অবৈধ দোকানের ভারে ঝুঁকিতে সুন্দরবন মার্কেট

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৫, ০৭:১৭ এএম

রাজধানীর গুলিস্তানের সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের অবৈধ দোকান উচ্ছেদে সিটি করপোরেশন বেশ কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) অভিযান চালায়, ফায়ার সার্ভিস আরও তিন বছর আগে মার্কেটটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। কিন্তু কারও টনক নড়েনি। যার খেসারত দিতে হয় ব্যবসায়ীদের সর্বস্ব দিয়ে।

মার্কেটের এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে অবৈধ দোকান নেই। পাঁচতলায় পুরোটাই অবৈধ। অবৈধ দোকানের ভারে মার্কেটটি দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফায়ার এক্সিট, বা আলো চলাচলের রাস্তাতেও বিভিন্ন মালামাল রাখা থাকে। যার কারণে আগুন নেভাতে হিমশিম খেতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিসকে।

গতকাল শনিবার আগুন লেগে মার্কেটের বেশ কিছু দোকান পুরে গেছে। পুঁজি হারিয়ে প্রায় সর্বস্বান্ত ব্যবসায়ীরা। মার্কেটের যে তলায় আগুন লেগেছে, অর্থাৎ পাঁচতলার পুরোটাই ছিল অবৈধ। তবে অবৈধ দোকানগুলো কিনতে এবং উচ্ছেদ ঠেকাতে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের।

পুড়ে যাওয়া একটি দোকান ছিল আই ফোনের এক্সেসরিজ গোডাউন। গোডাউনের মালিক জজ মিয়াকে বারবার মূর্ছা যেতে দেখা গেছে। কান্নারত কণ্ঠে তিনি জানান, তার সহায়-সম্বল বলতে যা ছিল, সব বিক্রি করে দোকানটি কিনেছিলেন। পরিবার নিয়ে সামনের দিন কীভাবে চলবেন, সেই চিন্তায় জজ মিয়া বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।

ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিটের টানা প্রচেষ্টায় এক ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে আসে আগুন। এ সময় অনেকে ব্যবসায়ীকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা গেছে। ফায়ার সার্ভিস মাইকিং করেও ব্যবসায়ীদের মার্কেট থেকে সরাতে পারেনি। শেষ সম্বলটুকু আগুন থেকে বাঁচাতে জীবনের ঝুঁকি জেনেও মার্কেট ছাড়তে তাদের মধ্যে অনীহা দেখা গেছে।

তিন বছর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে ফায়ার সার্ভিস : গতকাল আগুন নিয়ন্ত্রণের পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক (ঢাকা) কাজী নজমুজ্জামান জানান, রাজধানীর গুলিস্তানের সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের আগুন বেশ বিপজ্জনক ছিল। মার্কেটের ভেতরে কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। তিন বছর আগে মার্কেটটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছিল ফায়ার সার্ভিসও। তিনি বলেন, ‘ভবনের নিচতলা, চারতলাসহ বিভিন্ন ফ্লোরে অনেক লোকজন ছিল। এসব লোকজনকে বারবার বলার পরও বের হতে চাচ্ছিলেন না। পরে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ সেনাবাহিনী তাদের ভবন থেকে বের করার চেষ্টা করে। এ কারণে আগুন নেভানোর কাজ ব্যাহত হচ্ছিল। আমরা যদি সঠিক সময়ে আমাদের কাজ করতে না পারি, তাহলে তো আগুন নেভানো সম্ভব নয়। তবে বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায় বিপজ্জনক এই আগুন নির্বাপণ করতে পেরেছি। অগ্নিকা-টা বেশ বিপজ্জনক ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভবনের ফায়ার সেফটি প্ল্যান ছিল না। কোনো ধরনের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও ছিল না। এই ভবনটিকে আমরা অনেক আগে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন হিসেবে ঘোষণা করেছিলাম। ভবনের বৈদ্যুতিক সংযোগের তারগুলো এলোমেলো অবস্থায় ছিল। এ কারণে আগুনটা একদিক থেকে অন্যদিকে চলে যায়। প্রচ- ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এতে আগুন নেভাতে আমাদের বেগ পেতে হয়েছে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মুনিরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নকশাবহির্ভূত দোকান উচ্ছেদের আগে আমরা একাধিকবার নোটিস করেছি, অভিযানে গিয়ে সতর্ক করেছি, অনেক দোকান ভাঙাও হয়েছে। সিটি করপোরেশন আবার অবৈধ দোকান উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেবে।’

অবৈধ দোকানের নতুন সিন্ডিকেট : রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তানের সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটটি সিটি করপোরেশনের তৈরি করা। এই মার্কেটে চারতলা পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের অনুমোদন রয়েছে। সাবেক কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন রতনের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট অবৈধ দোকান তৈরি করে বিক্রি করে। সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের সময় এসব দোকান বৈধ করার নামে কয়েক দফায় টাকা নেওয়া হয়। সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের সময় আবার সেসব দোকান উচ্ছেদ শুরু হয়। সেই উচ্ছেদ ঠেকাতে আবার টাকা দেন ব্যবসায়ীরা।

মার্কেটের বৈধ একাধিক দোকান মালিক এসব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, অবৈধ দোকান কেনাবেচার কবলে পড়ে পুরো মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। সবখানে দোকানে ঠাসা, কদিন পরপর অভিযান, আগুন লাগছে, ভূমিকম্প হলে কী হবে, সেই আতঙ্কেও থাকেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মার্কেটের সিঁড়ি, টয়লেট, জানালার পাশে, খোলা জায়গায় অবৈধ দোকান দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, পাঁচতলার ফ্লোর জুড়ে অবৈধ দোকান তৈরি করে একটি চক্র। তারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে এখন পালিয়ে গেছে। এর খেসারত দিতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাঁচতলার দুজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকি। এক-একবার এক এক সংস্থার অভিযান আসবে বলে টাকা নেওয়া হয়। কত নামে যে টাকা দিতে হয়, তার কোনো হিসাব নেই। আগের সিন্ডিকেট পালিয়ে গেলে এখন টাকা নেয় কে, এমন প্রশ্নের জবাবে তারা কারও নাম বলেনি। একজন বলেছেন, আপনারা সাংবাদিক খোঁজে বের করেন। আজকে নাম বলব, আর কালকে দোকান খুলতে পারব না। তখন ছেলেমেয়ে নিয়ে পথে বসতে হবে।’

দুদকের হিসাবেই ৫ শতাধিক অবৈধ দোকান : ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কেটটিতে নকশাবহির্ভূতভাবে পাঁচ শতাধিক দোকান নির্মাণের অভিযোগে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ওই অভিযানে প্রাপ্ত নকশা যাচাই করে মার্কেটে নকশাবহির্ভূতভাবে পাঁচ শতাধিক দোকানঘর নির্মাণের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পায় সংস্থাটি। তখন দুদকের জনসংযোগ বিভাগ থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গণমাধ্যমকে বিষয়টি জানানো হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত