ভবিষ্যতের মানচিত্র আঁকে ‘সিনকারাজ’ লড়াই

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৫, ০৪:০৭ পিএম

সেন্টার কোর্টের ঘাস তখনও ভেজা, যেমন হয় ভোরের আগে মুহূর্তগুলো। গ্যালারির হাওয়ায় মিশে আছে উন্মত্ততা, উড়ছে টেনিস বলের শব্দ, আর কোথাও এক পুরোনো কাহিনির পুনর্জন্ম। রজার বনাম রাফার স্মৃতি যদি হয় এক বিয়োগান্ত নান্দনিকতা। তবে আজকের সিনার-আলকারাজ সেই অগ্রদূত যুগলের মতো, যারা কাঁধে তুলে নিচ্ছে নতুন দিনের ভার। ভক্তরা তাদের জুটিকে নাম দিয়েছেন ‘সিনকারাজ’। একজন শান্ত, স্থির আগ্নেয়গিরি। অন্যজন দৌড়ে বেড়ানো এক নাচরপাগল আগুনবিন্দু। উইম্বলডনের এই ফাইনাল শুধু শিরোপার লড়াই ছিল না, ছিল দুই বিপরীত শক্তির মহাকাব্য। যে কাব্যের নতুন কবি সিনার। আলকারাজকে হারিয়ে রবিবার রাতে যিনি প্রথমবার জিতলেন উইম্বলডনের শিরোপা।

যখন উইম্বলডনের ঘাসে ট্রফি হাতে উঠে দাঁড়ালেন ইয়ানিক সিনার, তখন তার কণ্ঠে ধ্বনিত হলো প্রথম যে নামটি, তিনি ছিলেন প্রতিপক্ষ কার্লোস আলকারাজ। ‘তোমার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী পাওয়া কঠিন,’ বললেন সিনার, ‘তবে কোর্টের বাইরে আমাদের যে সম্পর্ক, তা আরও দুর্দান্ত। তুমি অনেকবার এই ট্রফি জিতবে, এর মধ্যেই তো দুটো জিতে ফেলেছো।’

আলকারাজের দিকে তাকানো ছিল শুধু ক্যামেরার নয়—সমগ্র সেন্টার কোর্ট যেন চেয়েছিল ম্যাচটি আরেক সেটে গড়াক। যেন এই লড়াইয়ের মহাকাব্যিক টান শেষ না হয় এত তাড়াতাড়ি। কিন্তু সেদিন শক্তিশালী, অবিচল, ধৈর্যশীল—সব রূপেই দেখা গেল সিনারকে। আর তাতেই শেষ হলো আলকারাজের শিরোপা রক্ষা-যাত্রা। এটা ছিল তাদের প্রথম উইম্বলডন ফাইনাল। শেষ হবে কি এটাতেই?

সম্ভাবনা ক্ষীণ। কেননা এই দুই তরুণই এখনকার সময়ের গ্র্যান্ড স্ল্যাম মানচিত্রে সবচেয়ে বড় ছাপ রেখে চলেছে। শেষ সাতটি স্ল্যামের চারটি জিতেছেন সিনার, বাকি তিনটি আলকারাজ। গত মাসে ফ্রেঞ্চ ওপেন ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই কিশোর দেবতা—সিনার সেদিন দুটি সেট ও তিনটি চ্যাম্পিয়নশিপ পয়েন্ট থেকে পিছিয়ে থেকেও হেরেছিলেন এক রুদ্ধশ্বাস দ্বন্দ্বে। এবার উইম্বলডনে প্রতিশোধ নিলেন। এটাই প্রথমবার, আলকারাজ কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনালে হারলেন। আর প্রথম যে তাকে হারাতে পেরেছিলেন, সেই সিনারই।

সংখ্যায় খুব বেশি ফারাক নেই। সিনারের ২০টি শিরোপা, আলকারাজের ২১। স্ল্যামে এগিয়ে আছেন স্প্যানিয়ার্ড, ৫-৪ ব্যবধানে। হেড-টু-হেডে আলকারাজ এখনও ৮-৫-এ এগিয়ে, কিন্তু সিনার এবার থামিয়ে দিয়েছেন পাঁচ ম্যাচের পরাজয়ের ধারাও, থামিয়েছেন আলকারাজের টানা ২৪ ম্যাচ জয়ের যাত্রা।

এই দ্বৈরথের সৌন্দর্য শুধু জয়ে-পরাজয়ে নয়—খেলার মানেও। ১৩টি সাক্ষাতে মাত্র চারটিতে ম্যাচ শেষ হয়েছে সরাসরি সেটে। গ্র্যান্ড স্ল্যামের পাঁচ সাক্ষাতের মধ্যে তিনটিই গিয়েছে পূর্ণ পাঁচ সেটে। প্রথমবার ২০২২ ইউএস ওপেনে লড়েছিল তারা—ম্যাচটি শেষ হয়েছিল প্রায় রাত ৩টায়, পাঁচ ঘণ্টার মহাযুদ্ধে। সর্বশেষ ফ্রেঞ্চ ওপেন ফাইনালটি তো ছিলই প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার গাঁথা—রক্ত, ঘাম, ক্লান্তির শরীরেও সম্মানের হাসি।

কোর্টে সিনার যেন নীরব আগ্নেয়গিরি। চাপা উত্তেজনায় ফেটে পড়েন কখনো ‘লেট’স গো!’ চিৎকারে, আবার কখনো নিজের টিমের দিকে চোখে তীর ছুড়ে। চলনে তার মধ্যে জকোভিচের ছায়া, কর্নারে ছুটে যাওয়া, মাটির কাছাকাছি গ্লাইড করে বল ফিরিয়ে দেওয়া—এইসবেই প্রকাশ পায় তার কৌশলী দৃঢ়তা। উইম্বলডনে আলকারাজের বিপক্ষে তার সার্ভ-ফোরহ্যান্ড জুটি ছিল যেন এক নিখুঁত যন্ত্রণা। তবু সিনার বলেন, ‘আমি এখনো কার্লোসকে দেখেই শেখার চেষ্টা করি। আজও মনে হলো, ও কিছু জায়গায় আমার চেয়ে ভালো করছিল। সেটি নিয়ে কাজ করব আমরা—কারণ ও আবার ফিরে আসবেই।’

অন্যদিকে, আলকারাজ সেই আগুনের হাসি। দুর্দান্ত শট, পয়েন্ট হারালেও মুখে প্রশ্রয়, দৃষ্টিতে দীপ্তি। প্র্যাকটিসেও ভক্তদের ভিড় সামলাতে হয় তাকে। এ যেন রজার ফেদেরারের সৌন্দর্য, রাফার ক্ষুধা, আর নিজের বর্ণিল উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে এক নতুন সংজ্ঞা। বিগ থ্রির সময় শেষ। নাদাল বিদায়, ফেদেরার কবেই। জকোভিচ একা ছিলেন, এবার তিনিও ছায়া হয়ে আসছেন। এই শূন্যতার মধ্যে হঠাৎ দুই তরুণ উঠে এলো—একজন ইতালির পাহাড়ি গ্রাম থেকে, আরেকজন স্পেনের সমুদ্রতীর থেকে।

৮৭-র চ্যাম্পিয়ন প্যাট ক্যাশ বললেন, ‘আগে আমি বলতাম, আন্দ্রে আগাসি পুরুষ টেনিসকে বাঁচিয়েছিলেন। এখন বলব, এই দুইজন আবার বাঁচাচ্ছে আমাদের খেলা।’

জন ম্যাকেনরো মনে করলেন নিজে আর বিয়র্ন বর্গের ফায়ার অ্যান্ড আইস দ্বৈরথ, যেখানে ছিল ৭–৭-এ সমতা।টড উডব্রিজ বললেন, ‘তারা আগের কিংবদন্তিদের গুণ নিয়েছে, কিন্তু আরও একধাপ উপরে নিয়ে গেছে।’

আর সব শেষে রড লেভারের মতো এক কিংবদন্তি যখন বলেন, ‘তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমাদের খেলার জন্য এক উপহার। জয় বা হার, ওরা খেলছে সম্মান আর আনন্দ নিয়ে। এটাই চ্যাম্পিয়নের পরিচয়।’ তখন মনে হয়, সত্যিই—এই লড়াই শুধু ম্যাচ নয়, এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের শুরু।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত