বিরল ব্ল্যাকহোলের সন্ধান, গ্রাস করছে নক্ষত্র

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৫, ১২:১৪ পিএম

মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণে এক অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে নাসার বিজ্ঞানীরা। হাবল স্পেস টেলিস্কোপ ও চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরির সমন্বয়ে তাঁরা এমন এক ব্ল্যাকহোল শনাক্ত করেছেন, যা হতে পারে বহু প্রতীক্ষিত মধ্যম ভরের ব্ল্যাকহোল বা ‘ইন্টারমিডিয়েট-মাস ব্ল্যাক হোল (IMBH)’।

এ ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ব্ল্যাকহোলটি একটি নক্ষত্রকে গিলে ফেলার মুহূর্তে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে—যা গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

নাসা এ বস্তুটির নাম দিয়েছে NGC 6099 HLX-1। এটি এক বিশাল উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সির কেন্দ্রে নয়, বরং তার কেন্দ্র থেকে প্রায় ৪০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব আনুমানিক ৪৫০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ, হারকিউলিস নক্ষত্রপুঞ্জের মধ্যে এর অবস্থান।

কী কারণে এই ব্ল্যাকহোল ব্যতিক্রম?

বিজ্ঞানের এ পর্যায়ে মূলত দুটি শ্রেণির ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে:

নক্ষত্রঘটিত ব্ল্যাকহোল (Stellar black holes): একটি মৃত নক্ষত্রের ধ্বংসের পর এগুলো জন্ম নেয়, এবং সাধারণত সূর্যের ভরের তুলনায় ১০০ গুণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল (Supermassive black holes): এরা লক্ষ বা কোটি গুণ সূর্যের চেয়ে ভারী হয়, এবং সাধারণত গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থান করে।

কিন্তু এই দুই শ্রেণির মাঝামাঝি যেসব ব্ল্যাকহোল রয়েছে—মধ্যম ভরবিশিষ্ট ব্ল্যাকহোল বা IMBH—তাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করা এতদিন বিজ্ঞানীদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল। একদিকে তারা অত হালকা নয় যে নক্ষত্র পতনের মাধ্যমে জন্ম নিতে পারে, অন্যদিকে অত উজ্জ্বলও নয় যে সহজে শনাক্ত করা যাবে।

এই কারণে HLX-1–এর এই আবিষ্কার গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। গবেষণার প্রধান গবেষক, তাইওয়ানের ন্যাশনাল টসিং হুয়া ইউনিভার্সিটির ইয়ি-চি চ্যাং বলেন, গ্যালাক্সির কেন্দ্র ছাড়া অন্যত্র এমন উচ্চমাত্রার এক্স-রে বিকিরণ খুবই দুর্লভ। এ ধরনের উৎস মধ্যম ভরবিশিষ্ট ব্ল্যাকহোল খোঁজার ক্ষেত্রে কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে।

নক্ষত্র গ্রাসের দুর্লভ মুহূর্ত ধরা পড়ল

২০০৯ সালে প্রথমবার চন্দ্র এক্স-রে টেলিস্কোপ এই উৎস থেকে আসা প্রবল এক্স-রে বিকিরণ শনাক্ত করে। পরে ২০১২ সালে এর উজ্জ্বলতা আচমকা ১০০ গুণ বেড়ে যায়। পরবর্তী সময় ধীরে ধীরে তা ম্লান হতে থাকে এবং ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় নিস্তেজ অবস্থায় পৌঁছায়।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই আচরণ টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্টের ইঙ্গিত দেয়, অর্থাৎ—একটি ব্ল্যাকহোল কোনো নক্ষত্রকে টুকরো টুকরো করে গিলে ফেলছে। নক্ষত্রটির গ্যাস ছিন্ন হয়ে একটি উজ্জ্বল ডিস্কে পরিণত হয়, যেখান থেকে তীব্র এক্স-রে নিঃসৃত হয়।

চন্দ্র এক্স-রের ডেটায় দেখা গেছে, HLX-1–এর তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা টাইডাল ডিসরাপশনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অন্যদিকে, হাবল টেলিস্কোপ এই ব্ল্যাকহোলের চারপাশে একটি ঘন তারার গুচ্ছও শনাক্ত করেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এ গুচ্ছ HLX-1–এর জন্য একপ্রকার জ্বালানি সরবরাহকারী কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।

গবেষণার সহলেখক, ইতালির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোফিজিকসের রোবের্তো সোরিয়া বলেন, “২০০৯ সালে HLX-1 ছিল উজ্জ্বল, ২০১২ সালে আরও বেশি। এরপর থেকে ধীরে ধীরে ম্লান হয়েছে। এখন দেখার বিষয় এটি আবার উজ্জ্বল হয় কি না। যদি না হয়, তাহলে হয়তো এটি চিরতরে নিভে যাবে।”

বৃহৎ ব্ল্যাকহোলের উৎপত্তি বুঝতে এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ

বিজ্ঞানীদের একাংশের ধারণা, ছোট ছোট IMBH একত্র হয়ে পরে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলে রূপ নিতে পারে। আবার একটি ভিন্ন তত্ত্ব বলছে, প্রাথমিক মহাবিশ্বে বিশাল গ্যাসীয় মেঘ ধসে গিয়ে সরাসরি এ ধরনের ব্ল্যাকহোল তৈরি হয়েছিল।

এই আবিষ্কার বিশেষ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, গ্যালাক্সির প্রান্তভাগে—যেখানে সাধারণত বিশাল ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব কম—সেখানেও মাঝারি ভরের ব্ল্যাকহোল থাকতে পারে। যখন তারা কোনো নক্ষত্র গ্রাস করে, তখন তারা হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং ধরা পড়ে গবেষকদের চোখে।

রোবের্তো সোরিয়া বলেন, ‘আমরা যদি ভাগ্যবান হই, তাহলে আরও ব্ল্যাকহোলকে এভাবে এক্স-রে আলোয় জ্বলে উঠতে দেখতে পারব। তখন একটি পরিসংখ্যান তৈরি করা যাবে—কতগুলো IMBH মহাবিশ্বে আছে, তারা কীভাবে আচরণ করে এবং বিশাল গ্যালাক্সিগুলোর বিকাশে কীভাবে ভূমিকা রাখে।’

তথ্যসূত্র: বিবিসি অ্যাট নাইট স্কাই ম্যাগাজিন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত