যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানিতে যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে, তা হ্রাস করার বিষয়ে দর-কষাকষিতে দুর্বলতা ছিল। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্কসহ বাণিজ্য আলোচনায় বাংলাদেশে পিছিয়ে গেছে। দর-কষাকষি নিয়ে সরকার কী করছে বা হালনাগাদ কী অগ্রগতি আছে, তা ব্যবসায়ীদের জানানো হয়নি। গত ৪০ বছরে ব্যবসায়ীরা এমন সংকটের মুখোমুখি হয়নি। এটি এমন এক সমন্বয়হীন সরকার, যার বিভিন্ন কাজের নেতৃত্বে কে আছেন, এটা বোঝা যায় না। এমন পরিস্থিতিতে পাল্টা শুল্কের বিষয়ে দেনদরবার করার জন্য লবিস্ট নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
গতকাল রবিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক : কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা এমন বক্তব্য তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য তুলে ধরতে গিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘বাংলাদেশের দর-কষাকষির অভিজ্ঞতা নেই। পাল্টা শুল্ক অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দর কষাকষি হতাশ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, মালয়েশিয়া নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ) থাকা সত্ত্বেও তারা জটিল ইস্যুগুলো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করছে।
অনুষ্ঠানে সেলিম রায়হান আরও বলেন, বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা জটিল। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতের সঙ্গেও রয়েছে নানা জটিলতা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূকৌশলগত অবস্থান ও চিন্তাভাবনার সঙ্গে আমাদের ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ প্রসঙ্গে সানেম নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান তার প্রারম্ভিক বক্তব্যে বলেন, ‘বিশ্বায়নের এই নতুন পর্বে যেখানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও কৌশলগত অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেখানে বাংলাদেশকে বুঝতে হবে ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা কোথায় আছে। কোন কোন পণ্যে বা খাতে আমরা যুক্তরাষ্ট্রে ইতিবাচক অবস্থান নিতে পারি।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্কসহ বাণিজ্য আলোচনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর। যদিও তিনি মনে করেন, আলোচনা ও দর-কষাকষির জায়গা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রে জুতা ও উপকরণ রপ্তানি করি। এসব পণ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্র একক বৃহত্তম বাজার। সেখানে প্রতিবছর আমাদের প্রায় ৪০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়।’ নাসিম মঞ্জুর আরও বলেন, ‘তার চেয়েও বড় বিষয়, সেখানে প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি। এক বছর আগে যা ছিল ২৮ কোটি ডলার, সেটা এখন হয়ে গেছে প্রায় ৪০ কোটি ডলার। এ ধরনের প্রবৃদ্ধি পৃথিবীর আর কোনো বাজারে আছে বলে জানা নেই।’
যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সম্পর্কে নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘ইউরোপের বাজারে প্রবৃদ্ধি কমে গেছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে কমেনি। মাঝে মাঝে আমি খুব ব্যথিত হই, যখন আমাদের বলা হয় নতুন বাজার খুঁজে বের করুন। কিন্তু আমরা কীভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভোক্তাপণ্যের বাজার ছেড়ে রাতারাতি নতুন বাজার পাব এটা সম্ভব নয়।’
পাল্টা শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের সমালোচনা করলেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। দর-কষাকষি আলোচনায় ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ত না করার বিষয়টি নিয়েও তিনি কথা বলেন। তিনি বলেন, সরকার কী করছে বা হালনাগাদ কী অগ্রগতি আছে, তা ব্যবসায়ীরা জানতে পারেননি।
আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘শুল্ক নিয়ে আলোচনা ও দর-কষাকষির ক্ষেত্রে সরকার যদি মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে তারা ভারত, ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার চেয়ে ভালো সুবিধা আনতে পারবে; ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ত করার দরকার নেই, এ জন্য আমলাতন্ত্রই যথেষ্ট; দর-কষাকষির জন্য যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) একমাত্র জায়গা। তাহলে বলব, আমরা সমস্যা নিজেরাই ডেকে নিয়ে আসছি।’
৪০ বছরের ব্যবসায়িক জীবনে রপ্তানি খাতে এমন সংকট কখনো দেখেননি বলে মন্তব্য করেছেন দেশের অন্যতম রপ্তানিকারক, ব্যবসায়ী নেতা ও হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে আজাদ। তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীরা এই খাতকে সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখন হতাশ ও ক্ষুব্ধ।’
সম্প্রতি এক ব্র্যান্ড অংশীদারের সঙ্গে বৈঠকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে হা-মীম গ্রুপের এমডি এ কে আজাদ বলেন, ‘আমার এক বড় ব্র্যান্ড হেড অফিসে ডেকে জানায়, তারা নিজ দেশের সরকারের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করেছে। তাদের ভাষ্য ছিল তোমাদের অবস্থান দুর্বল, ভালো ফল আশা করা যাচ্ছে না।’ এটা শুনে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন।
এই পরিস্থিতিতে এ কে আজাদ একাধিক উপদেষ্টাকে ফোন করেন। তিনি বলেন, সবাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন। পরদিন বাণিজ্য উপদেষ্টা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এ কে আজাদ আরও বলেন, উপদেষ্টা জানান, ৯৫ শতাংশ সমস্যা তারা সমাধান করেছেন। বাকি ৫ শতাংশ নিয়ে তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যবসায়ীরা কী করবেন। তার যুক্তি যদি ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব কমও আসে, কিন্তু ৫ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত রপ্তানি হলে দেশের লাভই বেশি হবে। এই উদ্যোগে তিনি সফল হবেন বলে মনে করেন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পাল্টা শুল্ক নিয়ে সরকার ভেবেছিল, আলাপ-আলোচনা করে সমাধান করে ফেলবে। এ নিয়ে সরকারের একধরনের কৃতিত্ব নেওয়ার মানসিকতা ছিল। দর-কষাকষির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা ভেবেছিলেন, পাল্টা শুল্ককে ১০ শতাংশ বা শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনতে পারবেন। সরকারি পর্যায়ে এমন আত্মবিশ্বাস ও অতি আত্মবিশ্বাসের খেসারত দিচ্ছি।
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো শুল্ক আলোচনায় কোন অবস্থায় থাকছে, সেটি আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।’ তার মতে, পাশাপাশি অশুল্ক বাধা ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের নানা ইস্যু আছে। সেখানে আমাদের সার্বভৌমত্ব, অন্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এসব আমরা কতটুকু করতে পারব, কতটুকু পারব না, তা-ও বিবেচনায় আনতে হবে।
সিপিডির আরেক সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমে মনে হচ্ছে আমরা এমন একটা অত্যন্ত নিরপরাধ, নির্দোষ ও নিষ্পাপ সরকারকে সঙ্গে নিয়ে সামনে আগানোর চেষ্টা করছি।’ সরকারকে কেন নিরপরাধ, নির্দোষ ও নিষ্পাপ বলেছেন, এর ব্যাখ্যা দিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা এখানে বসে এত কিছু বুঝি আর ওনারা (সরকারে থাকা ব্যক্তিরা) বোঝেন না, আমার কাছে তো এটি আশ্চর্য লাগে। এ জন্যই বললাম এত নির্দোষ, নিরপরাধ ও নিষ্পাপ সরকার আমি দেখিনি। বর্তমানে (শুল্ক নিয়ে আলোচনায়) আমরা একটা কর্দমাক্ত অবস্থায় রয়েছি। তবে সবাই মিলে ওই ঘাটতি পূরণ করতে পারব, এই ভরসায় আছি।’
অনুষ্ঠানে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কোনো দুর্বল সরকার সফল দর-কষাকষি করেছে ইতিহাসে এ নজির খুব কম। একটি অসমন্বিত (সমন্বয় নেই এমন) সরকার তার সবচেয়ে বড় সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পেরেছে এমন ইতিহাসও খুব নেই। এটি এমন এক সমন্বয়হীন সরকার, যার বিভিন্ন কাজের নেতৃত্বে কে আছেন, এটা বোঝা যায় না। এ ছাড়া এ ধরনের সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা না থাকলে সেটিও বড় দুর্বলতার অংশ হয়। বর্তমানে যেহেতু সরকার দুর্বল, সেহেতু শুল্কের আলোচনায় দুর্বলতার ঘাটতি পূরণ করতে বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন ছিল। সেটি হয়নি।
বাংলাদেশি পণ্যে বাড়তি শুল্ক কমানোর দর-কষাকষির জন্য লবিস্ট নিয়োগ করার চেষ্টা করছে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এমন তথ্য দিয়ে সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, ‘শনিবার থেকে আমরা লবিস্ট নিয়োগে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছি। তবে লবিস্টদের কাছ থেকে সাড়া কম পাচ্ছি। তার কারণ, অধিকাংশই বিভিন্ন দেশের পক্ষে যুক্ত হয়ে গেছে।’
মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে তিন দিন আগেও আশাবাদী ছিলাম। যারা সরাসরি দর-কষাকষি করছেন, ওনারা অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেছেন, তারা খুবই আত্মবিশ্বাসী। তবে দুদিন আগে থেকে কানাঘুষা চলছে যে তারা বুঝতে পেরেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) পাল্টা শুল্ক কমানোর চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ নয়। ট্রাম্প প্রশাসন হচ্ছে সেই কর্তৃপক্ষ। এটা বুঝতে এত সময় লাগল!’
