কৃষক বাঁচাতে টিসিবির মাধ্যমে আলু বিক্রির দাবি

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৫৮ এএম

ভর্তুকি মূল্যে সরকার বর্তমানে ৫৫ লাখ পরিবারের কাছে চাল, তেল, চিনি, ডালের মতো কয়েকটি পণ্য বিক্রি করে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। দেশে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেলে কখনো কখনো এ তালিকায় যোগ হয় পেঁয়াজও। এ পণ্যের সঙ্গে ১৫ টাকা কেজি দরে আলু দেওয়ার দাবি করেছে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন। এজন্য অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা অর্থ, খাদ্য, বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি সভা হলেও সেখান থেকে কোনো ফল পাওয়া আসেনি।

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন বলছে, দেশে এবারে চাহিদার তুলনায় ৪০ লাখ টন বেশি উৎপাদন হয়েছে। এতে করে আলুর দাম কমে গেছে। কোল্ড স্টোরেজ গেটে এলাকাভেদে আলু বিক্রি হচ্ছে ১৩ থেকে ১৫ টাকায়। অথচ এক কেজি আলু এবার উৎপাদন খরচ অন্তত ১৭ টাকা। এর সঙ্গে হিমাগার ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচ যোগ করলে এ খরচ দাঁড়ায় ২৫ টাকা। অর্থাৎ হিমাগার গেটে আলু বিক্রি হচ্ছে খরচের তুলনায় ৮ টাকা কমে। এতে করে কৃষক মারাত্মকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছে বলে জানায় কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন।

ঢাকার বাজারে অবশ্য প্রতি কেজি সাধারণমানের আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫-৩০ টাকায়। টিসিবি বলছে, গত বছর এ সময়ে অবশ্য প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছে অন্তত ৬০ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ গত বছরের এ সময়ে আলু বিক্রি হয়েছে দ্বিগুণ দামে। গত বছর আবার প্রায় ২০ লাখ টন আলুর উৎপাদন কম হয়েছিল বলে দাবি ছিল কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের। যে কারণে এবার গত বছরের চেয়েও ১০ লাখ টন বেশি আলুু কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা হয়েছে। যে কারণে সারা বছরই চড়া দামে আলু কিনতে হয় ভোক্তাকে। আলু চাষের সময় হওয়া বৃষ্টি, বাড়তি দামের কারণে আগাম তুলে ফেলাসহ নানা কারণেই আলুর চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম ছিল, যে কারণে ভুগতে হয়েছে ভোক্তাকে।

শুধু গত বছরই নয়, গত দ্ইু-তিন বছর ধরেই আলুর বাজার ছিল চড়া। সে সুবাদেই এ বছর বেশি বেশি আলু উৎপাদন করেছেন। এতেই মাঠে মারা পড়েছেন। মৌসুমের শুরুতে অনেক কৃষক দাম না রাস্তায় আলু ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এদিকে দেশ থেকে এবারে আলু রপ্তানিও হচ্ছে, তবে সেটা স্থানীয় বাজারকে খুব বেশি প্রভাবিত করছে পারছে না। এ কারণে আলুর দাম তলানিতে পড়ে আছে।

সরকার টিসিবির মাধ্যমে এক কোটি কার্ডধারী পরিবারকে ভর্তুকি মূল্যে বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ করে। তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর খোঁজ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিনিধিরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন এর মধ্যে ৪৫ লাখ কার্ডই প্রকৃত দরিদ্র মানুষের হাতে নেই। সরকারি চাকরিজীবী, রাজনীতিবিদ, সহ-প্রভাবশালী ও বড় কর্তাদের পরিবারকে এসব কার্ড দিয়ে রাখা ছিল। পরে এই ৪৫ লাখ কার্ড বাতিল করে নতুন তালিকা করছে সরকার। এখন ভর্তুকি মূল্যে ৫৫ লাখ পরিবারকে এ সহায়তা দেওয়া হয়। এর বাইরে বিভিন্ন শহরাঞ্চলের শ্রমঘন স্থানগুলোতে টিসিবির ট্রাক সেলের মাধ্যমেও ভর্তুকি মূল্যের এসব পণ্য বিক্রি করা হয়।

কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের এই অ্যাসোসিয়েশন দাবি করছে, সরকার যদি এ ভর্তুকি মূল্যের পণ্যের সঙ্গে ১০ কেজি করে আলু বিতরণ করে তাহলে কৃষক সুরক্ষা পাবে। কারণ এতে করে আলুর ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে এবং আলুচাষিদের প্রতি সরকারের দৃঢ় সমর্থনের বিষয়ে কৃষকও আশ্বস্ত হবেন। বাজারে এর একটা প্রভাব পড়লে কৃষকরাও ন্যায্যমূল্য পাবেন।

জানা গেছে, এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি মিটিং হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। একে কৃষি খাদ্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন আলু রপ্তানিকারক, ব্যবসায়ী ও কোল্ড স্টোরেজের মালিকরা। তবে এ সভাটি আলুর দাম নিয়ে কৃষকের সংকট মেটানোর জন্য হলেও সেখানে গুরুত্ব পেয়েছে রপ্তানি। টিসিবির পণ্য তালিকায় আলু যোগ করতে যে পরিমাণ বাজেট দরকার, তা বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না বলে সভায় জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব।

কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, সভায় আলুর দাম নিয়ে যে সংকট সেটা আসলে গুরুত্ব পায়নি। পেয়েছে রপ্তানির বিষয়। তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচিতে আলু বিতরণ করা হলে আমাদের কোল্ড স্টোরেজগুলোতে যে অতিরিক্ত ১০ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে, সেটা কিন্তু সরবরাহ হয়ে যেত। এতে করে কৃষকও বাঁচত। কারণ কোল্ড স্টোরেজে ৯০ শতাংশ আলুই কৃষকের। দাম কমের কারণে

কৃষক যদি এই আলু উত্তোলন না করে তাহলে কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের দেড় হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনতে হবে।

তিনি আরও বলেন, একেবারে দাম বেড়ে যাওয়া, আবার একেবারে দাম কমে যাওয়া দুটোই খারাপ। বেড়ে গেলে যেভাবে সরকার দায়িত্ব নেয়, কমে গেলেও কৃষকের দায়িত্ব সরকারের নেওয়া উচিত।

জানা গেছে, সরকার এ সংকট দূর করতে কৃষি, বাণিজ্য, খাদ্য এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের চার সচিবকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছে। যাদের এ বিষয়ে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে কমিটি হলেও এই কমিটি এখনো কোনো বৈঠক করতে পারেনি বলে জানা গেছে।

কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন বলছে, দেশে এখন ৪০০-এর কাছাকাছি কোল্ড স্টোরেজ রয়েছে। এর মধ্যে ৩৫৩টি স্টোরেজে ৩৪ লাখ ৯০ হাজার টন আলু সংরক্ষিত রয়েছে, যা গত বছর ছিল ২৪ লাখ ৪০ হাজার টন এবং ২০২৩ সালে ছিল ২৩ লাখ টন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত