কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশখালীর ঐতিহ্যের মৃৎশিল্প

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৫, ০৫:০৫ পিএম

উষা রুদ্র (৪৩) বাঁশখালীর সাধনপুর ইউনিয়নের রুদ্রপাড়া মহিদ রুদ্রের স্ত্রী। ২০১১ সালে মহিদ্র রুদ্র হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করলে উষার জীবনে হতাশা ও চরম অনিশ্চয়তা নেমে আসে। ছেলে মেয়েদের নিয়ে উপার্জন ক্ষম কেউ না থাকাতে দুচোখে অন্ধকার মনে হয়। সেই থেকে পিতা মাতার আমলের পেশা কামার-কুমারের কাজকে আলিঙ্গন করে জীবন নির্বাহ করছে। স্বামী মহিদ্র রুদ্র থাকাকালীন মৃৎশিল্পের মাটির হাড়ি-পাতিলসহ নানা ধরনের জিনিসপত্র তৈরিতে সহযোগিতা করলেও বর্তমানে জীবনের তাগিদে ছেলে সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য কামার কুমারের কাজকে আকঁড়ে ধরতে হয়েছে। এ কাজে নিজেকে জড়িয়ে ধুপধানি, টাকবাতি (প্রদীপ) সরা, বসরী ষাট, ছোট প্রদীপ, বরুনা, পেয়ালা, ভাপা পিঠা, মনসাপুজার ঘট, ছোট কাট পরিবারের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরি করে জীবন নির্বাহ করে।

এসব করতে গিয়ে দীনতার কোনও অন্ত নেই। বৃষ্টি হলে কাজে দুর্ভোগ বাড়ে জিনিসপত্র তৈরি ও মালামাল শুকাতে। এই মৃৎশিল্পের প্রধান কাঁচামাল এটেল মাটি। এই মাটি এখন সহজে পাওয়া যায় না। গভীর জঙ্গল বা পাহাড় অঞ্চলের ৬০-৭০ ফুট গভীর গিয়ে সেখান থেকে অনেক কষ্টে এই মাটি সংগ্রহ করতে হয়। কাজ শেষে হিসেব করে দেখা যায় আয়ের চেয়ে ব্যয় হয় বেশি। বাজারে এই পণ্যের চাহিদা না থাকা, পর্যাপ্ত কাচাঁমালের অভাব এবং পরিবহন সমস্যার কারণে বাপ-দাদার ঐতিহ্যের এই পেশাটি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এ সময় মাটি অনায়াসে পাওয়া গেলেও বর্তমানে মাটি কিনতে হয়। এ ছাড়া ঘাস লাকড়ি, পন ঠিক করে হাতের তৈরিকৃত মালামাল গুলো বিক্রি যোগ্য করতে প্রায় মাস খানেক সময় লাগে। ফলে অর্থ কষ্ট ও সংসারের নানাবিধ খবর জোগাতে গিয়ে চরম দুর্বিসহ হতাশায় ভরে যায় চলার পথ। তার ওপর মাটির তৈরি জিনিসপত্রগুলো আগের মতো দামও পাওয়া যায় না।

বর্তমানে তার কাছে তৈরিকৃত মাটির প্রায় নানা প্রকৃতির ৮ হাজার টাকার মতো মালামাল থাকলে ও তার পাইকারি ক্রেতা না আসাতে বিক্রি করাও সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান। বর্তমানে ছেলে গোবিন্দ রুদ্র বর্তমানে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে, আর মেয়ে কলি রুদ্রকে কয়দিন আগে বিয়ে দেওয়া হয় ধারদেনা করে।

তিনি জানান, কিছুদিন আগে স্থায়ীত্বশীল উন্নয়ন সংগঠন ইপসার আয়োজনে সেভ দ্যা চিলড্রেনের সহযোগিতায় দুর্যোগ প্রস্তুতি ও পূর্বাভাসমূলক কর্মপদ্ধতি বিষয়ে নারী উদোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ’ প্রদান করে বাঁশখালী উপজেলা অফিসার্স ক্লাব হলরুমে। সেখানে অংশগ্রহণ করে, প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদের পক্ষ থেকে অনুদান প্রদান করে সেটা নিয়ে এ বৃষ্টির দিনে কার্যক্রম চালিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় কাঁচা মালামাল ক্রয় করেছি। তা দিয়ে ধুপধানি, টাকবাতি (প্রদীপ) সরা, বসরী ষাট, ছোট প্রদীপ, বরুনা, পেয়ালা ভাপা পিঠা, মনসাপুজার ঘট, ছোট কাট পরিবারের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরি করে জীবন নির্বাহ করছি।

একই কথা বললেন চুকমী রুদ্র ও রিখা রুদ্র। তারা বলেন, এক সময় মৃৎশিল্পের নাম-ডাক ছিল বেশ। নানা কারুকার্য ও বাহারি নকশার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর চাহিদাও ছিল, প্রতিটি ঘরে ঘরে ছিল মৃৎশিল্পের তৈরি আসবাবপত্র। এই মৃৎশিল্পে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত অসংখ্য কুমার-কুমারী। বর্তমানে আমাদের জীবন চলে নানা হতাশায়, বেচাবিক্রি নেই, চাহিদা আগের মতো নেই। যদি সরকার কিংবা কোনো বেসরকারি সংস্থা আমাদের পাশে দাঁড়াত তাহলে আমাদের এ পেশাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হত বলে তারা জানান।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজ ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি বিলুপ্তির পথে। চারু বালা রুদ্র (১০৩) বলেন, আমার জন্ম ও বিয়ে এ গ্রামে, জন্মের পর থেকে এ কাজে জড়িত, মাটির জিনিসপত্র ব্যবহার না করে বর্তমানে সিলভার ও মেলামাইন ব্যবহার করাতে লোকজনের রোগব্যাধি বেশি হচ্ছে। অথচ মাটির তালা বাসনে খাবার খেলে ও কলসিতে পানি রাখলে ফ্রিজের প্রয়োজন হয়না বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

ক্ষেত্রমোহন রুদ্র বলেন, সাধনপুরের এ রুদ্র পাড়ায় ৫০/৬০ পরিবারের বসবাস। যাদের কাজ শুধু মাটির তৈরি জিনিস পত্র তৈরি করা। বর্তমানে আমরা নানা সমস্যায় দিন যাপন করছি বলে তিনি জানান।

বাঁশখালী উপজেলার সাধনপুর, কালিপুর, বৈলছড়ি,পৌরসভার জলদী, শিলকূপ, চাম্বল, পুকুরিয়া, ও পুইছড়ি ইউনিয়নের অসংখ্য মৃৎশিল্পীরা তাদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করতো। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকার এসে ভিড় জমাত এই গ্র্রামগুলোতে। বাসন-কোসন, সরা, সুরাই, হাঁড়ি-পাতিল, পেয়ালা, মটকা, ব্যাংক, থালা, বাটি, ফুলের টব, কলসি, পিঠা তৈরির ছাঁচসহ নিত্য প্রয়োজনীয় এসব জিনিসের চাহিদাও ছিল আকাশচুম্বী। হাট বাজার গুলোতে পরসা বসাতে মৃৎশিল্পীরা, আর মাথায় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে গ্রামের মেটোপথে ছুটে চলত ব্যবসায়ীরা। 

অথচ কালের বিবর্তনে এখন গ্র্রামগুলোতে গুটি কয়েক পরিবার এই পেশায় কাজ করে কোনমতে জীবিকা নির্বাহ করে। মৃৎশিল্পে নিয়োজিত বাঁশখালীর রুদ্র পাড়ার লোকজনার প্রত্যাশা সরকার কিংবা সেরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে ঐতিহ্যবাহী এ মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখবে সে দিনের প্রত্যাশায় সময় পার করছেন তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত