প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন জেলা পাবনার ৩০ লাখ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র অবলম্বন ২৫০ শয্যা পাবনা জেনারেল হাসপাতাল। বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন এ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভিড় করে গড়ে দুই হাজার রোগী। তবে নানা সংকটে জর্জরিত হাসপাতালটিতে যেন নেই আর নেই। ফলে কাক্সিক্ষত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। দালালের খপ্পরে পড়ে হচ্ছেন প্রতারিত। প্যাথলজি পরীক্ষার সুযোগ থাকলেও উপকরণ সংকটে সেবা পায় মাত্র ২০ শতাংশ রোগী। মেলে না বিনামূল্যের ওষুধও।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, দক্ষ লোকবল ও চিকিৎসা উপকরণের সংকটে প্রত্যাশিত সেবা মিলছে না পাবনা জেনারেল হাসপাতালে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকায় উদ্বোধনের ৯ বছরেও চালু হয়নি আইসিইউ। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্যাথলজি পরীক্ষার উপকরণ। ফিল্মসংকটে অধিকাংশ সময়ই বন্ধ থাকে অত্যাধুনিক এক্সরে ও সিটি স্ক্যান মেশিনের পরীক্ষাও। ফলে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে রোগীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৬ সালে হাসপাতালের পুরাতন ভবনের দোতলায় সাড়ম্বরে উদ্বোধন করা হয় পাবনা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিট। তবে প্রয়োজনীয় লোকবল ও সংযোজক যন্ত্রাংশ না থাকায় তা আজও চালু করা সম্ভব হয়নি। হৃদরোগীদের জন্য ২০ শয্যার সিসিইউ চালু থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় সেবা দেওয়া যায় আট রোগীকে। কারিগরি সুবিধা না থাকায় অকার্যকর পোস্ট অপারেটিভ ইউনিট। জেনারেটর ব্যবস্থা থাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ হলে থেমে যায় অপারেশনও।
পাবনা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আইসিইউ পরিচালনার জন্য যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো সংযোজনের প্রয়োজনীয় অনেক সরঞ্জাম আমাদের নেই। অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে সিসিইউ ইউনিটে ২০ শয্যা আমরা সম্প্রসারণ করেছি। কিন্তু মনিটরসহ অনেক যন্ত্রাংশ না থাকায় তার সুফল মিলছে না। অনেক যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে, বরাদ্দ সংকটে তা নতুন করে কেনা সম্ভব হয়নি। আমরা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে চাই কিন্তু সীমাবদ্ধতায় অনেক ক্ষেত্রেই গুরুতর রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।’
পাবনা জেনারেল হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আইসিইউ পরিচালনায় একটি সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষিত দলের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীসহ সে ধরনের দক্ষ জনবল আমরা কখনোই বরাদ্দ পাইনি। নামমাত্র আইসিইউ উদ্বোধন হলেও তা কখনোই চালু করা যায়নি। আমাদের হাসপাতালে পোস্ট অপারেটিভ ইউনিটই তো নেই। দক্ষ জনবল, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অভাবে অপারেশনের সময় নানা সমস্যায় পড়েন চিকিৎসকরা। এমনকি বিদ্যুৎ চলে গেলে অপারেশন বন্ধ করে বসে থাকতে হয়। জেনারেটর অকেজো। স্পর্শকাতর এ বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান জরুরি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বারবার চিঠি দিয়েছে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা দীর্ঘদিনেও সুরাহা হয়নি।
এদিকে মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসায় রোগ নির্ণয়ে হাসপাতালে অত্যাধুনিক সিটি স্ক্যান ও এক্সরে মেশিন থাকার পরও ফিল্মসংকটে বছরের অধিকাংশ সময়ই তা থাকে বন্ধ। ফলে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণসহ গুরুতর রোগীদের পরীক্ষায় সময়ক্ষেপণ ও বাড়তি অর্থ খরচে বাইরে যেতে হয়। গুরুতর রোগীকে ঢাকা রাজশাহী নিতে ভোগান্তিতে পড়েন রোগীরা।’
সদর উপজেলার দোগাছি থেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সত্তরোর্ধ্ব রোগী আব্দুস সালাম বলেন, ‘পেটে ব্যথার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেছিলাম। মাত্র একটি পরীক্ষা হাসপাতাল থেকে করা সম্ভব হয়েছে। ওষুধও পাইনি। আমরা গরিব মানুষ। কম পয়সার জন্য সরকারি হাসপাতালে আসি। সব পরীক্ষা যদি বাইরে থেকেই করাতে হয়, তাহলে হাসপাতাল থেকে লাভ কী?’
চাটমোহর থেকে আসা রোগীর স্বজন মামুন হোসেন বলেন, ‘গুরুতর রোগী নিয়ে হাসপাতালে এলেই ঢাকা কিংবা রাজশাহী রেফার করা হয়। সংকটাপন্ন রোগীদের দূর গন্তব্যে নিতে যে সময় ব্যয় হয়, তাতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যায়। এর একটা প্রতিকার হওয়া প্রয়োজন।’
