ভিক্ষার চালে ‘পাগল’ ছেলের মুখে ভাত

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৫, ০৮:১৩ এএম

৩৭ বছরের যুবক সাইফুল মানসিক ভারসাম্যহীন; ৩০ বছর ধরে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন, তার পায়ে লোহার শিকল বাঁধা। সাইফুলকে নিয়ে অসহায় জীবনযাপন করছেন মা রহিমা বেগম। রহিমা বেগমের স্বামী বহর আলী প্রায় ২০ বছর আগে মারা গেছেন। জমিজমা হারিয়ে রহিমা বেগম পথেঘাটে ভিক্ষা করে মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন।

সাইফুল টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ধারিয়াল গ্রামের মৃত বহর আলীর ছেলে। অভাবের সংসারে ১৯৮৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ধারিয়াল গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, ঘরের বারান্দার খুঁটির সঙ্গে পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে সাইফুলকে। কখনো দাঁড়িয়ে কখনো বসে সময় কাটে তার। বারান্দায়, মাটিতেই তার বিছানা পাতা রয়েছে। কখনো সেখানে শুয়ে থাকেন তিনি। শিকল খুলে দিলেই মানুষকে কামড়ে দিতে চান সাইফুল। যাকে সামনে পান তাকেই ঝাপটে ধরেন।

এলাকাবাসী জানিয়েছে, সুযোগ পেলে কাপড়চোপড় খুলে ঘুরে বেড়ান সাইফুল। তার মা রহিমা বেগম বলেন, ‘জন্মের পর থেকে মানুষ দেখলে চেয়ে থাকত সে। ছোটবেলা থেকেই কথা ঠিকমতো বলতে পারে না। সাত বছর বয়স থেকে মানুষের দিকে শুধু চেয়ে থাকা নয়, খামচি ও কামড় দেওয়ারও চেষ্টা করত। ছোটবেলায় তার অসুস্থতার লক্ষণ আমরা বুঝতে পারিনি।’ তিনি আরও বলেন, একসময় এলাকাবাসী তার আচরণে ভয় পেতে শুরু করে। যখন তার বয়স আট বছর তখন পায়ে লোহার শিকল পরিয়ে দেওয়া হয়। এখনো আছে। শিকল খুলে দিলেই বড় বড় চোখ করে মানুষের দিকে এগিয়ে যায়। অনেক ডাক্তার-কবিরাজের পেছনে ঘুরেছি, কিন্তু চিকিৎসা করাতে পারিনি। ডাক্তার-কবিরাজরা রোগ ধরতে পারেননি, তাই পাবনা মানসিক হাসপাতালে পাঠানোর কথা ভেবেছিলাম। হাসপাতালে কে নিয়ে যাবে? এ চিন্তা করেই সেখানে আর নেওয়া হয়নি। আমার স্বামী ২০ বছর আগে মারা গেছে।’

রহিমা বেগম বলেন, পথেঘাটে ভিক্ষা করে ছেলেকে খাওয়াচ্ছি। সরকারের দেওয়া ঘরে আছি। সরকার ছেলের নামে ২৫০০ টাকা ও আমার নামে ১৮০০ টাকা ভাতা দেয়। এ টাকা দিয়ে সংসার চলে না। তাই চিকিৎসার চিন্তা বাদ দিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।’

স্থানীয় বাসিন্দা নাজিম বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সাইফুল মানসিক ভারসাম্যহীন। তিন-চার বছর ধরে তার পাগলামি বেড়ে গেছে। শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে। বৃদ্ধা মা তার সেবাযতœ করে। গ্রামের মানুষ যতটুকু পারছে করছে।’

ধারিয়াল জামে মসজিদের সেক্রেটারি সুমন আল মামুন বলেন, ‘সাইফুল ৩০ বছর ধরে শিকলে বন্দি। অসহায় জীবনযাপন করছে সে। তার মা পথেঘাটে ভিক্ষা করে কোনোরকম আহার জোগাড় করে তার মুখে তুলে দেয়। আমরা তাকে যতটুকু পারি সাহায্য করছি। শিকল খুলে দিলেই সাইফুল পাগলামি শুরু করে। শিশুরা তাকে দেখলে ভয় পায়। তাছাড়া সে ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে। বাধ্য হয়ে তার মা তাকে শিখলে বেঁধে রেখেছেন। সরকার যদি তার থাকার ব্যবস্থা ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে আমরা কৃতজ্ঞ থাকব।’

ঘাটাইল পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জালাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের সমবয়সী হবে সাইফুল। ছোটবেলা থেকেই তার মানসিক সমস্যা। দারিদ্র্যের কারণে সঠিক সময়ে তার চিকিৎসা হয়নি। সাইফুল বড় হলে তার রোগটিও প্রকট হয়। শিকল থেকে ছেড়ে দিলেই মানুষকে কামড় দিতে যায়। যাকে সামনে পায় তাকে ঝাপটে ধরে। সুযোগ পেলে শরীরের কাপড়চোপড় খুলে ঘুরে বেড়ায়। এজন্য এলাকাবাসী তাকে শিকলে বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করেছে। অন্য কোনো উপায় তাদের হাতে নেই।’

ঘাটাইল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান সরকার বলেন, ‘সাইফুল ও তার মার বিষয়টি জেনেছি। তাকে প্রতিবন্ধী ভাতা ও তার মাকে ভাতা করে দিয়েছি। আমাদের এর বেশি সুযোগ নেই।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাঈদ বলেন, ‘সাইফুল ভাতার আওতায় রয়েছেন। ভাতাভুক্ত থাকার পরও যদি তার চলতে কষ্ট হয় তাহলে উপজেলা প্রশাসন অবশ্যই তার পাশে দাঁড়াবে। তার পুনর্বাসনের জন্য যা যা করা দরকার আমরা করব। আমি জেনেছি, তার মা ভিক্ষা করছেন। আমাদের কাছে তাকে সহযোগিতার সুযোগ আছে। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে অবশ্যই তাকে প্রশাসন সহযোগিতা করবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত