বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকে। দেশগুলো যে পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পন্ন করে, তার একটি বড় অংশ সম্পন্ন হয় প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এখানকার দেশগুলোর বৈদেশিক বাণিজ্যের ১০ শতাংশেরও কম সম্পন্ন হয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে। এই বাণিজ্য বাড়ানো জরুরি। বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু পরিবহন ব্যয়, ভারতের অভ্যন্তরীণ সীমা ব্যবহার-সংক্রান্ত জটিলতা ইত্যাদি কারণে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে গতকাল রবিবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক সেমিনারে বক্তারা এ কথা বলেন। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় ‘বাংলাদেশ-নেপাল অর্থনৈতিক সহযোগিতা : একটি নবতর বাস্তবতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও কূটনৈতিক ব্যক্তিরা অংশ নেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নেপাল একটি স্থল সীমান্তবেষ্টিত দেশ। জলপথে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের কোনো সুযোগ নেই। এজন্য ভারতের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর ব্যবহার করতে হবে। আর সেটা করতে হলে বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে সমন্বিত পরিবহন যোগাযোগ অবকাঠামো (বিবিআইএন) প্রতিষ্ঠার যে প্রস্তাব রয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন হওয়া আবশ্যক। আর এটি বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতকেই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে হবে। আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে হলে এ ধরনের অবকাঠামোর বিকল্প নেই।’ তিনি নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য সাফটা প্লাস এবং পিটিএ প্লাচ চুক্তি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন।
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বাড়াতে হলে ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার করতে হবে। সেজন্য ভারতের সহায়তা লাগবে। নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে ভারতের ট্রানজিট প্রয়োজন। তাই নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে ভারতকে হিসাবে আনতে হবে। তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিকভাবে শুল্কের উত্থান দেখা যাচ্ছে। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে রপ্তানি বৃদ্ধি করে রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে।
ঢাকায় নিযুক্ত নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভান্ডারি বলেন, বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে দ্রুতই অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি হবে। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে, শিগগির সুসংবাদ আসবে। ভান্ডারি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। নেপালে প্রাণ, আকিজ ও কয়েকটি বাংলাদেশি ওষুধ কোম্পানি কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ নিয়ে আলোচনা চলছে। নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছে। ভবিষ্যতে ৯ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত তা উন্নীত করার বিষয়ে চুক্তি হয়ে আছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে সিপিডি এবং নেপালের থিংকট্যাংক নেপাল ইকোনমিক ফোরামের পক্ষ থেকে দুটি পৃথক উপস্থাপনা তুলে ধরা হয়। সিপিডির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট আফরিন মাহবুব তার উপস্থাপনায় উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে বাণিজ্যের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও নানা কারণে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে লজিস্টিক ব্যয়। নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে পণ্য আদান-প্রদানে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, তা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় পণ্য পাঠানোর ব্যয়ের সমান। যেসব ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য জোরদার হতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে কৃষি, জ্বালানি ও কেমিক্যাল, পরিবহন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পাইকারি বাণিজ্য, পর্যটন, ইলেকট্রনিকস পণ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ইত্যাদি।
অন্যদিকে নেপাল ইকোনমিক ফোরামের সিনিয়র ফেলো আমান প্যান্ট তার উপস্থাপনায় বলেন, নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে পণ্য আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ খুবই কম। দুই দেশের পারস্পরিক বাণিজ্য তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ১ শতাংশেরও কম। তিনি উল্লেখ করেন জ্বালানি, পর্যটন ও শিক্ষাক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশ নেপাল থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। চলতি বছরের জুনে ভারতের গ্রিড ব্যবহার করে বাংলাদেশ ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করেছে। ৯ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করতে হলে বাংলাদেশকে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা ছাড়া সেটা করা সম্ভব নয় বলে আলোচনায় উল্লেখ করেন। কারণ ভারতের গ্রিডলাইন ব্যবহার করেই বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আনতে হবে।
পর্যটনের বিষয়ে জানানো হয়, বাংলাদেশ নেপালের পঞ্চম আন্তর্জাতিক পর্যটন উৎস। ২০২৪ সালে ৪৮ হাজারের অধিক বাংলাদেশি পর্যটক নেপাল ভ্রমণ করেছেন। এটি সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক নেপালি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তাদের সংখ্যা সাড়ে ৩ হাজারের ওপরে। মূলত মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য নেপালি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে আসেন। এই শিক্ষার্থী ও পর্যটক আদান-প্রদানের সংখ্যা আরও অনেক বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে আমান উল্লেখ করেন।
সমাপনী বক্তব্যে ফাহমিদা খাতুন বলেন, আগামী বছর দুই দেশেরই এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটতে যাচ্ছে। সেজন্য দুই দেশের জন্যই সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। কোটামুক্ত বাজারের সুবিধা কমে আসবে। তাই আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে হবে।
