জেলেদের জন্য চাল সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণের উদ্যোগ নিয়ে সরকার: ফরিদা আখতার

দেশ রূপান্তর অনলাইন

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৫, ০১:৩১ পিএম

দেশীয় মাছ রক্ষায় সরকার ২০২৫ সালে একটি নতুন অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছে, যার মাধ্যমে ১৯৫০ সালের ‘মাছ সংরক্ষণ আইন’-এ নতুন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এই ধারায় মুক্ত জলাশয়কে অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করে মাছ ও জলজ প্রাণী সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে। আজ সোমবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এই তথ্য সাংবাদিকদের জানান।

তিনি বলেন, ‘শুধু মাছ ধরার নিষিদ্ধ সময়সীমা কমানো হয়নি, বরং তা আন্তর্জাতিক সময়সীমার সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে আমাদের নিষেধাজ্ঞার সময়ে বিদেশি জেলেরা মাছ ধরতে না পারে।’

উপদেষ্টা জানান, অভয়াশ্রম সম্প্রসারণে সরকার আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি, মাইলিশ, জাটকাসহ মাছ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে প্রান্তিক প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জন্য মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ভিজিএফ চাল বিতরণ করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২ লাখ ৬৫ হাজার ৪৪৯টি জেলে পরিবারকে মোট এক লাখ ৪ হাজার ৬৬২ মেট্রিক টন চাল দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পরিবারপ্রতি বরাদ্দ ৪০ কেজি চালকে ৫০ কেজিতে উন্নীত করার প্রস্তাব খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

জেলেদের ‘দাদন নির্ভরতার দুষ্টচক্র’ থেকে মুক্ত করতে সরকার সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতেও উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একটি বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যদিও এখনো তা গৃহীত হয়নি, বাংলাদেশ ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিকল্প সমাধানের পরামর্শ দিয়েছে।

মৎস্য, গবাদি পশু ও পোল্ট্রি খামারিদের বিদ্যুতের খরচ কমাতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে আবেদন করা হয়েছে। ফরিদা আখতার বলেন, ‘আমরা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবেদন করেছি যাতে কৃষি খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুতের রেট নির্ধারণ করা হয়।’

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে মিঠা পানির বিলুপ্তপ্রায় ৬৪টি মাছের মধ্যে ৪০টির প্রজনন কৌশল ও চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। একই সঙ্গে ১০২ প্রজাতির দেশীয় মাছের জিনব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

হালদা নদীতে ৮০ প্রজাতির মাছ ও ৩৬ প্রজাতির বাণিজ্যিক চিংড়ি রয়েছে। সেখানে স্বতঃস্ফূর্ত প্রাকৃতিক প্রজননের জন্য প্রতি বছর তিন থেকে চার মাস মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়। বিএফডিসি ও বিএফআরআই যৌথভাবে এ কাজ করছে। এ পর্যন্ত সাতটি অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হয়েছে।

উপদেষ্টা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি জালসহ নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের ফলে রেণু ও পোনা মাছের ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া, কাঠের তৈরি ছোট ট্রলারকে অবৈধভাবে ট্রলিং ডোর বানিয়ে সমুদ্র মাছ ধরায় যুক্ত করা হচ্ছে ভেন্ডিজাল, যার ফাঁস অত্যন্ত ছোট। ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। মুন্সীগঞ্জের কারখানাগুলোতে ইতোমধ্যে অভিযান চালিয়ে উৎপাদন বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইলিশের মৌসুম শুরু হলেও আশাবাদী হওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই বলে ফরিদা আখতার জানান। তিনি বলেন, ‘১২ জুন থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত ৪৬ হাজার ৭৯০ মেট্রিক টন ইলিশ ধরা হয়েছে।’ বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের আরিমা মডেল অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ৫ লাখ ৪৫ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছাতে পারে। তবে ২০২৩-২৪ সালের মতো উৎপাদন হ্রাস অব্যাহত থাকলে প্রকৃত উৎপাদন কমতে পারে।

নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সহায়তায় জাটকা রক্ষায় অভিযান পরিচালিত হলেও জাটকা নিধন পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। নদীর নাব্যতা হ্রাস, দূষণ, অল্প বৃষ্টিপাত ও অতিরিক্ত তাপমাত্রা ইলিশের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

গবেষণা জাহাজ ‘আরবি মীন সন্ধানী’ দিয়ে বঙ্গোপসাগরে এখন পর্যন্ত ৫৪টি জরিপ চালানো হয়েছে। আগামী ২২ আগস্ট থেকে ‘আরবি ড. ফিরোজা মেহসিন’ নামের নতুন ভেসেল দিয়ে আরেকটি জরিপ শুরু হবে।

অবৈধ, অনিয়ন্ত্রিত ও অনিবন্ধিত মাছ ধরাকে (আইইউইউ ফিশিং) প্রতিরোধে প্রায় ৮ হাজার ৫০০টি ট্রলারে জিএসএম ডিভাইস বসানো হয়েছে। নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন এই উদ্যোগে সহায়তা করছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা জানান, ইলিশের দাম কমাতে চাঁদাবাজি ও টোল সমস্যার সমাধানে সিটি করপোরেশনগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিজেলের দাম কমানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

রপ্তানির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “শুধু দুটি দেশের প্রবাসীদের অনুরোধে রপ্তানির চিন্তা করা হচ্ছে। ১১ হাজার মেট্রিক টনে বড় কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়, তবে দেশের সরবরাহ অগ্রাধিকার পাবে।”

বর্তমানে বাজারে ইলিশের দাম ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে রয়েছে। একাধিক বক্তা জানান, এ দামে সাধারণ মানুষ ইলিশ কিনতে পারছে না। আমরা চাই দাম ১৫০০ টাকার নিচে রাখতে।

উপদেষ্টা বলেন, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে দাম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে সেটি মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে ফরিদা আখতার সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, “আসুন, আমরা সবাই মিলে বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদকে সমৃদ্ধ করি।”

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত