বিশ্বব্যাংকের অর্থ চায়নি সরকারই

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৫, ০৮:৫০ এএম

পদ্মা সেতুর সুবিধার শেষ নেই। কিন্তু প্রশ্নও পাহাড় সমান। দীর্ঘদিনে সেসব প্রশ্ন মিইয়ে যাওয়ার কথা। তা তো হচ্ছেই না, উল্টো আরও নতুন প্রশ্ন উঠছে। অর্থাৎ কিছুতেই বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না দেশের যোগাযোগ কাঠামো বদলে দেওয়া পদ্মা সেতুর।

যার হাতে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন সেই শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর নতুন করে তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আর তদন্তে নামতেই তথ্যের মোড় ঘুরে গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের সবচেয়ে বড় এ সেতুতে এক সময় আওয়ামী লীগ সরকারই বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন চায়নি। কারণ তারা মনে করেছিল, অর্থায়নের সঙ্গে খবরদারিও করবে বিশ্বব্যাংক। ঠিকাদার, পরামর্শক, নদীশাসন, অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণ-নানামুখী কাজে নজরদারি করলে লুটপাট সহজ হবে না। চীন এ সেতু নির্মাণে সহযোগিতার ঘোষণা দেওয়ার পর সরকার আর পিছনে তাকায়নি। তবে বিশ্বব্যাংকের তোলা অভিযোগের তদন্ত করেছে দুদক। কিন্তু সে তদন্ত ছিল লোকদেখানো। দুর্নীতির প্রমাণ জোগারের চেষ্টাই করেননি দুদক কর্মকর্তারা। বরং অভিযুক্তদের রক্ষার চেষ্টা করেছেন। যারা এসব কাগুজে রেকর্ডপত্র তৈরি করেছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে কাজ করছে বিধিবদ্ধ সংস্থা দুদক।

বিশ্বব্যাংকের দাবির মুখে ২০১২ সালে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করে দুদক। তদন্ত শেষে ফাইনাল রিপোর্ট ট্রু (এফআরটি-অভিযোগ সত্য, কিন্তু রেকর্ডপত্র দিয়ে প্রমাণ করা যায়নি) দেয় কমিশন। আর এই রিপোর্ট দেওয়ার মাধ্যমেই অভিযুক্তদের খালাস দেওয়ার পথ সুগম করা হয়।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গত ১ জুলাই নতুন করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। মামলাটি তদন্ত করছেন দুদকের উপপরিচালক তানজীর হাসিব সরকার। আর মামলার তদারক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন পরিচালক মো. কামরুজ্জামান। এবারের তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে কী কারণে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয় বেড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, কারা ষড়যন্ত্র করে বিশ্বব্যাংকের পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ করেছে এবং দুর্নীতির সঙ্গে কারা জড়িত।

নতুন তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার তদন্ত চলমান। আগের তদন্ত কর্মকর্তা যেসব রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করেছিলেন সেগুলোর সঙ্গে আরও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন নতুন তদন্ত কর্মকর্তা। তিনি এখন বিশ্বব্যাংক থেকে তথ্য-প্রমাণ পেতে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স রিকুয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। আশা করি, এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে তদন্ত কাজ শেষ হবে।’

দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাংক জানিয়েছিল এমএলএআর পাঠাতে জটিলতা হলে একটি সংস্থা আরেকটি সংস্থা থেকে লেটার রোটেগরি পদ্ধতির মাধ্যমে ডকুমেন্টস সংগ্রহ করতে পারে। এক্ষেত্রে শুধু আদালতের আদেশ প্রয়োজন হয়। দুদক থেকে এটিও করা হয়নি। বিশ্বব্যাংক চেয়েছিল অফিসিয়ালি যেন ডকুমেন্টস চায় দুদক। কিন্তু দুদক কোনো যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ডকুমেন্টস চায়নি। বিষয়টি নিয়ে কানাডার আদালতে মামলা হয়। সংস্থাটি কানাডার কাছেও কোনো তথ্য-প্রমাণ চেয়ে এমএলএআর পাঠায়নি। দুদকের তৎকালীন উপপরিচালক মির্জা জাহিদুল ইসলাম এ মামলার তদন্ত করেছেন। সরকারের চাপে মামলার তদন্তে অবেহলা করেছেন অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

