সিইসি-কমিশনারদের নিয়োগে হবে বাছাই কমিটি

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৫, ০৭:১৮ এএম

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কমিশনের ১৮তম দিনের আলোচনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্যান্য কমিশনারের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ঐকমত্য স্থাপিত হয়েছে। সংবিধানের ১১৮(১) ধারা সংশোধনের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও আইনে নির্ধারিত সংখ্যক কমিশনার নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। গতকাল বুধবার ঢাকার ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমির দোয়েল হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিতীয় পর্যায়ের ১৮তম দিনের আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজ এ তথ্য জানান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার। 

আলী রীয়াজ বলেন, স্পিকারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি বাছাই কমিটি গঠন করা হবে। বিদায়ী নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগে এই কমিটি পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে সংসদে প্রণীত আইনে নির্ধারিত পদ্ধতিতে ‘ইচ্ছাপত্র’ ও প্রার্থীদের তথ্য আহ্বান করবে। পাশাপাশি, কমিটি নিজ উদ্যোগে উপযুক্ত প্রার্থী অনুসন্ধান করবে। 

তিনি আরও বলেন, বাছাই কমিটির অন্য সদস্যরা হবেন বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা এবং প্রধান বিচারপতির প্রতিনিধি হিসেবে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। কমিটি আইনানুগ পদ্ধতিতে অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রাপ্ত ব্যক্তিদের জীবনবৃত্তান্ত স্বচ্ছভাবে যাচাই-বাছাই করে সর্বসম্মতিক্রমে একজনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং প্রতিটি পদের জন্য একজন করে কমিশনার নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে প্রস্তাব পাঠাবে। রাষ্ট্রপতি তাদের পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ দেবেন। জাতীয় সংসদ সচিবালয় স্পিকারের তত্ত্বাবধানে এই কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা প্রদান করবে। আলী রীয়াজ জানান, বিদায়ী কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বা অন্য কোনো কারণে পদ শূন্য হলে পরবর্তী দিন থেকে নবনিযুক্ত কমিশনাররা দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এছাড়া, নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদ কর্র্তৃক পৃথক আইন ও আচরণবিধি প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হয়েছে। তবে, সংবিধানের বিদ্যমান ২, ৩, ৪, ৫ ও ৬ উপধারা অপরিবর্তিত থাকবে। 

বুধবারের আলোচনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাসদ, ১২ দলীয় জোট, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সংবিধানে নয়, বাস্তবে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন চায় বিএনপি :

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা শুধু সংবিধানে উল্লেখ থাকলেই যথেষ্ট নয়, উপযুক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। গতকাল ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে দ্বিতীয় ধাপের সংলাপের ১৮তম দিন শেষে তিনি এ কথা বলেন।  সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, অতীতে তারা বলে এসেছেন, সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সংবিধানে পৃথক নিয়োগ প্রক্রিয়া না এনে সংশ্লিষ্ট আইনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আচরণবিধি নিশ্চিত করতে হবে। তবে, নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রে সংবিধানে আলাদাভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে, এ বিষয়ে তারা একমত। তিনি বলেন, সংলাপে সব পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠনে পাঁচ সদস্যের একটি বাছাই কমিটির প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়েছে। এই কমিটিতে থাকবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার (সভাপতি), বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। কমিটি একটি অনুসন্ধান প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে, যেখানে সিভিল সোসাইটি, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণ নাম প্রস্তাব করতে পারবে। সংসদে আইন প্রণয়ন করে এই অনুসন্ধান কমিটির কাঠামো নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। 

সালাহউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, অনুসন্ধান কমিটি জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই করে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করবে এবং তা বাছাই কমিটির কাছে পাঠাবে। বাছাই কমিটি এই তালিকা থেকে বা নিজ উদ্যোগে অতিরিক্ত প্রার্থী বিবেচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে কমিশনারদের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে। পূর্বের প্রস্তাবে প্রতিটি পদের জন্য দুটি নাম সুপারিশের কথা থাকলেও নতুন প্রস্তাবে প্রতিটি পদের জন্য একটি নাম পাঠানো হবে। নিয়োগের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। তিনি বলেন, সংবিধানের ১১৮ ধারায় নতুন সংযোজনের প্রস্তাবে সংসদ নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আইন ও আচরণবিধি প্রণয়ন করবে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, কার্যকরভাবে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হলে নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে কার্যক্রম পর্যন্ত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে গঠিত কমিশনগুলো কার্যত স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। 

তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। জাতি এখন ঐক্যবদ্ধভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে পরবর্তী নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হবে। এই প্রেক্ষাপটে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচন কমিশন গঠনের অগ্রগতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি সংলাপে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এই গঠন প্রক্রিয়া ও কমিশনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের দিকনির্দেশনায় সর্বসম্মত প্রস্তাব একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ভিত্তি স্থাপন করবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত