পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে জীবিত ৩ ভাইকে ‘মৃত’ দেখিয়ে কোটি টাকার পৈত্রিক সম্পত্তি দখল ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। উপজেলার টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের খারিজা ভাজনী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা বলছেন—এটি শুধুই প্রতারণা নয়, বরং এককালের সমাজসেবী ও শিক্ষানুরাগী পরিবারকে সামাজিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পিত অপচেষ্টা।
অভিযোগকারীরা জানান, প্রয়াত তিনবারের নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান জলধর রায় প্রধানের পুত্র ভবেন্দ্রনাথ রায় প্রধান ও বজেন্দ্রনাথ রায় প্রধান দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও বাংলাদেশে বসবাস করে আসছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) করলে তা লক করে দেওয়া হয়। এরপরই জানা যায়, ভাগনে উত্তম কুমার রায় তনু ভুয়া কাগজপত্রে মামাদের ‘মৃত’ দেখিয়ে নিজেকে একমাত্র উত্তরাধিকার দাবি করে জমি দখল ও বিক্রি করে দিয়েছেন।
অভিযোগকারী ভবেন্দ্রনাথ রায় প্রধান বলেন, ‘আমরা জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নাগরিক। আমার বাবা জলধর রায় প্রধান এই এলাকার তিনবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। আমি নিজে গ্রাম সরকারের প্রধান ছিলাম, স্কুল, মসজিদ, মন্দির ও বাজারে জমি দান করেছি। অথচ আজ আমাদের মৃত দেখিয়ে আমাদের সম্পত্তি দখল ও বিক্রি করা হয়েছে। আমার জাতীয় পরিচয়পত্র বাতিল করা হয়েছে—এটি আমার অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা।’
ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য, ‘উত্তরাধিকার আইনে মৃত ভাইয়ের স্ত্রী বা সন্তান না থাকলে জীবিত ভাই-বোনেরা উত্তরাধিকার হন। কিন্তু ভবেন্দ্রনাথসহ তিন ভাই জীবিত থাকা সত্ত্বেও তাদের ‘মৃত’ দেখিয়ে ভাগনে জমিগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন।’
নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি জানান, ‘আমি উত্তম কুমার তনুর কাছ থেকে জমি কিনেছি। জমির দলিল করার সময় তিনি দাবি করেছিলেন, তার মামারা মৃত। এখন জানতে পারছি, তারা জীবিত এবং তারাই প্রকৃত মালিক। আমরা প্রতারিত হলে দায় কে নেবে?’
ভবেন্দ্রনাথ রায় প্রধানের জীবিত থাকা এবং সমাজে তার অবদানের বিষয়টি স্থানীয় শিক্ষক, ও জনপ্রতিনিধিরাও নিশ্চিত করেছেন। গাজুকাটি তফসিলি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নবীনচন্দ্র রায় বলেন, ‘তিনি আমাদের স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা, সম্প্রতি স্কুলে এসেছিলেন। স্কুল ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য জমিও দিয়েছেন।’
স্থানীয় বাসিন্দা আবু আলম বলেন, ‘যে বাজারে আমরা এখন ব্যবসা করি বা যে মন্দির-মসজিদে যাই, তার জমিদাতা ভবেন্দ্রনাথ বাবু। অথচ এখন তাকে অস্বীকার করা হচ্ছে, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।’
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জানান, ‘ভবেন্দ্রনাথের পরিবার সমাজসেবা ও শিক্ষা খাতে অনেক অবদান রেখেছে, এবং তিনি এখনো এলাকায় আসেন।’
এ বিষয়ে সিনিয়র আইনজীবী আসাদুর জামান বলেন, ‘জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এটি দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮ এবং ৪২০ ধারায় দণ্ডনীয়। এই দলিল বাতিল করা সম্ভব এবং অপরাধ প্রমাণ হলে জেল, জরিমানা ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।’
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ—বর্তমানে তারা একদিকে নিরাপত্তাহীনতা অন্যদিকে নাগরিক অধিকারহীনতায় ভুগছেন। জাতীয় পরিচয়পত্র বাতিল, জমির কাগজপত্রে জালিয়াতি এবং চিহ্নিত ভূমিদস্যুদের হুমকিতে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। তারা প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন—এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা হোক এবং তাদের জমি ও নাগরিক অধিকার ফেরত দেওয়া হোক।
