(ইএসপিএনক্রিকিনফোতে প্রকাশিত ভারতের সাবেক কোচ গ্রেগ চ্যাপেলের কলাম)
টেস্ট ক্রিকেটের এমন এক ক্ষমতা আছে যা দশক পেরিয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। যারা খেলেছেন বা দেখেছেন ক্রিকেট ইতিহাসের যুগান্তকারী কিছু মুহূর্ত, তাদের কাছে কিছু পারফরম্যান্স মনে করিয়ে দেয় সেইসব সময়কে — যখন কোনও দল শুধু একটা ম্যাচ জেতে না, বরং নিজেদের নতুন পরিচয় ঘোষণা করে। ২০২৫ সালের ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওভালে ভারতের অবিশ্বাস্য কামব্যাক জয় এমনই এক মুহূর্ত।
২-১ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও সিরিজ ২-২ এ সমতায় আনা, তাও আবার ইংল্যান্ডের অন্যতম আইকনিক ভেন্যুতে (যা আবার ভারতের জন্যও সৌভাগ্যের স্থান!), এটা শুধু ফলাফল সমতায় আনার ব্যাপার নয়। এটা ছিল এক শক্তিশালী বার্তা। আমার মনে করিয়ে দিল ১৯৭২ সালের অস্ট্রেলিয়ার অ্যাশেজ ড্রর কথা, যখন ইয়ান চ্যাপেলের নেতৃত্বে ওভালেই শেষ ম্যাচে সিরিজ ড্র করে আমাদের দল। সেই সিরিজ বদলে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের পথচলা, যা পরবর্তী দশককে সংজ্ঞায়িত করেছিল।
এই দুটি ঘটনার মধ্যে মিল অস্বীকার করা যায় না।
১৯৭২ সালে অস্ট্রেলিয়া এসেছিল রূপান্তরের সময়। বিল লরি, গ্রাহাম ম্যাকেঞ্জি, ইয়ান রেডপাথ — আগের যুগের নামগুলো — বিদায় নিয়েছেন। এক তরুণ দল, আমার ভাইয়ের নেতৃত্বে, অজানার মুখোমুখি হয়েছিল। যখন আমরা সিরিজ ড্র করতে শেষ টেস্ট জিতলাম, তখন শুধু সম্মান রক্ষা হয়নি, বরং একটি স্বর তৈরি হয়েছিল — আগ্রাসন, ঐক্য ও আত্মবিশ্বাসের স্বর — যা ৭০-এর দশকের সোনালী সময়কে ভিত্তি দিয়েছিল।
২০২৫ সালে ভারতও এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, রবিচন্দ্রণ অশ্বিন — কেউই দলে নেই। তাদের জায়গায় যারা এসেছে, তারা শুধু ঘাটতি পূরণ করেনি, তারা নিজেদের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করেছে। শুভমান গিল, যিনি অধিনায়কত্ব পেয়েছেন, শান্ত অথচ দৃঢ় নেতৃত্ব দিয়েছেন।
কখনও কখনও তাকে দেখে মনে হয়েছে খেলাটা যেন প্রবাহে ছেড়ে দিয়েছেন বা সময়মতো বোলার পরিবর্তন করছেন, তবে যথাযথ সহায়তা পেলে এই ভূমিকার সঙ্গে তিনি দ্রুত মানিয়ে নেবেন। তার কৌশল কখনও কখনও অদ্ভুত মনে হলেও এখন তার হাতে যথেষ্ট মর্যাদা আছে যাতে নির্বাচনে আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে পারেন।
আমার কাছে কুলদীপ যাদবকে না নেওয়াটা একেবারেই বোধগম্য নয়, তিনি একজন ম্যাচ জেতানো খেলোয়াড় হতে পারেন। এরকম ভুল শুধরে নিয়ে এবং বোলিংয়ের গভীরতা বাড়াতে পারলে এই দলটি ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।
গিলের ব্যাটিং ছিল অসাধারণ। যশস্বী জয়সওয়াল খেলেছেন নান্দনিকতা ও পরিপক্বতা দিয়ে। ঋষভ পান্ত এনে দিয়েছেন আগুন ও দৃঢ়তা, কে. এল. রাহুল ও রবীন্দ্র জাদেজা দিয়েছেন অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিকতা। আমি অবাক হব যদি ওয়াশিংটন সুন্দর ৫০ টেস্টের বেশি না খেলেন — আমি তাকে দলের প্রধান অলরাউন্ডার হিসেবে দেখতে পাচ্ছি।
আর তারপর মোহাম্মদ সিরাজ।
ওভালের জয়, ১৯৭২ সালের অস্ট্রেলিয়ার জয়ের মতোই, শুধুই পরিসংখ্যান নয়। এটা ছিল এক ঘোষণা। ভারতের এই তরুণ দল দেখিয়েছে, তারা কেবল ইতিহাসের উত্তরাধিকার পেতে অপেক্ষা করছে না — তারা নিজেরাই নতুন ইতিহাস গড়তে চায়।
আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রতীক ছিলেন গর্বিত যোদ্ধা মোহাম্মদ সিরাজ।
ছয় সপ্তাহে পাঁচ টেস্টে ১৮৫ ওভারের বেশি বল করা — শারীরিক, মানসিক ও আবেগগতভাবে এক বিশাল লড়াই। তাও আবার যখন জসপ্রিত বুমরাহ মাঝে মধ্যে অনুপস্থিত ছিলেন, সেই সময় আক্রমণের দায়িত্ব একাই কাঁধে নিয়েছেন তিনি। ওভালে শেষ ইনিংসে তার স্পেল — ম্যাচে ৯ উইকেট — জয় নিশ্চিত করেছিল। তবে সেই মুহূর্তে পৌঁছানোর যাত্রাটাই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ।
সিরাজ সিরিজ শুরু করেছিলেন দ্বিধান্বিতভাবে। আত্মবিশ্বাসের অভাব, ছন্দের ঘাটতি, এলোমেলো লাইন ও লেংথ। তার প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু প্রতি ম্যাচে তিনি উন্নতি করেছেন। শরীরী ভাষা বদলেছে, কাঁধ সোজা হয়েছে, রানআপ লম্বা হয়েছে, কবজির চাপে শাণ এসেছে, চোখের জ্বলন বেড়েছে। তিনি শুধু ছন্দে ফেরেননি, মর্যাদাও অর্জন করেছেন।
শেষ টেস্টে তিনি আর সহ-অভিনেতা ছিলেন না, তিনি প্রধান চরিত্র। দ্বিতীয় ইনিংসে জ্যাক ক্রলিকে যেভাবে আউট করেছেন — দেরিতে সুইং করে অফস্টাম্প ভেঙে দেওয়া বল — তা শুধু গতি বা সুইং নয়, ছিল বোঝাপড়া, নিখুঁত বাস্তবায়ন, নির্ভুলতা।
সিরাজের গল্প এক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের — শারীরিক, মানসিক, আবেগগত। তার মধ্যে এক আবেগী যোদ্ধা আছে, যিনি দুঃখকে শক্তিতে রূপান্তর করেন। তিনি শুধু উদ্দাম নন, সময় বোঝেন, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখেন।
আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে তার "উন্নয়ন" দেখে। তিনি সিরিজ শুরু করেছিলেন একজন আবেগী বোলার হিসেবে। শেষ করেছেন একজন দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে। এটাই পার্থক্য একজন খেলোয়াড় ও একজন নেতা হওয়ার মাঝে।
আমার মতে, সিরাজই ছিলেন সেই একক বড় কারণ যার জন্য ভারত এই সিরিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পেরেছে।
তিনি এর আগেও মেলবোর্ন, গ্যাবা, পার্থ, লর্ডস, কেপটাউন, বার্মিংহামে ভালো খেলেছেন। কিন্তু ওভালে যা করেছেন, সেটাই তার "পূর্ণ বয়সে পৌঁছানো"র সময়। বুমরাহ থাকুক বা না থাকুক, সিরাজ এখন গিলের আক্রমণের বাস্তব এবং আধ্যাত্মিক নেতা।
যদিও ভারতের জয় খবরের শিরোনাম হবে, কিন্তু ইংল্যান্ডের ভেতরের যাত্রাও এই সিরিজের আরেকটি সাবধানবাণী। বিশেষ করে হ্যারি ব্রুক, যিনি দুর্দান্ত কিন্তু খামখেয়ালি।
ব্রুকের মধ্যে রয়েছে ইংল্যান্ডের ভবিষ্যৎ ব্যাটিং তারকা হওয়ার সব গুণ। তবে ক্রিকেট — বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেট — শুধু শট খেলার খেলা নয়। এটা বোঝাপড়ার খেলা, কখন আক্রমণ করতে হবে, আর কখন সংযমী হতে হবে, তা বোঝার খেলা।
ওভালে ব্রুক যখন আউট হন, তখন ম্যাচের মোড় ঘুরতে পারত। ৩০১/৩ থেকে এক ব্যাটারের দরকার ছিল ধৈর্য ধরার। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন গৌরবের পথ — এবং আউট হন।
ইতিবাচক মানসিকতা খারাপ নয়। তবে তা যেন বেপরোয়া না হয়। ইতিবাচক মানে আত্মবিশ্বাসী এবং হিসেব করে ঝুঁকি নেওয়া। ব্রুক শিখছেন, এবং শিখবেন। কিন্তু ম্যাচজয়ী হতে হলে শুধু সৌন্দর্য নয়, সংগ্রামকেও আলিঙ্গন করতে হবে। জো রুট যেমন শুধু চোখধাঁধানো শটে নয়, দৃঢ়তায় সেরা ব্যাটার হয়েছেন। ব্রুককেও সেটা করতে হবে।
এই ভারত-ইংল্যান্ড সিরিজ শুধু ফলাফলের জন্য নয়, নাটকীয়তার জন্যও দীর্ঘদিন মনে থাকবে। ভূমিকাগুলোর পুনঃসংজ্ঞা, শারীরিক-মানসিক পরীক্ষার সিরিজ — সব মিলিয়ে ভারতই জয়ী হয়ে বেরিয়েছে। তারা পেয়েছে পরিচয়, দিশা, লক্ষ্য।
যেমনটা অস্ট্রেলিয়া করেছিল ১৯৭২ সালে, ভারত এখন বলে দিচ্ছে: “আমরাও প্রস্তুত। এবং আমরা কিছু গড়তে চলেছি।”
ক্রিকেট যেখানে চক্র ও উত্তরাধিকারের খেলা, সেখানে ১৯৭২ থেকে ২০২৫-এর ওভালের প্রতিধ্বনি হয়তো এক অদ্ভুত মিল হয়ে থাকবে।
ব্যাটন এখন তুলে নিয়েছে সিরাজ, পান্ত, জয়সওয়াল, ওয়াশিংটন ও গিল এবং এই সাহসী তরুণ ভারতীয় দল — যারা দৌড় শুরু করতে উদগ্রীব।
এমন ক্রিকেট আর কি দেখতে পাওয়া যাবে!
কোহলি-রোহিতদের ভবিষ্যত নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলবে ভারতীয় বোর্ড 