মাসে ৮ লাখ কামাচ্ছেন ‘মাস্টারক্লাস’; ছাত্ররা ডাহা ফেল!

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৫, ০৪:২৬ পিএম

বইয়ের নাম ‘সালাহ উদ্দীন’স মাস্টার ক্লাস’। লেখক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দীন। টাকার জোরে মানহীন এক ফ্র্যাঞ্চাইজি আসরে গোটা চারেক শিরোপা জেতা সাবেক মন্ত্রীকন্যার দলের কোচ। বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সিনিয়র সহকারী কোচ সালাহ উদ্দীন। ব্যাটিং শেখানোই তার কাজ, যার জন্য তাকে মাসে মাসে দিতে হচ্ছে ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা। মাস্টার ক্লাস বইয়ের লেখকের ছাত্ররা মাঠের খেলায় ডাহা ফেল। চলতি বছর এখন পর্যন্ত পাঁচটি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। কোনো ম্যাচেই দলীয় রান ২৫০ পার করতে পারেননি সালাহ উদ্দীনের ছাত্ররা। শুধু তাই নয়, পাঁচ ম্যাচের চারটিতে পুরো ৫০ ওভার ব্যাটিংও করতে পারেনি বাংলাদেশ, অলআউট হয়ে গেছে তার আগেই। যেটিতে অলআউট হয়নি, সেই ম্যাচেও গেছে ৯ উইকেট। কথিত ‘দেশসেরা’ কোচের তত্ত্বাবধানে এমন ফল প্রশ্ন তুলছে দেশের কোচদের কার্যকারিতা নিয়েও।

সালাহ উদ্দীন কখনো জাতীয় দলে খেলেননি। ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটেরও খুব চাহিদাসম্পন্ন খেলোয়াড় ছিলেন না খেলোয়াড়ি জীবনে। বেশিরভাগ সময়ই খেলেছেন ভিক্টোরিয়া এবং ব্রাদার্সে। ছিলেন পেস বোলার, তবে নতুন বল তার হাতে উঠত কমই। ওয়ান চেঞ্জ বা থার্ড সিমার হিসেবেই উপযোগিতা ছিল তার। ঢাকা লিগের অনেক পুরনো দর্শকও সালাহ উদ্দীনের বোলিং কীর্তির স্মৃতি মনে করতে পারবেন না। সেই সালাহ উদ্দীনই হয়ে গেছেন বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং কোচ। কিছুদিন আগে, সংবাদ সম্মেলনে তার কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল ক্রিকেটারদের ব্যাটিংয়ের উন্নতি করতে নতুন কী ড্রিল শেখাচ্ছেন? উত্তরে সালাহ উদ্দীনের বক্তব্য ছিল, ‘দেখুন ড্রিলের কথা যদি বলেন, তাহলে আমি ১০০টা ড্রিল এখানে বানিয়ে বানিয়ে করতে পারব। ড্রিল বানানো নতুন কিছু না। আসলে খেলাটা তো মাথায়।’ তবে ক্রিকেট তো আর দাবা খেলা নয় যে পুরোটাই মগজাস্ত্রের লড়াই, শারীরিক প্রশিক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। ফন্টফুটে শট খেলার সমস্যা কিংবা ব্যাকফুটে, পাওয়ার হিটিং অথবা সুইট টাইমিং, সমস্যা সমাধানের জন্য আছে অনেক অনেক ড্রিল, যা ইউটিউবেও পাওয়া যায়। এসব অনুশীলন বারবার করার মাধ্যমেই একজন ব্যাটসম্যান তার সমস্যাগুলো সারিয়ে তুলতে পারেন। সালাহ উদ্দীন এক কথায় সব সমস্যাকে উড়িয়ে দিলেন মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার মোড়ক লাগিয়ে। এমনটাই যদি হতো তাহলে তো ক্রিকেট দলে মনোচিকিৎসকই হতেন সর্বেসর্বা!

ওয়ানডেতে ভালো দল বলে দাবিটা জোরালো ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। যদিও ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ আর ২০২৪ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর সেই দাবি জানানোরও সুযোগ নেই, ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে যে দশে নেমে গিয়েছিল বাংলাদেশ। যেখান থেকে ৯ম স্থানে পদোন্নতি হয়েছে শ্রীলঙ্কাকে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে হারিয়ে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত পাঁচটি ওয়ানডে খেলেছে বাংলাদেশ, সর্বোচ্চ দলীয় ইনিংসটি ২৪৮ রানের। সর্বনিম্ন ১৬৭। পুরো ৫০ ওভার ব্যাট করতে পেরেছে বাংলাদেশ একটি মাত্র ম্যাচেই, রাওয়ালপিন্ডিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আগে ব্যাট করে ৯ উইকেটে ২৩৬ রান। বাকি চার ম্যাচে ইনিংস শেষ হওয়ার দুই বল আগে থেকে শুরু করে ১৪ ওভার আগেও অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলার গোড়ার দিকে বাংলাদেশ দলের প্রধান লক্ষ্য থাকত পুরো ৫০ ওভার ব্যাট করা। প্রথমবার ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলার ২৬ বছর পরে এসেও সেই একই লক্ষ্যেই আটকে আছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসের মতো দলও এক দিনের ম্যাচে ৩০০ বা কাছাকাছি রান করাটাকে অভ্যাসের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

আগামী এক বছরের জন্য বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। ৫০ ওভার ব্যাট করতে না পারা নিয়ে দুশ্চিন্তা তারও, ‘এটা (৫০ ওভার ব্যাট করতে না পারা) অবশ্যই চিন্তার ব্যাপার। এটা নিয়ে কাজ করার অনেক জায়গা আছে। সামনে অনেক খেলা আছে। যেহেতু আমি এই সিরিজে দায়িত্ব পেলাম। আমি চেষ্টা করব কোথায় উন্নতি করা দরকার, সেগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করব কোচের সঙ্গে কথা বলে।’ ওয়ানডে সিরিজ হারের পর পাল্লেকেলেতে বলেছেন সেই চর্বিত চর্বন, যা অতীতে দিনের পর দিন শুনিয়ে গেছেন তার পূর্বসূরীরা, ‘আমরা যারা সেট হচ্ছি তারাই আউট হয়ে যাচ্ছি। খেলাটা মোমেন্টামের ব্যাপার। যে মোমেন্টাম নিচ্ছে সেই আউট হয়ে যাচ্ছে। এই জায়গাতে আমাদের কাজ করা দরকার।’ তবে কী কাজটা করা দরকার সেটা বোধ হয় তার জানা নেই, কারণ ব্যাটিং কোচের কাছে সব সমস্যাই তো মাথায়!

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ব্যাটিংটা বরাবরই দুর্বলতার জায়গা হলেও বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলে ব্যাটিংয়ের জন্য বিশেষজ্ঞ কোচ নিয়োগ দেওয়া নিয়েই হয়েছে সবচেয়ে বড় গাফিলতি। স্পিন বোলিং কোচ হিসেবে ড্যানিয়েল ভেট্টরি, রঙ্গণা হেরাথ কিংবা মুশতাক আহমেদকে দেখা গেছে বাংলাদেশের ড্রেসিং রুমে। পেস বোলিং কোচ হিসেবে কোর্টনি ওয়ালশ, অ্যালান ডোনাল্ড এবং শন টেইটকে। কিন্তু ব্যাটিং? সবশেষ কোনো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যাটসম্যানকে বাংলাদেশের ব্যাটিং কোচ হিসেবে দেখা গেছে তিন বছরের বেশি সময় আগে। দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান অ্যাশওয়েল প্রিন্সকে। এরপর বিসিবি ব্যাটিং কোচ করে অখ্যাত এক ইংলিশ ব্যাটসম্যান জন লুইসকে। যার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার কোনো অভিজ্ঞতা নেই, না আছে বড় কোনো দলে কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা বা সাফল্যের প্রমাণ। এরপর জেমি সিডন্স, নিক পোথাস, ডেভিড হেম্প এমন অনামি সব লোকেদের হাতেই ছিল জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের ব্যাটিংয়ে উন্নতির দায়িত্ব। তারা পকেট ভর্তি করে ডলার নিয়ে গেলেও সাফল্য এসেছে সামান্যই, ব্যাটসম্যানদের পুরনো রোগ সারেনি। অতপর দেশি টোটকার দ্বারস্থ বিসিবি, তবে ছয় মাসে ব্যাটিংয়ের অবস্থা আর নিম্নগামী যে এখন ৫০ ওভার ব্যাটিং করাটাই যেন সাফল্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত