ইসলাম শান্তির ধর্ম। এ ধর্ম কেবল নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের মতো নির্দিষ্ট ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর নির্দেশনা সুস্পষ্ট। ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনসহ সবখানেই ইসলাম ভারসাম্য, সংযম, চিন্তাশীলতা ও সুবিবেচনার ওপর জোর দিয়েছে। কোনো কিছুই অকারণে বা আবেগতাড়িতভাবে করতে উৎসাহ দেওয়া হয়নি ইসলামে। অনর্থক তাড়াহুড়া, অস্থিরতা ও নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ আচরণ ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং ইসলাম শিক্ষা দেয় ধৈর্য, স্থিরতা, শৃঙ্খলা, সহনশীলতা ও প্রজ্ঞাপূর্ণ আচরণের।
মুমিনের পরিচয় তার চিন্তা, চেতনা ও আচরণে প্রকাশ পায়। একজন প্রকৃত মুমিনের জীবন হবে ভারসাম্যময় ও সুচিন্তিত। কোরআন মাজিদে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা বাকারা ১৯০) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিররা উল্লেখ করেছেন, যারা চিন্তা-ভাবনা না করে আবেগে ভেসে কাজ করে, যারা শৃঙ্খলা না মেনে অরাজকতা সৃষ্টি করে, তারা সীমা লঙ্ঘনকারী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজ করে, সে যেন তা পরিপূর্ণতা ও সৌন্দর্যের সঙ্গে করে।’ (সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ ইসলাম কেবল কাজ করাকে নয়, বরং সেই কাজের গুণগত মান, সৌন্দর্য ও ভারসাম্যকেও গুরুত্ব দেয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে ইসলামি শিক্ষার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। আমরা মুসলমান পরিচয়ে পরিচিত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আচরণ ও মনোভাব ইসলামের মৌলিক শিক্ষা থেকে অনেক দূরে। বিশেষ করে আমাদের সমাজে ‘হুজুগে’ মনোভাব একটি ভয়াবহ ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। সামান্য কিছু ঘটলেই আমরা আবেগে গা ভাসিয়ে দিই, হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। চিন্তাশীলতা ও বাস্তবতা বিবেচনার কোনো স্থান থাকে না। অনেক সময় এই আবেগ ও হুজুগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এমনভাবে, যা সরাসরি জননিরাপত্তা, নৈতিকতা ও মানবিকতার জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি ঢাকার উত্তরা এলাকার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয় প্রতিষ্ঠানটির স্কুল শাখায়। এতে কোমলমতি শিশুশিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ অনেকে নিহত ও আহত হন। এটি ছিল এক হৃদয়বিদারক ও বিভীষিকাময় ঘটনা। স্বাভাবিকভাবেই তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও চিকিৎসা তৎপরতা ছিল অত্যন্ত জরুরি। সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য জরুরি বিভাগের সদস্যরা উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে লক্ষ করা যায়, এ সময় ভিড় জমে হাজার হাজার উৎসুক জনতার। কেউ ছবি তোলেন, কেউ ভিডিও করেন, কেউ ফেসবুকে লাইভ করেন। এতে উদ্ধার কাজে ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটে। যেখানে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় কত কত মায়ের বুক খালি হয়ে গেল, স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠল আশপাশের পরিবেশ, সেখানে হাজার হাজার উৎসুক জনতার ঢল নামে তামাশা দেখার জন্য। এর চেয়ে কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ আর কী হতে পারে? শুধু তাই নয়, তারা নানা গুজবও ছড়ান। এতে দেশব্যাপী তৈরি হয় অস্থিরতা। এই ঘটনাটি একদিকে যেমন মর্মান্তিক, অন্যদিকে আমাদের সামাজিক মানসিকতার একটি করুণ চিত্রও তুলে ধরে। একজন মুমিন হিসেবে এমন অবস্থায় আমাদের আচরণ কী হওয়া উচিত? ইসলাম এমন পরিস্থিতিতে আমাদের কী শিক্ষা দেয়? কোরআন-সুন্নাহ আমাদের শেখায়, বিপদের সময় ধৈর্যধারণ করা, সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করা এবং গুজব, অপপ্রচার ও অস্থিরতা থেকে দূরে থাকা।