দুদকের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, দুদক পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির অনুসন্ধানকালে অভিযোগসংক্রান্ত কাগজপত্রের ফটোকপি বিশ্বব্যাংক থেকে সংগ্রহ করে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক যেসব কাগজপত্র দিয়েছিল সেগুলো ছিল তাদের ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট। এ কারণে বিশ্বব্যাংক আগেই জানিয়েছিল ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট আদালতে উপস্থাপন করা যাবে না। বৈশ্বিক এ আর্থিক সংস্থাটি চেয়েছিল মামলার তদন্ত পর্যায়ে দুদক যেন ডকুমেন্টস চেয়ে চিঠি পাঠায়। কারণ কোনো ধরনের চিঠিপত্র ছাড়া তাদের ডকুমেন্ট অন্য কোনো সংস্থাকে দিতে পারে না। কিন্তু দুদক রেকর্ডপত্র চেয়ে চিঠি দেয়নি। অর্থাৎ মামলার তদন্তকালে তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার চেষ্টা করেনি। তৎকালীন যোগযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও তথ্য-প্রমাণ জোগাড়ে দুদক চেষ্টা করেনি।

দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন মনে করেন, গায়ের জোরে পদ্মা সেতুর দুর্নীতি মামলা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির যথেষ্ট উপাদান ও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মামলা থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ ছিল। এটি এখন পুনরুজ্জীবিত করে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। গত ১ জুলাই এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

দুদক চেয়ারম্যান আরও বলেন, আমরা যখন যৌথ মূল্যায়ন করি, পরামর্শদাতাদের যেসব জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) মূল্যায়ন করার কথা ছিল, সেগুলো সেভাবে করা হয়নি। মূল্যায়নের বিভিন্ন জায়গায় যথাযথ প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। মূল্যায়ন কার্যক্রম চলাকালে কমিটির সদস্যদের যেসব সাক্ষাৎ ও তথ্য গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক ছিল, সেগুলো সেভাবে হয়নি। ফলে আমরা মনে করি, আগের যে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে, তা বাধ্য হয়েই হোক, যেভাবেই হোক ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ। এবার আমাদের তদন্তকারী কর্মকর্তা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেদন দাখিল করবেন। তদন্ত করতে গিয়ে যাদের নাম আসবে, আমরা আমাদের মতো করে দেখব। গাফিলতি পেলে আমরা সেটিকে বিবেচনায় আনব। এখন আমরা তদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষা করছি।

পদ্মা একটি বহুমুখী সেতু। এটি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলা এবং শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলা এবং মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার একটি ছোট অংশকে সংযুক্ত করেছে। এ সেতু দেশের স্বল্পোন্নত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। সেতুটি ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধন করা হয়। এই সেতুটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেতুটির উপরের স্তরে একটি চার-লেনের মহাসড়ক এবং নিচের স্তরে একটি একক-ট্র্যাক রেলপথ। পদ্মা নদীর প্রস্থ এবং গভীরতার কারণে এই সেতুর নির্মাণ বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করা হয়েছিল। সেতুটি উদ্বোধনের পর, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পদ্মা সেতু নির্মাণে ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ১৮ মে জাইকা, ২৪ মে আইডিবি এবং ৬ জুন এডিবির সঙ্গে চুক্তি হয়। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতি হয়েছে অভিযোগ তোলে বিশ্বব্যাংক। অভিযোগে বলা হয়, কানাডার কনস্ট্রাকশন কোম্পানি এসএনসি লাভালিন কাজ পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের মন্ত্রী, সেতু সচিব, সেতু প্রকল্পের পিডিসহ অন্য কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়েছেন। বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানায়। ঘটনাটি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ইস্তফা দেন এবং তৎকালীন সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে বদলি করা হয়। একপর্যায়ে মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে জেলে যেতে হয়। প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়া হয়। দুদকের অনুসন্ধান নিরপেক্ষ হয়নি জানিয়ে ২০১২ সালের ২৯ জুন বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করে। এরপর ১৮ মে জাইকা, ২৪ মে আইডিবি এবং ৬ জুন এডিবি তাদের ঋণচুক্তি বাতিল করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত