চট্টগ্রামের রাউজান যেন ‘মৃত্যুপুরী’তে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক গ্রুপিং, মাটি-বালু ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে এখানে খুন-খারাবি থামছে না। পাল্টাপাল্টি হত্যাকাণ্ডে বিপর্যস্ত এলাকা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে গত ১০ মাসে ১৪ জন খুন হয়েছেন। এদের মধ্যে ১১ জনই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। নিহতদের তালিকায় রয়েছেন ব্যবসায়ীও। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ, জখম ও অন্যান্যভাবে আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে রাউজানসংলগ্ন রাঙ্গামাটি জেলার বেতবুনিয়া এলাকা থেকে যুবদলকর্মী দিদারুল আলমের (৪০) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নিহত দিদারুল পাঁচ দিন আগে একই উপজেলায় খুন হওয়া যুবদল নেতা সেলিমের অনুসারী ছিলেন। গত ৬ জুলাই কদলপুর ঈষাণ ভট্টেরহাট এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় সেলিমকে (৪২)। পাঁচজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। তাদের মধ্যে তিনজন বোরকা পরা এবং দুজনের মুখে রুমাল মোড়ানো ছিল। প্রত্যেকের হাতে ছিল অস্ত্র। দলীয় সূত্র জানায়, সেলিম ২০২২ সালে গঠিত কমিটিতে ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব ছিলেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৮ আগস্ট থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত রাউজানে ১৪ জন খুন হয়েছেন। এ সময়ে অর্ধশতাধিক গোলাগুলি, সংঘর্ষ, মারামারি ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের দাবি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং ইট-বালু ও মাটির ব্যবসা নিয়ে বিবাদের জেরে এসব ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় ৩৫টিরও বেশি মামলা হয়েছে।
রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘সেলিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন রায়হান ও ধামা ইলিয়াস। বোরকা পরা তিনজনকে শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে।’
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, গুলি, হামলা ও পাল্টাপাল্টি খুন এখন রাউজানের নিত্যদিনের ঘটনা। গত সাড়ে ১০ মাসে খুন হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে যুবদলের পাঁচজন হলেন সেলিম, কমর উদ্দিন, ইব্রাহিম, দিদারুল ও মানিক আবদুল্লাহ। আওয়ামী লীগের চারজন হলেন আবদুল মান্নান, মুহাম্মদ ইউসুফ মিয়া, আবু তাহের ও মুহাম্মদ হাসান। এ ছাড়া জাহাঙ্গীর আলম নামে এক ব্যবসায়ীও খুন হয়েছেন। পাল্টাপাল্টি হত্যাকাণ্ডের কারণে রাউজানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় গত ৯ মাসে থানার তিনজন ওসিকে বদলি করা হয়েছে।
রাউজান নোয়াপাড়ার বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, ‘স্থানীয় ও পুলিশ প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় নিয়মিত হামলা, পাল্টা হামলা ও খুনের ঘটনা ঘটছে।’
গত ১৫ মার্চ যুবদলকর্মী কমর উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার বাবা মো. আলী মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ছেলের হত্যাকারীরা আমিরহাট বাজারে ঘোরাঘুরি করে, কিন্তু পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। সুষ্ঠু বিচারের আশাও করি না।’
স্থানীয় প্রশাসন জানায়, রাউজানের দক্ষিণে প্রবাহিত কর্ণফুলী নদীকেন্দ্রিক বালুমহাল, ইটভাটা, ইট-বালু সরবরাহ ও বিল ভরাটের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। পাহাড়ি সীমান্ত এলাকা হওয়ায় কাঠ, মদ ও কখনো অস্ত্র পাচারের রুট হিসেবে রাউজান ব্যবহৃত হয়। রাজনৈতিক গ্রুপিং ও এসব ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে প্রায়ই খুন-খারাবি ঘটছে।
কদলপুরের বাসিন্দা আমজাদ আলী বলেন, ‘৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও সাবেক এমপি এবিএম ফজলে করিমের পতনের পর রাউজানে শান্তি ফিরবে বলে মানুষ আশা করেছিল। কিন্তু বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির কারণে হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরের ৫ আগস্টের পর বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে শতাধিক সংঘর্ষের ঘটনায় তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