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন এক সমাজে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন, যেখানে আবেগ ও গোঁড়ামি প্রবল ছিল। হুজুগে ভাব, প্রতিশোধ পরায়ণতা ও অস্থিরতা ছিল মজ্জাগত। কিন্তু তিনি ধাপে ধাপে তাদের ধৈর্যশীল, বিবেকবান, সুসংগঠিত ও চিন্তাশীল জাতিতে রূপান্তর করেন। আরব সমাজের সেই রূপান্তরের পেছনে তার গভীর প্রজ্ঞা, সুপরিকল্পিত দাওয়াতি কর্মপন্থা ও আল্লাহর প্রদত্ত হেকমত ছিল গুরুত্বপূর্ণ। গুজব ছড়ানো এবং আবেগতাড়িত আচরণ সমাজে ভয়ংকর অস্থিরতা তৈরি করে। একটি দুর্ঘটনা থেকে বড় ধরনের সংঘর্ষ, বিশৃঙ্খলা কিংবা নিরাপত্তা হুমকি তৈরি হতে পারে। অথচ একজন মুসলমানের উচিত হলো, যেকোনো পরিস্থিতিতে শান্ত থাকা, নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করা এবং দায়িত্বশীল আচরণ করা। এই যে গুজব, হুজুগ ও বিশৃঙ্খল মানসিকতা, তা একটি জাতির মনস্তত্ত্বের ভয়াবহ রোগ। যদি এর চিকিৎসা এখনই শুরু না করা হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও বিপজ্জনক মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠবে। তারা চিন্তাশীল না হয়ে হয়ে উঠবে উত্তেজনাপ্রবণ, আবেগনির্ভর ও দায়িত্বহীন। এর ফলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেবে। এই পরিস্থিতিতে ইসলামি স্কলারদের দায়িত্ব অনেক বেশি। তারা চাইলে ইসলামি কাউন্সেলিং, সভা-সেমিনার, ওয়াজ-মাহফিল ও মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মানুষের এই মানসিকতা পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারেন। বিশেষ করে শীতকালীন ওয়াজ-মাহফিলগুলোতে যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ইসলামের বাণী পৌঁছে দেওয়া হয়, তখন এসব ওয়াজে সামাজিক ভারসাম্য, নৈতিকতা, ধৈর্য, স্থিরতা ও বিবেচনাবোধের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা অত্যন্ত জরুরি। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইসলামি মূল্যবোধভিত্তিক কাউন্সেলিং কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। যাতে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই হুজুগে না হয়ে বিবেচনাশীল হতে শেখে। অভিভাবকদের ভূমিকা এখানেও গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি নিজেদের সন্তানদের বাস্তবতা অনুধাবন, সংবাদ যাচাই এবং দুঃসময় মোকাবিলার শিক্ষা দেন, তাহলে অস্থিরতা রোধ করা সম্ভব।
একটি সুসভ্য, সুসংগঠিত ও বিবেকবান জাতি গড়ার জন্য প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তা ও আচরণ। ইসলাম সেই শিক্ষাই আমাদের দিয়েছে। অতএব যারা নিজেদের মুসলমান বলে পরিচয় দেন, তাদের উচিত কোরআন ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ থেকে শিক্ষা নেওয়া। নির্বুদ্ধিতা ও অস্থিরতা কখনোই একজন মুমিনের পরিচয় হতে পারে না। একজন প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যিনি যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন, বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত নেন এবং সব সময় চিন্তাশীলতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে চলেন। সমাজে এমন মানুষের সংখ্যা বাড়লেই একটি নৈতিক, শান্তি ও ভারসাম্যপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
