দ্যুতিময় উসকানির গল্প

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৫, ১২:২৭ এএম

এ  সময়ে এগিয়ে থাকা শক্তিমান লেখকদের মধ্যে কবি ও সম্পাদক মাহবুব আজীজ অন্যতম। তিনি লেখেন কয়েক হাতে, লেখান অর্থাৎ সম্পাদনা করেন আরও কয়েক হাতে। তার কবিতা আগেই পড়েছি, এবার গল্প পড়লাম। অমীমাংসিত বইটির প্রচ্ছদের মতোই এর গল্পগুলো সুন্দর সামাজিক ও রাজনৈতিক, তুমুল প্রেমের ও মননের, ব্যক্তিগত কিংবা নৈর্ব্যক্তিক। সমাজকে দেখার এমন আয়োজন; স্খলন, বিচলন এবং পরিবর্তনকে জানার একটা প্রয়াস, ব্যক্তিজীবন ও তার মনোজগতের উত্থান-পতন, সম্পর্কের টানাপড়েন যা অসহনীয়, যা ঘনিষ্ঠভাবে নাগরিক, কখনো কখনো তা মফস্বলীয়, বাস্তবতা অকল্পিত, অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতায় ভরা অন্তর্জগৎ, মাঝে মাঝে পরাবাস্তবতাও উঁকি দিয়ে যায়। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন, ‘মাহবুব আজীজের গল্প পড়তে বসা আর নিজের চারপাশ একটা চক্কর দিয়ে আসার মতোই, সবই চেনা, সবই জানা, কিন্তু তার গল্পের রসায়ন যখন এই চেনা-জানার মূল ধরে টান দেয়, ভেতরমাত্রার দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে, পাঠকের জন্য বিস্ময় জমা হতে থাকে।’       

বইয়ের নামগল্পটি পড়ে একদম অভিভূত। এমন প্রেমময়, আকুতিপূর্ণ হৃদয়ছোঁয়া গল্প বহুদিন পর পড়লাম। নারী হৃদয়ের গহন কোণ উন্মোচনের, এমন করে প্রেমের শরীর খোঁজার ও ছোঁয়ার টানটান হাতছানি আহা মরি মরি। ধরা দিয়েও দেয় না ধরা, ধরা দেওয়ার জন্য সমূলে তৈরি হওয়া, কিংবা অপরপক্ষকে তৈরি করার নিগূঢ় মমতার পরশ গল্পের বাঁকে বাঁকে, ফাঁকে ফাঁকে সত্য ও সম্মোহনের ছবি আঁকা যেন। অনুসূয়ার মধ্যে ‘কবি’ উপন্যাসের খানিকটা ঠাকুরঝি, খানিকটা বসন্ত মিলেমিশে একাকার। আর সত্যব্রত ভট্টাচার্য যেন পুরুষতন্ত্রের ধ্বজাধারী; নারীকে বাসাবন্দি করতে, সন্তান পালনের দাসী বানাতে, ঘরের কাজের শ্রমিক বানাতে বদ্ধপরিকর। তবু ভয়কে পাশ কাটিয়ে, নয়-কে জয় করতে আগ্নেয়গিরির মতো জ¦লে ওঠার প্রত্যয়ে অনসূয়া অফুরন্ত, কারণ ‘প্রেমের তৃষ্ণা মরে না জীবনে! আগুন... আগুন; শরীর মানে আগুন।’ অনসূয়ার প্রেমে মোচড় দিয়ে ওঠে অপ্রেমিকের হৃদয়ও। শৈল্পিক গল্পের বৈশিষ্ট্যে ‘অমীমাংসিত’ অনবদ্য।

‘আমাদের অন্তহীন কলহ’ এখানে আছে নাগরিক কলুষহীন প্রেম, যা যন্ত্রণা দেয় দুজনকে, আবার দুজনকেই কাছে টেনে আনে নিবিড়ভাবে। সামাজিক অবস্থান, চাকরির জৌলুস, পারিবারিক চাপ, কোনো কিছুই আটকাতে পারে না তাদের। এ শহরের ফুটপাতে, বিশ^বিদ্যালয়ের বারান্দায়, চিলেকোঠা এসব প্রেমে একাকার; অস্থিরতা থেকে স্বস্তির পয়গাম ছড়িয়ে দেওয়া শান্তির সাদা পায়রা উড়ে যায় দিগন্ত পেরিয়ে, শ্রাবণের বৃষ্টির মতো ভালোবাসা শরীরে ও আত্মায় ঝরতে থাকে অবিরাম। এমন অস্থির, মাখোমাখো প্রেমময় গল্প, সাধু সাধু!

‘দাগ’ গল্পটি সাংসারিক ব্যস্ততায় দিশাহারা কিংবা ভোঁতা হয়ে যাওয়া জীবন থেকে বেরিয়ে এসে দুজন মানুষের নিজেদের নতুন করে দেখার কথন। ফেলে আসা বিশ^বিদ্যালয় জীবন, দূর থেকে দেখা ভালোলাগা, অনেক পরে এসে যেন কূল খুঁজে পায়। তরতরিয়ে এগোতে থাকে সময়, বড় হতে থাকে গলিপথ, অবারিত প্রেমের টানে কাছাকাছি চলে আসে দুটি হৃদয়, অথচ তাদের সংসার আছে, সন্তান আছে। মানুষের চিন্তা চাপা থাকে না, আর প্রেম তো বারুদের মতো। তাই না চাইলেও চিহ্ন প্রকট হয়ে ওঠে। এ গল্পটা খুব চেনা, নাগরিক সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গল্পটা পড়ার সময় প্রেম বুকের নরমে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়।

বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয়, শক্তিশালী গল্পের নাম ‘বাস্তুভিটা।’ ধর্মের নামে মানুষকে অনৈতিকভাবে উচ্ছেদ করার মধ্য দিয়ে জমি দখল, ক্ষেত দখলের রাজনীতি ভারতীয় উপমহাদেশে নতুন নয়। ঘরে আগুন দিয়ে, মেয়েদের উত্ত্যক্ত বা ভয় দেখিয়ে হিন্দু তাড়ানোর কৌশলে এদেশের রাজনীতিবিদ, মৌলবাদী শক্তি খুব পারদর্শী। বাইরে অসাম্প্রদায়িক, দিনের বেলায় বন্ধু, রাতের আঁধারে আরফান মুন্সী, টিটু সাহেবদের মতো মানুষেরা মিলেমিশে একাকার। ‘এত বড় বাস্তুভিটা! হেহেহে... কিসসু পামু না! হয়?’ সাদত হোসেন মান্টো কিংবা কৃষণ চন্দরের গল্পের মতো ‘বাস্তুভিটা’ স্বতন্ত্র ও ধ্রপদি হয়ে ওঠার দৃপ্ত অঙ্গীকারে বলিষ্ঠ।

 ‘মর্ম’ গল্পের বিষয় পরিচিত। প্রেমের টানে দুই ধর্মের দুজন মানুষের এক হওয়া, শেষমেশ সংখ্যাগুরুর চাপে, সন্তানদের বড় হওয়ার ঝক্কি সামলাতে হিমশিম খেয়ে হিন্দু ছেলেটা নিজের ধর্মত্যাগ করতে বাধ্য হওয়া প্রেক্ষাপট হলেও গল্পটার আবেদন আরও একটুখানি এগিয়ে সাহিত্য ভালোবেসে পড়াশোনায় হেলাফেলা করা, প্রেমে পড়া, সংসার পাতা, তারপর সংসার ও সাহিত্য দুটোকেই এগিয়ে নিতে এটা-ওটা করে ব্যর্থ হওয়ার চেয়ে হিন্দু-মুসলিমের মধুর সম্পর্ককে প্রকট করা লেখকের অন্যতম উদ্দেশ্য। কারণ, এই বাংলাদেশ সব ধর্মের মানুষের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে, বহুত্ববাদ, বৈচিত্র্যময় উৎসবের আমেজ থেকে সরে সরে যাচ্ছে দিনকে দিন। অথচ বাঙালির ঐতিহ্যে, ধর্মীয় গ্রন্থে সাম্প্রদায়িকতার কোনো জায়গা নেই।

‘ফেরা’ গল্পটি বন্ধুত্বের, স্মৃতিময়তার যা অনেকের সঙ্গে মিলে যাবে। লেখকের আত্মকথন পাঠকের অন্দরে এমন করে প্রবেশ করবে, যা দুঃখ-ক্ষোভ জাগানিয়া। রাজনীতির নামে মানুষ মারার সে সব দিন আজও সমানভাবে বহমান, যা কেবল ফিরে ফিরে আসে ছাত্রদের জীবনে, বিরোধী দলের কর্মীর ওপরে। কিন্তু এই মৃত্যুতে ফেরা নাকি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অন্য কোথাও ফেরা লেখক প্রশ্ন তুলেছেন! ‘আমাদের ফেরা হয় আসলেই কোথাও! নাকি ফিরে আসার চেষ্টাতেই একেকটি জীবন আমরা পার করে দিই!’ গল্পে লেখকের দার্শনিক সত্তার উন্মেষ লক্ষণীয়।

