নীরবে চলে গেল ভয়াল সেই ৪ আগস্ট। গত বছরের এই দিনে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার তৎকালীন ওসি সহ ১৫ পুলিশ সদস্যকে নির্মম ও নির্দয় ভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আহত হয় ৩১ পুলিশ সদস্য। আহতদের অনেকেই এখনও ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তারা যেন একাই লড়ছেন।
বাংলাদেশ পুলিশসহ সারা দেশকে কাঁপিয়ে দেওয়া সেই হত্যাকাণ্ডের এক বছর হয়ে গেল অথচ এখনও থানাটি পরিদর্শনে যাননি সরকারের কোনো উপদেষ্টা বা পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। আগুনে পোড়া ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে নামমাত্র লজিস্টিক সাপোর্ট নিয়ে কাজ করছেন এ থানার পুলিশ সদস্যরা। তাদের মনোবল বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ। আহতরা পাননি কোনো সহায়তাও।
এ নিয়ে হতাশা কাজ করছে এ থানায় বর্তমানে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের মনে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে গত বছরের ৪ আগস্ট এনায়েতপুর থানায় হামলা হয়। গান পাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় থানা ভবনটি। পিটিয়ে হত্যা করা হয় ১৫ পুলিশ সদস্যকে। এ সময় আহত হন ৩১ পুলিশ সদস্য। এ হত্যা কান্ডের ঘটনায় একটি মাত্র মামলা হয়েছে। সন্দেহ ভাজন ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও এছাড়া সেটির তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। এ থানার তৎকালীন ওসি, পাঁচজন এসআই, একজন এএসআই ও আটজন কনস্টেবল সেদিন নিহত হন। সেই সময়কার তিনজন এখনও এ থানায় কর্মরত আছেন। বাঁকি ১৩ জনকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, শাহাজাদপুর ও চৌহালী উপজেলার সীমান্তবর্তী কিছু এলাকা নিয়ে এনায়েতপুর থানা গঠিত। সিরাজগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে চৌহালী, শাহজাদপুর ও বেলকুচি উপজেলার শেষ সীমানায় এ থানার অবস্থান। সম্প্রতি এনায়েতপুর থানায় গিয়ে এবং বদলি হওয়া পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে জানা গেছে তাদের আক্ষেপের কথা।
সেদিন নিহত হন যারা- সেদিন মারা যান পুলিশ পরিদর্শক (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক, এসআই তহসেনুজ্জামান, আনিছুর রহমান ও নাজমুল ইসলাম, প্রণবেশ কুমার বিশ্বাস ও রহিজ উদ্দিন, এএসআই ওবায়দুর রহমান, কনস্টেবল হুমায়ন কবির, আরিফুল আযম, হাফিজুল ইসলাম, আব্দুস সালেক, রিয়াজুল ইসলাম, হানিফ আলী ও শাহিন উদ্দিন। তারা আত্মসমর্পণের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এর আগে থানা আক্রমণের চেষ্টাকালে পুলিশ গুলি ছোড়ে। তাতে দুই শিক্ষার্থী ও এক তাঁত শ্রমিক নিহত হন। ওইদিন ১৬টি অস্ত্র ও সহস্রাধিক গোলাবারুদ লুটের ঘটনা ঘটে। এখনও ছয়টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।
যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ার আক্ষেপ-ভয়ংকর ওই ঘটনায় এনায়েতপুর থানার নাম দেশব্যাপী আলোচনায় উঠে আসে। থানাটিতে বর্তমানে কর্মরত অনেক পুলিশ সদস্য জানান, এখানে কাজ করতে তাদের মধ্যে অস্বস্তি কাজ করে। একই বাহিনীর এতোজন সদস্যকে এখানে নৃশংসভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে, সে ঘটনা তাদের ট্রমার মধ্যে ফেলেছে।
তারা বলছেন, পুলিশের মনোবল ফেরাতে কোনো কাউন্সেলিং করা হয়নি। এমনকি পুড়িয়ে দেওয়া ভবনটি যথাযথভাবে মেরামত করা হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে তাদের মনে উদ্বেগ রয়েছে। তারা জানান, ঘটনার প্রায় ৯ মাস পর গত ১লা মে থানা ভবনে ফিরতে পারেন পুলিশ সদস্যরা। ১লা মে থেকে সংস্কারকৃত থানা পুলিশের কার্যক্রম চলছে। এ থানার এএসআই জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের পর এ পর্যন্ত এ থানায় ৭২টি মামলা রেকর্ড হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনায়েতপুর থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর আমরা ভীষণভাবে ভেঙ্গে পড়েছি। সরকারি সম্পদ গোলাবারুদ ও নথিপত্র রক্ষা করতে গিয়ে আমাদের ১৫ জন সহকর্মী শহীদ হন। ঘটনাটি সরকার থেকে যথাযথ মূল্যায়ন না করায় আমরা মর্মাহত হয়েছি। পুরো থানা পোড়ানোর পর পুরোটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। তড়িঘড়ি করে মেরামত করার পর এ থানার কার্যক্রম শুরু করা হয়।
তিনি আরও বলেন, অগ্নিকান্ডে থানার পুরো নথিপত্র পুড়ে গেছে। একটি মাত্র অকেজো কম্পিউটার মেরামত করে মামলার কার্যক্রম চলছে। তাও প্রায়ই অচল হয়ে যায়। থানাটিতে তেমন কোনো লজিস্টিক সাপোর্ট নেই। আসামি ধরার পর থেকে শুরু করে কোর্টে চালান দেওয়া পর্যন্ত সব খরচ নিজেদের করতে হয়।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাদের কাছ থেকে শতভাগ কাজ আদায় করে নিতে চান। অথচ প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা দেবেন না। তাহলে কীভাবে দায়িত্ব পালন হবে। এক বছর হলো, এ পর্যন্ত আইজি বা কোনো উপদেষ্টা মহোদয় এনায়েতপুর থানা পরিদর্শনে আসেননি। তাহলে পুলিশের মনোবল বাড়াবে কীভাবে।
সেদিনের ঘটনায় আহত উপপরিদর্শক সুশান্ত কুমার মন্ডল বর্তমানে সিরাজগঞ্জ কোর্টে জিআরও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, ‘আমি মার খেয়ে থানার ওপরে পানির টাঙ্কির মধ্যে লুকিয়ে ছিলাম। পরে আমাকে সেনাবাহিনীর সহায়তায় জেলা পুলিশ উদ্ধার করে। এরপর হাসপাতালে নিজ খরচে চিকিৎসা নিয়েছি। অন্য আহত কনস্টেবল আলমগীর হোসেন একই মন্তব্য করেন।
সেদিন কনস্টেবল নাজরাতুন নাহারকে অন্তঃসত্ত্বা বলে প্রচার করে তাঁর সহকর্মীরা বাঁচিয়েছেন। তার আক্ষেপ তাকে বাঁচালো যারা সেই সহকর্মীদের কেউই বাঁচতে পারেননি। নাজরাতুন নাহার বর্তমানে শাহজাদপুর কোর্টে কর্মরত আছেন। তিনি কেঁদে কেঁদে সেদিনের ভয়াল ঘটনার বর্ণনা দেন। চিকিৎসার জন্য তিনি সরকারি আর্থিক সহযোগিতা পাননি বলেও জানান।
ওইদিন আহত এএসআই সৈকতুজ্জামান, কনস্টেবল জহুরুল, কনস্টেবল রেহানা পারভীন, কনস্টেবল আলমগীর, কনস্টেবল সুশান্ত কুমার, কনস্টেবল আলমগীর হোসেন সহ অন্তত ১০ জন আক্ষেপ করে সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ার কথা বলেন। তারা বলেন, সাহায্য তো দূরের কথা, কেউ এ পর্যন্ত তাদের খোঁজখবরও নেয়নি।
সিরাজগঞ্জ কোর্টে কর্মরত এসআই নাসরিন সুলতানার ভাশুর কনস্টেবল রবিউল ইসলাম সেদিন এনায়েতপুর থানায় প্রাণ হারান। এসআই নাসরিন বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে মারা গেলে সরকারিভাবে ৮ লাখ টাকা মানবিক সহায়তা প্রাপ্তির বিধান রয়েছে। আমার ভাশুর মারা যাওয়ার পর আমরা ওই টাকা ছাড়াও আরও ১৩ লাখ টাকার সহায়তা পেয়েছি।’
থানার পাশের বাড়ির বাসিন্দারা এখনও ট্রমায়-তাঁত মালিক বাবু প্রামাণিকের স্ত্রী মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ‘এক বছর হলো আমি এখনও ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। সেদিন আমার ও আমার ছেলে, নাতিপুতির সামনেই ১০-১২ জন পুলিশকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ থানার পাশেই আমার বাড়ি হওয়ায় অনেক পুলিশ থানার উত্তরের সীমানার ভাঙ্গা ওয়াল টপকে আমাদের তাঁত কারখানা, বাড়িঘর ও বাড়ির বাথরুমে আশ্রয় নিয়েছিলো। বাড়ির মধ্যে ঢুকে দফায় দফায় তাদের খুঁজে খুঁজে বের করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পাঁচ-ছয়জন পুলিশ আহত অবস্থায় হামলাকারীদেরও হাতে মার খেতে খেতে পালিয়ে যান। তখন থেকেই আমি অসুস্থ। এখনও আমাকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।’
আর আড্ডা দেন না পুলিশ-এনায়েতপুর থানা সংলগ্ন কাপড়ের হাটের চায়ের দোকানদার জোচন আলী ও তাঁর ছেলে সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আগে এ থানার পুলিশ সদস্যরা প্রায়ই বাইওে এসে আড্ডাদিতেন। আমাদের এখান থেকে চা খেয়ে যেতেন। লোকজনের সঙ্গে মাঝে মধ্যে গল্প করতেন। গত এক বছর থেকে আর এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না।’
এনায়েতপুর বাজার বণিক সমিতির সহ সভাপতি মোকতার হোসেন বলেন, ‘পুলিশের ট্রমা কাটাতে এলাকার রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা তাদের পাশে আছেন। এরপরও পুলিশকে আগের মতো দৌড়ঝাঁপ করতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।’
এ বিষয়ে বেলকুচি সার্কেলের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার হুমায়ন কবীর বলেন, ‘এনায়েতপুর থানায় কর্তব্যরত অবস্থায় সেদিন যারা নিহত হয়েছিলেন, তাদের প্রত্যককে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সরকারিভাবে ৮ লাখ টাকা থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত মানবিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে আর কিছু না।’ তিনি বলেন, এখানকার পুলিশ সদস্যদের মনোবল বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ‘ভস্মীভূত হওয়ার পর থানা ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। শুধু পলেস্তেরা প্রলেপ দিয়ে একে ঝুঁকিমুক্ত করা দুষ্কর।’
পুলিশ হত্যায় এক মামলা-১৫ পুলিশ সদস্যকে হত্যার পাশাপাশি সেদিন থানা ভবনে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর, অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। তবে এ ঘটনায় মামলা হয়েছে একটি। ঘটনার ২১ দিন পর গত বছরের ২৫ আগস্ট রাতে থানার এসআই আব্দুল মালেক বাদী হয়ে এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আহমদ মোস্তফা খান বাবু, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী, খুকনী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুল্লুক চাঁন ও ভাঙ্গাবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলামের নাম উল্লেখ সহ অজ্ঞাত ৬ হাজার জনকে আসামি করে মামলাটি করেন।
নিহত ৩ ছাত্র-জনতার পক্ষে তিনটি মামলা- নিহত কলেজছাত্র শিহাব হোসেন হত্যার অভিযোগে তাঁর পরিবারের পক্ষে এনায়েতপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সোলাইমান মামলা করেন। তাঁত শ্রমিক ইয়াহিয়া আলী হত্যায় তাঁর স্ত্রী শাহানা খাতুন এবং মাদরাসাছাত্র সিয়াম হোসেনের পরিবারের পক্ষে
এনায়েতপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হযরত আলী মামলা করেন। এসব মামলায় ২০০ জনের নাম উল্লেখ সহ অজ্ঞাত ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ১০০ জনকে আসামি করা হয়। প্রতিটি মামলায় সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, সাবেক এমপি আব্দুল মোমিন মণ্ডল, তাঁর ভাই আব্দুল আলীম মণ্ডল, জুবায়ের মণ্ডলসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে অভিন্ন এজাহারে আসামি করা হয়।
গুলি করল পুলিশ, আসামি নেতারা-শহীদ ইয়াহিয়া আলীর স্ত্রী শাহানা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে। অথচ পুলিশকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। সাবেক এমপি মমিন মণ্ডল সহ একাধিক আওয়ামীলীগ নেতাকে আসামি করা হয়েছে। লিখিত এজাহারে শুধু আমার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।
এনায়েতপুর থানার বর্তমান ওসি আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, এ থানার পুলিশ সদস্যরা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করছেন। তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষজন দিনে রাতে সব সময় ওসির কক্ষ সহ সব খানে খুব সহজে ঢুকতে পারছেন। থানায় টুকতে এখন আর কোনো দালাল লাগে না। তিনি আরও বলেন, এনায়েতপুর থানায় ১৫ পুলিশ হত্যার ঘটনায় নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনায় ৪ আগস্ট সোমবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থানা কক্ষে কোরআনখানি, দোয়া মাহফিল ও তবারক বিতরণ করা হয়েছে। তবে এতে বাইরের কাউকে রাখা হয়নি। শুধু পুলিশ সুপার মহোদয় সহ জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
মুন্সীগঞ্জে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কে ধানের চারা রোপন গ্রামবাসীর
এমন বাংলাদেশ গড়ব, যেখানে স্বৈরাচারের ঠাঁই হবে না
রায়েরবাজার গণকবরের ১১৪ মরদেহ উত্তোলনের আদেশ
গাইরায় রূপকথার বরফে মেতেছে পর্যটকরা
খুলনা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মনি ও সদস্য সচিব মুস্তাফিজুর রহমান