুলে তার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া। ক্লপের অলআউট অ্যাটাকিং সিস্টেমে তিনি ছিলেন নিখুঁত ফিট। এমনকি কোচ আর্নে সøটও তাকে প্রাধান্য দিতেন দারউইন নুনেজের ওপর। গত মৌসুমে তার অসাধারণ নৈপুণ্যে লিভারপুল ২০তম লিগ শিরোপা জয় করে।

দলের সুপারস্টার মোহাম্মদ সালাহ হয়তো শিরোনামে থাকতেন, কিন্তু জোটা ছিলেন নির্ভরতার নাম। তার গোল করার ক্ষমতা প্রতিপক্ষ রক্ষণের জন্য ছিল দুঃস্বপ্ন।

পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে ৫০টির মতো ম্যাচ খেলেছেন জোটা। জুনে নেশনস লিগ ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামেন তিনি। টাইব্রেকারে জয় পায় পর্তুগাল। একই মৌসুমে ক্লাব ও দেশের হয়ে দুটি ট্রফি জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন জোটা।

জোটা ছিলেন সেই ধরনের খেলোয়াড়, যিনি মিডিয়ায় খুব বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও মাঠে নিজের কাজটা নিখুঁতভাবে করে যেতেন। সতীর্থদের মধ্যে ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়, সমর্থকদের ভালোবাসায় সিক্ত।

তার হঠাৎ মৃত্যু শুধু লিভারপুল নয়, গোটা ফুটবল দুনিয়ার জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত