সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি

সেই ছাত্রনেতার বাসায় সোয়া দুই কোটি টাকার চেক

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৫, ০৭:২৫ এএম

রাজধানীর গুলশানে সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদা দাবির ঘটনায় গ্রেপ্তার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা আবদুর রাজ্জাক বিন সোলাইমান ওরফে রিয়াদের ঢাকার ভাড়া বাসা থেকে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার চারটি চেক উদ্ধার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ ছাড়া রিয়াদের বাসায় কয়েক লাখ টাকার এফডিআরের বই পাওয়া গেছে, যা তদন্ত করছে পুলিশ। রিয়াদ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের বহিষ্কৃত নেতা।

গতকাল বুধবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপকমিশনার (ডিসি মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এ তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে ডিসি মিডিয়া বলেন, রিমান্ডে থাকা আসামিদের মধ্যে রিয়াদের কলাবাগানের বাসা থেকে সোয়া ২ কোটি টাকার চারটি চেক উদ্ধার করা হয়। এ চারটি চেকের মধ্যে ১ কোটি টাকা করে দুটি, একটি ১০ লাখ এবং একটি ১৫ লাখ টাকার। চেকে কারও নাম ও তারিখ নেই। ‘ট্রেড জোন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান এ চার চেকের স্বাক্ষরদাতা ছিল। এ ছাড়া রিয়াদের বাসায় কয়েক লাখ টাকার এফডিআরের খোঁজ পাওয়া গেছে, সেগুলোও তদন্ত করছে পুলিশ। চেক জব্দের ঘটনায় কলাবাগান থানায় মামলাও প্রক্রিয়াধীন।

গত ২৬ জুলাই ঢাকার গুলশানে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদাবাজির অভিযোগে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবদুর রাজ্জাক রিয়াদসহ পাঁচজনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। চাঁদাবাজির অভিযোগে গুলশান থানায় ছয়জনকে আসামি করে মামলা করেন শাম্মী আহমেদের স্বামী সিদ্দিক আবু জাফর। গ্রেপ্তারদের বাইরে এক আসামি হলেন কাজী গৌরব অপু, যিনি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

মামলায় অভিযোগে বলা হয়, ১৭ জুলাই সকাল ১০টায় আসামি বৈষম্যবিরোধী নেতা রিয়াদ ও অপু গুলশানের ৮৩ নম্বর রোডে সাবেক এমপি শাম্মী আহম্মেদের বাসায় যান। তখন তারা হুমকিধমকি দিয়ে ৫০ লাখ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার দাবি করেন। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ আখ্যায়িত করে পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করানোর হুমকি দেন এবং টাকা চেয়ে চাপ দিতে থাকেন তারা। একপর্যায়ে সিদ্দিক আবু জাফর বাধ্য হয়ে নিজের কাছে থাকা নগদ ৫ লাখ ও ভাইয়ের কাছে থেকে নিয়ে আরও ৫ লাখ টাকা দেন।

এরপর ১৯ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে রিয়াদ ও অপু বাদীর বাসায় প্রবেশ করে তার ফ্ল্যাটের দরজায় সজোরে ধাক্কা মারেন। বিষয়টি গুলশান থানা পুলিশকে মোবাইল ফোনে অবহিত করলে আসামিরা চলে যান। ২৬ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টায় আবার রিয়াদের নেতৃত্বে অন্য আসামিরা বাদীর বাসার সামনে এসে তাকে খুঁজতে থাকেন। বাসার দারোয়ান মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাকে বিষয়টি জানান। তখন আসামিদের দাবি করা বাকি ৪০ লাখ টাকা না দিলে তাকে পুলিশে ধরিয়ে দেবেন বলে হুমকি দিতে থাকেন। পরে পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করলে তাৎক্ষণিক গুলশান থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পাঁচজনকে হাতেনাতে আটক করে।

ঢাকায় প্রতি মাসে ২০টি হত্যা : ডিএমপির মামলার পরিসংখ্যান তুলে ধরে ডিসি মিডিয়া বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ছয় মাসে ঢাকায় মহানগরের ৫০ থানায় ৩৩টি ডাকাতি, ২৪৮টি ছিনতাই, ১২১টি খুন এবং ১ হাজার ৬৮টি চুরির মামলা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ঢাকায় প্রতি মাসে ২০টির অধিক হত্যা ও ৫টির অধিক ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। প্রতি মাসে গড়ে ৪৬টি ছিনতাই মামলা, মাসে ৭০টি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। তবে সার্বিকভাবে ডিএমপির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল আছে বলে মনে করছেন পুলিশের এ কর্মকর্তা।

২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ১৮৬ : জননিরাপত্তা বিধান ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে ঢাকা মহানগর এলাকায় পুলিশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে মহানগরীতে চেকপোস্ট ও টহল কার্যক্রম বৃদ্ধি করেছে ডিএমপি। ডিএমপির ক্রাইম কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার জানায়, মঙ্গলবার ভোররাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ৫০টি থানা এলাকায় জননিরাপত্তা বিধানে দুই পালায় ডিএমপির ৪৭১টি টহল টিম দায়িত্ব পালন করে। এর মধ্যে রাতে ২৫৯টি ও দিনে ২১২টি টিম দায়িত্ব পালন করে। এ ছাড়া ৬৬টি পুলিশি চেকপোস্ট পরিচালনা করা হয়। এতে ১৮৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৩৩টি মামলা রুজু করা হয়। রাজধানীতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ২ হাজার ৮৪৫টি মামলা করছে ডিএমপির আটটি ট্রাফিক বিভাগ।

১২৩টি চোরাই মোবাইলসহ গ্রেপ্তার ৫ : মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, থানা পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। মঙ্গলবার রাতে ডিবি ওয়ারীর একটি টিম ১২৩টি চোরাই মোবাইলসহ চক্রের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। মোহাম্মদপুরের কিশোর গ্যাং কবজি কাটা গ্রুপের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বিঘিœত করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। সেই কবজি কাটা গ্রুপের আনোয়ারের দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলো নিশাত ও রাসেল ওরফে এসটি রাসেল।

সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন-উত্তরে যা বললেন : আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছে এসবি ও পুলিশ সদর দপ্তর। আইনশৃঙ্খলা বিঘিœত করার কোনো তথ্য আছে কি না, জানতে চাইলে তালেবুর রহমান বলেন, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডিএমপি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কেউ যদি অপরাধ সংঘটিত করার চেষ্টা করে তাহলে তাদের আইন অনুযায়ী মোকাবিলা করা হবে। এর বাইরে গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগিয়ে আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল রাখতে কাজ করছি।

রাতের অন্ধকারে থানায় বিভিন্ন দেনদরবার হয়। বিশেষ করে এনসিপি ও জামায়াতের নেতাদের আড্ডাখানা বা সালিশ করা স্থান থানা এ বিষয়ে ডিসি মিডিয়া বলেন, থানায় এমন সালিশি করার কোনো সুযোগ নেই। কোনো বাদী বা আসামি চাইলে মীমাংসার বিষয় আলোচনা করতে পারে। এর বাইরে থানায় বসে দেনদরবার করার সুযোগ নেই। এ বিষয় কোনো অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মোহাম্মদপুরে ছিনতাই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। রাজধানী জুড়ে ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মহা উৎসব চলছে এ বিষয় তিনি বলেন, পুলিশ যথেষ্ট সক্রিয় রয়েছে। রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল রয়েছে। এর বাইরে কিছু অপরাধ ঘটছে না তা না, তবে ঘটনা ঘটলে আমরা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও সহনীয় মাত্রায় রাখতে কাজ করছি। পাশাপাশি আমাদের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সামনে নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। আমাদের সদস্যদের মনোভাব পজিটিভ।

নগরবাসীকে আইন মেনে চলার অনুরোধ জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। অপরাধীর বিষয়ে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করবেন। আপনাদের নিরাপত্তা ও নিরাপদ চলাচলে ডিএমপি আন্তরিকভাবে সার্বক্ষণিক কাজ করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত