দুদক ও সিআইডির মামলা

১২ লাখ শ্রমিকের মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্ন ভঙ্গের শঙ্কা

  • আগামীকাল মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা
  • সফরের আগে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার চান সংশ্লিষ্টরা
  • অপ্রমাণিত মামলা ও অভিযোগ প্রত্যাহারে সরকারকে মালয়েশিয়ার চিঠি
  • জবাবে মামলা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়ন হয়নি  
  • মামলার কারণে মালয়েশিয়ার টিআইপি সূচক তলানিতে 
আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৫, ০৭:২২ পিএম

মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্তাধীন মামলাগুলো বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা। এতে করে অন্তত ১২ লাখ শ্রমিকের মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্ন চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশে করা কিছু মামলা নিয়ে মালয়েশিয়া সরকার উদ্বেগ জানিয়েছে। কারণ, এসব মামলা সে দেশের ডিজিটাল অভিবাসন ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, যা ১৪টি দেশের শ্রমিকের জন্য স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। এর ফলে মানবপাচার সূচক বা টিআইপি র‌্যাংকিংয়ে-এ মালয়েশিয়ার অবস্থান নেমে গেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ পেতেও সমস্যা হতে পারে, যা উভয় দেশের জন্যই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় হুমকি।

বাংলাদেশ এই বিষয়টিতে আশানুরূপ গুরুত্ব না দিলেও মালয়েশিয়া বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। গত ২৩ এপ্রিল মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে একটি চিঠি দেয়। এতে তারা ২০২২-২০২৪ সালের মধ্যে করা মানব-পাচার ও অর্থ পাচারের অভিযোগগুলোকে ‘অপ্রমাণিত’ এবং ‘হয়রানিমূলক’ আখ্যা দিয়ে সেগুলো প্রত্যাহারের অনুরোধ জানায়।

চিঠির জবাবে বাংলাদেশ সরকার মামলাগুলো প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও অধিকাংশ মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। পল্টন থানায় করা মানব পাচারের একটি মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে সিআইডি এবং আদালত তা গ্রহণ করেছে। কিন্তু একই থানায় করা অর্থ পাচারের মামলা এখনও তদন্তাধীন। এছাড়া সরকারি সংস্থা হিসেবে দুদক এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা করেছে এবং কিছু অনুসন্ধান চলমান আছে। সেগুলো এখন পর্যন্ত প্রত্যাহার হয়নি।

আগামীকাল (১১ আগস্ট) মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জনশক্তি রপ্তানিতে অগ্রগতি আনতে হলে এই সফরের আগেই মামলাগুলো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি বা প্রত্যাহার জরুরি বলে মনে করছেন অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, এসব মামলার কারণে মালয়েশিয়ার মানব পাচার র‍্যাংকিংয়ে তলানিতে ঠেকেছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উভয় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। অথচ এসব মামলায় কোনো ভুক্তভোগী শ্রমিক অভিযোগ করেনি; বরং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব থেকে মামলা হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত ২৬ এপ্রিল মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে একটি চিঠি পাঠানো হয়। 

মালয়েশিয়ার চিঠিতে বলা হয়, ওই চিঠিতে বলা হয়েছে মালয়েশিয়ায় ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ শ্রমিক নিয়োগ সম্পর্কিত উত্থাপিত অভিযোগ গুলো তারা পর্যালোচনা করেছে। সেখানকার ফরেন ওয়ার্কার সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস)কে তারা একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং ডিজিটালাইজড নিয়োগ কাঠামো হিসেবে বলেছে।

তারা চিঠিতে আরও বলেছে, ‘সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় কর্মীদের অভিবাসন সম্পর্কিত সমস্ত বিচারাধীন মামলা ও অভিযোগের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করা হয়েছে। মামলাগুলো হয়রানিমূলক ও অপ্রমাণিত হওয়ায় সেগুলো প্রত্যাহার করা, অনুসন্ধান বা তদন্ত থেকে বাদ দেওয়ার উপায় খোঁজার অনুরোধ করে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বলেন, দেশের স্বার্থে দুদক ও সিআইডির মামলাগুলো প্রত্যাহার করা উচিত। আর না হয় ১২ লাখ শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যেতে পারবে না।

মালয়েশিয়া চিঠিতে বলেছে, যাদের বিরুদ্ধে মামলার রেকর্ড হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সহায়ক প্রমাণ সরবরাহ করা হয়নি। তাছাড়া ইতোপূর্বে খারিজ হওয়া মামলাগুলি পুনরুজ্জীবিত বন্ধের বিষয়ে তারা তাগিদ দেয়।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার বাংলাদেশী কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। এটা মূলত উভয় সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত আনুষ্ঠানিক নিয়োগ চ্যানেলের মাধ্যমে হয়েছে। এসব শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে মানব পাচারের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।  চিঠিতে মালয়েশিয়া সরকার স্বচ্ছ এবং নীতিগত নিয়োগ অনুশীলনের মাধ্যমে তাদের টিআইপি (মানব পাচার র‍্যাংকিং) বজায় রাখা এবং উন্নত করার জন্য বাংলাদেশের সহযোগিতা চেয়েছে।’

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, মালয়েশিয়ার চিঠির পর গত মে মাসে ঢাকায় যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির সভা হয়। ওই সভায় দুপক্ষই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে। পরে গত আগস্ট মাসে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্লাহ মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ মন্ত্রণালয় করে চিঠির জবাব দেন।

ওই চিঠিতে কি উল্লেখ করা হয়েছে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, ‘চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শ্রমিক নিয়োগ নিয়ে উত্থাপিত ‘মানব পাচার’ এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ গুলো মূলত অপ্রমাণিত। এসব অভিযোগ মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে। ওই সময়ের মধ্যে উভয় সরকারের লাইসেন্সপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ৪ লাখ ৮০ হাজারের বেশি বাংলাদেশী কর্মীকে দু’দেশের সম্মতিতে নিয়োগ করা হয়েছে। গত মে মাসের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় সভায় সমস্ত বিচারাধীন অভিযোগ বা মামলা পর্যালোচনা করা এবং মালয়েশিয়ায় কর্মী সরবরাহের ‘অপ্রমাণিত অভিযোগ’ প্রত্যাহার করা এবং পারস্পরিক আস্থা পুনরুদ্ধার করার কথা বলা হয়। বাংলাদেশ সরকার মনে করে এসব মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে মানব পাচার র‍্যাংকিং (টিআইপি) সংরক্ষণ এবং উন্নত করা সম্ভব হবে।’

জনশক্তি রপ্তানি সংশ্লিষ্টরা জানান, মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়ার পর ইতোমধ্যে সিআইডিতে তদন্তাধীন থাকা রাজধানীর পল্টন থানায় করা মানবপাচারের মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু অর্থপাচারের অভিযোগটি সিআইডিতে তদন্তাধীন রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত শ্রমিক নিয়োগে কাজ করা কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। মালয়েশিয়া সরকার ইতোমধ্যে মামলাগুলো ‘অপ্রমাণিত’ ও ‘হয়রানীমূলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাই প্রধান উপদেষ্টার মালয়েশিয়ার সফরে যাওয়ার আগে মামলাগুলো প্রত্যাহার হওয়া জরুরী। এর আগে ১০ রিক্রুটিং লাইসেন্স যখন মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠিয়েছিল তখনও দুদক মামলা করেছিল। কিন্তু সেগুলো পরে প্রমাণ না হওয়ায় ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে।’

জনশক্তি রপ্তানি সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, মূলত ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব থেকে ব্যবসায়ীদের এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের বিরুদ্ধে করা মামলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। অথচ কোন ভুক্তভোগী বা পাচারের স্বীকার কোনো শ্রমিক মামলা করছে না। দুদেশের সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে শ্রমিক পাঠানো হয়েছে। সেখানে মানব-পাচার বা অর্থপাচারের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ইতোপূর্বে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা মালয়েশিয়া সরকারকে সকল ধরনের অনুসন্ধান, মামলা ও তদন্ত প্রত্যাহার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেই প্রতিশ্রুতির চার মাস পেরিয়ে গেলেও মামলাগুলো প্রত্যাহার হয়নি। এখন প্রধান উপদেষ্টার সফরের সময় যদি মামলাগুলো প্রত্যাহার বা ফাইনাল রিপোর্ট সংক্রান্ত নথি মালয়েশিয়ান কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা যায়; তাহলে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দ্রুতই বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য উন্মুক্ত হবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।

মামলা প্রত্যাহার বা মালয়েশিয়ার চিঠির এবিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নেয়ামত উল্ল্যা ভূঁইয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য করতে চাননি।

মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী বলেন, ‘আমার কাছে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো প্রস্তাব বা সুপারিশ আসেনি। আমার মনে হয় বিষয়টি এখনো সচিব বা ডিজি পর্যায়ে আছে।’

মালয়েশিয়ার বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে অনেক বড় ও রেমিট্যান্স আরোহণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে বায়রার মহাসচিব মুক্তিযোদ্ধা আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের কোনো রিক্রুটিং এজেন্সি ব্যবসা করলো, কোনো এজেন্সি করলো না সেটা বড় বিষয় নয়। বড় বিষয় হচ্ছে কম অভিবাসন ব্যয় বা শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে আমাদের শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মসংস্থান। আমরা চাই আমাদের শ্রমিকরা ভালো থাকুক, দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি হোক।’

আর সেজন্য মামলা প্রত্যাহারসহ সরকারের যা করণীয় সব করার উচিত বলে মনে করেন রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের সংগঠনের এই নেতা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত