জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, চট্টগ্রামকে নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র হচ্ছে। নানা পরাশক্তি চট্টগ্রামের দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ভিত্তি। যদি চট্টগ্রামের দিকে কেউ চোখ তুলে তাকায়, সমগ্র বাংলাদেশ একযোগে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে। গতকাল রবিবার রাতে জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচি শেষে চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহর বিপ্লব উদ্যানে অনুষ্ঠিত পথসভায় তিনি এ কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা বলেছি, ক্ষমতা নয়, জনতাই আমাদের বৈধতা। চট্টগ্রাম প্রমাণ করেছে চট্টগ্রামের জনগণই আমাদের বৈধতা। চট্টগ্রাম যুগ যুগ ধরে ইতিহাসের পাতায় পাতায় বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করে আসছে। বিদ্রোহের নগরী হিসেবে এখানে বারবার বিদ্রোহ হয়েছে। হাবিলদার রজব আলী এখানে সাহসিকতার সঙ্গে সিপাহি বিদ্রোহের সূচনা ঘটিয়েছিলেন। আমরা জানি, সূর্য সেন ও প্রীতিলতার কথা। ১৯৭১ সালে এই চট্টগ্রাম থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই চট্টগ্রামের কালুরঘাট থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা এসেছিল। চট্টগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার দুয়ার। আমাদের সার্বভৌমত্বের দুয়ার।’
তিনি বলেন, ‘এই চট্টগ্রামের মাটিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ওয়াসিম, শহীদ শান্ত, শহীদ ফারুকসহ অসংখ্য শহীদ বুক চিতিয়ে লড়াই করেছিলেন। ঢাকার পর দ্বিতীয় দুর্গ হিসেবে চট্টগ্রাম নিজেদের ঘোষণা করেছিল। চট্টগ্রাম ফ্যাসিস্টদের তাড়িয়েছে, নতুন করে কাউকে ফ্যাসিস্ট হতে চট্টগ্রাম প্রতিরোধ করবে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কক্সবাজারে সত্য উন্মোচন করেছেন মন্তব্য করে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, ‘সেই সত্য উন্মোচন করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় আমাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। বাঁশখালীতে এনসিপির সমন্বয়কের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের সময় আমরা বলেছিলাম, বাধা দিলে বাধবে লড়াই, এই লড়াইয়ে জিততে হবে। আমরা এখনো বলতে চাই, বাধা দিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির তারুণ্যের শক্তিকে থামানো যাবে না।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে একমাত্র কসমোপলিটন নগরী হচ্ছে এই চট্টগ্রাম। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের লাইফলাইন হচ্ছে এই চট্টগ্রাম। এখানে যে অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা রয়েছে, পানি সমস্যা রয়েছে, জাতীয় নাগরিক পার্টি এসব সমস্যার সমাধান করতে চায়।’ জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য চট্টগ্রামকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামকে নতুন অর্থনৈতিক জোন হিসেবে আমাদের গড়ে তুলতে হবে।’
‘বউত দিন হাইয়ো আর ন হাইয়ো’ এ স্লোগান উচ্চারণ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা আর কাউকে খাওয়ার সুযোগ দেব না। চট্টগ্রামকে আমরা গুটিকয়েক পরিবারের কাছে ছেড়ে দেব না। এখানে পাহাড়ি, বিহারি, হিন্দু, মুসলমান সব জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করতে হবে। সব সম্প্রদায়ের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। চট্টগ্রামকে বহু সংস্কৃতির নগর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
পথসভায় অন্যদের মধ্যে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, যুবশক্তির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তরিকুল ইসলাম, এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক জোবাইরুল হাসান আরিফ, সাগুফতা বুশরা মিশমা, ইমন সৈয়দ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
এর আগে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় নগরীর বহদ্দার হাট থেকে নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে জুলাই পদযাত্রা শুরু হয়। এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমীন, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিনসহ এনসিপি, যুবশক্তি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ পদযাত্রায় অংশ নেন।
এ পথসভার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এনসিপির দুদিনের জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচি শেষ হলো। এর আগে শনিবার কক্সবাজার ও বান্দরবানে এবং রবিবার সকালে রাঙ্গামাটিতে জুলাই পদযাত্রা হয়।
সব জনগোষ্ঠীকে মর্যাদা দিয়ে একটি সংবিধান তৈরি করতে চাই : রাঙ্গামাটিতে পথসভায় নাহিদ
‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ এ সেøাগান সামনে রেখে এনসিপির দেশব্যাপী পদযাত্রা কর্মসূচি গতকাল রবিবার দুপুরে রাঙ্গামাটিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল থেকেই দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা খ- খ- মিছিল নিয়ে শহরের রাজবাড়ীর শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনের সামনে জড়ো হন। দুপুর ১টার দিকে কেন্দ্রীয় নেতারা চট্টগ্রাম থেকে এসে শহরের রাজবাড়ী এলাকায় উপস্থিত হন। সেখান থেকে পদযাত্রা শুরু হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বনরূপায় গিয়ে পথসভায় মিলিত হয়।
পথসভায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘মুজিববাদী সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে পাহাড়ে অবাঙালি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বিভেদ তৈরি করে রাখা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামের সঙ্গে অন্য ধর্মের বিভেদ তৈরি করে রাখা হয়েছে। আমরা সব বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সব জনগোষ্ঠীকে মর্যাদা দিয়ে একটি সংবিধান তৈরি করতে চাই। আপনাদের রাঙ্গামাটির নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বাহাত্তরে সংবিধানের বিরোধিতা করেছিলেন। আমরা চাই মুজিববাদী সংবিধান বাতিল করে আমি, আপনি সবাই বসে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান তৈরি করব, যেখানে আপনার অধিকারের কথাও থাকবে, আমারও অধিকারের কথা থাকবে।’
এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ‘কথার সঙ্গে কথার লড়াই হতে পারে, কিন্তু কথার সঙ্গে কখনো মঞ্চে আগুন দেওয়া, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলার, গায়ে হাত দেওয়ার সম্পর্ক হতে পারে না। এগুলো ফ্যাসিবাদী চরিত্র। প্রবীণরা কথায় কথায় সমুদ্রে ফেলার দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিলে তবে তাদের থেকে আর কিছু শেখার নেই।’
দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ইনসাফের রাজনীতি কায়েম হোক। আমরা তরুণ প্রজন্ম নিজেদের জীবন দিয়ে ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে উঠে যাতে ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারি, যেখানে সব জাতিগোষ্ঠী, সব ধর্ম ও সব ভাষার মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়।’
এনসিপি রাঙ্গামাটি সমন্বয় কমিটির প্রধান সমন্বয়ক বিপিন চাকমার সভাপতিত্বে পথসভায় দলটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমীন, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনীম জারা, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, এনসিপির অঞ্চল তত্ত্বাবধায়ক ও যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ইমন সৈয়দসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পদযাত্রা শেষে এনসিপির নেতারা চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন।