‘ঠিক দুপুরবেলা’ গল্পটি জীবনের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, যা ঘটেছে মধ্যাহ্নে, সে সব স্মৃতিকাতর দিনের মন্থন। গল্পে লেখকের ব্যক্তিজীবন আদুরে, নিবিষ্টতায় চমকপ্রদ। দুপুরের তপ্ত রোদের মতো মানুষের জীবন, ক্লান্তি, শ্রান্তি, একঘেয়েমিতে ভরপুর কেমন জানি ফাঁকা, ত্রুটিপূর্ণ, রোদের গুঁড়োর মতো আস্তে আস্তে মিইয়ে যায়। তখন, ‘জীবনের হিসাব-নিকাশ মাথা তুলে দাঁড়ায়। যাওয়ার সময় হলো, সব ঠিকঠাক তো? ক্লান্তিতে দুচোখ ভরে আসে।’ গল্পটা পড়তে পড়তে অতীতে ফিরে যাওয়ার, স্তম্ভিত হওয়ার অবকাশ প্রচণ্ড।

কার্টুনে সমকালীন রাজনীতির নিপুণ ভাষ্যকার শিশির ভট্টাচার্য হলেন ‘আসন্ন ছোটগল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র’ গল্পের প্লট। এই গুণীর শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যাপিতজীবন, শিল্পিত জীবনের নানা দিক কথোপকথনের মাধ্যমে উঠে এসেছে। গল্প নির্মাণ করার চেয়ে শিল্পী শিশির ভট্টাচার্যকে ধরার প্রচেষ্টায় নিবিষ্ট ছিলেন লেখক।

নাগরিক মধ্যবিত্ত সমাজ ভালো নেই। আগেও ছিল না, এখন আরও বেশি করে নিই। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের তুলনামূলক ফারাকের জন্য সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। ‘তখন আমরা কথা বলি না’ গল্পে একজন ব্যাংকার নজরুল ইসলাম এবং বেকার জাকির হোসেনের ঘুরে দাঁড়ানোর কর্মপ্রচেষ্টার নানাবিধ বিষয় এসেছে, যা প্রেয়ণাকর, কখনো কখনো বেদনাকরও বটে। কিন্তু মানুষ স্বাধীন নয়, রোগ-দুর্ঘটনা মানুষকে নিঃশেষের পথে টেনে নেয়। তখন কাছের মানুষের কিছু করার থাকে না। প্রশ্ন জাগে ‘জীবনের মানে কী তবে! এত আয়োজন, এত উদ্যোগ, এত হুল্লোড় এত প্রাণ!’

‘চাঁদজ¦লা রাতে’ একটা হৃদয়বিদারক গল্প। ভালো লাগা, ভালোবাসা কখন কীভাবে আসে, কে কাকে কীভাবে পেয়ে যায়, পাওয়ার জন্য কত হীনতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা চিরদিন গোপন থাকে না। ভালোবাসার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করার পরও সেই মানুষটিও যখন ক্ষমতার জন্য প্রিয়জনকে দূরে সরিয়ে দেয়, ধ্বংস করে দেয় সময় হারানো জীবন, তখন আর কীই-বা করার থাকে। এ গল্পে দেখা যাবে, শয়তান মানুষ, খারাপ মানুষ কখনো মরে না, ভালোরা পাগল হয়, মরে যায়, আর খারাপের পাশে আরেকটা খারাপ তৈরি হয়। গল্পটি ভাবনায় যাতনা তৈরি করে। যাতনায় বিদীর্ণ করে অশ্রুর অংশে বপন করে,

‘পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই, কিছু নেই।’ একটা ধাক্কা, এক বুক হাহাকার, ঘৃণাবোধ পাঠককে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে।     

‘অমীমাংসিত’ বইয়ের গল্পগুলোর ভাষা সাবলীল, তীক্ষè, গতিময় ও নান্দনিক। নিতান্তই চেনা পরিপার্শ্ব ঘিরে চরিত্রের অন্দরমহলের আলো-অন্ধকার বয়নে শিল্পীত অনুশীলন, যা আলাদা যা স্বকীয় ইঙ্গিত ও অর্থে পরিপূর্ণ। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্ভাসিত লেখক গল্পে নিজের উপস্থিতি বজায় রাখেন দৃঢ়তায়। অনিশ্চয়তা, প্রতিকূলতা পেরিয়ে বেঁচে থাকার আনন্দে বেশিরভাগ চরিত্র প্রাণময়তায় ভরপুর। যৌনতার মৌনতা গভীর, আবেগ ও অনুভূতির স্মিতহাস্য তীব্র, সরলরৈখিক কাঠামোয় অতলস্পর্শী। অন্বেষা, সংঘাত ও জটিলতা রূপায়ণে শৈল্পিক একাগ্রতা, আকর্ষণীয় চরিত্রসৃষ্টি, মানুষের মনের গভীরে আলো ফেলতে পারার সক্ষমতা, যা গ্রেয়াম গ্রিনের সঙ্গে তুল্য।  মাহবুব আজীজের গল্প সহজ অথচ গভীর, ভাবায় এবং তাড়িয়ে বেড়ায়, বারবার পড়তে নানারকম উসকানি দেয়। মাহবুব আজীজের উসকানিসমূহ পাঠককুলে ছড়িয়ে পড়ুক। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত