ছাত্রলীগও ছাত্রদলে, জাবির হল রাজনীতিতে বিতর্ক

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৫, ০৮:০৯ পিএম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের বর্ধিত কমিটি এবং ১৭টি আবাসিক হলের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কমিটিতে হত্যা মামলার আসামি এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ কর্মী এবং ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত না তাদেরকে পদ দেওয়ার পর থেকে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

গত শুক্রবার ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ৩৭০ সদস্যের বর্ধিত কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই দিনে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন (বাবর) ও সদস্যসচিব ওয়াসিম আহমেদ স্বাক্ষরিত পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে ১৭টি আবাসিক হল ও ১টি অনুষদের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এর আগে গত ৬ জানুয়ারি ১৭৭ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। সেই হিসাবে কমিটির সদস্যসংখ্যা ৫৪৭ জন।

ছাত্রদলের বর্ধিত কমিটি ও হল কমিটি ঘোষণার পর শাখা ছাত্রদলের একটি অংশ নবগঠিত কমিটি প্রত্যাখান করেছেন। কমিটি সংস্কার করে পুনর্গঠনের দাবিতে গত শুক্রবার রাতে সংগঠনটির অন্তত ৩০ জন নেতাকর্মী বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। তাদের অভিযোগ, বর্ধিত কমিটিতে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীকে পদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও হল কমিটিতে অছাত্র ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকেও পদ দেওয়া হয়েছে।

শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্ধিত কমিটিতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল এমন কয়েকজনকে পদ দেওয়া হয়েছে। হল কমিটিতেও অছাত্র ও ছাত্রলীগের কর্মীদের পদ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে চিহ্নিত করে, তাদেরকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করতে হবে।

নবগঠিত বর্ধিত কমিটি ও ১৭টি হলের কমিটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শামীম মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় করা মামলার আসামি (বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কৃত) হামিদুল্লাহ সালমান, রাজু আহমেদ ও মোহাম্মদ রাজন মিয়া ছাত্রদলে পদ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে হামিদুল্লাহ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল ছাত্রদলের সভাপতি, রাজু শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং রাজন সদস্যপদ পেয়েছেন।

এছাড়াও শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এমন কয়েকজন ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। তাদের মধ্যে রোকেয়া হলে সভাপতি পদ পেয়েছেন কাজী মৌসুমী আফরোজ। তিনি শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে তাকে।

২১ নম্বর ছাত্র হলে সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া ফিরোজ আহমেদ এবং একই হলের সহসভাপতি সাইদুর রহমানও ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতেন।

১০ নম্বর হল ছাত্রদলের সভাপতি সাইফ বিন মাহবুব, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রাকিব মাওলা, বর্ধিত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক পদ পাওয়া মো. শাকুর বাপ্পী, বর্ধিত কমিটির সদস্য শুভজিৎ বিশ্বাস, শাবাব সবুজ অর্ণব, ইমরান আজিজ—তাদের সবাইকে বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগের মিছিল-সমাবেশে দেখা গেছে। তবে তারা ছাত্রলীগের কোনো পদে ছিলেন না।

এ ছাড়া শহীদ সালাম-বরকত হল ছাত্রদলের সভাপতির পদ পাওয়া সাইদুল ইসলাম ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের একাংশের বিগত কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন।

আ ফ ম কামালউদ্দিন হল ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতির দায়িত্ব পাওয়া খাইরুল ইসলাম (নাহিদ) ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। শাখা ছাত্রদলের বর্ধিত কমিটির সদস্য হয়েছেন আল আমিন, ইমন মোল্লা, তানভিরুল আরেফিন কবির পাপন। তাদের ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখা গেছে। এ ছাড়া তারা হলে ছাত্রলীগের রাজনৈতিক ব্লকের কক্ষে থাকতেন।

রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও তাদেরকে ছাত্রদলের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। নবগঠিত হল কমিটির অন্তত তিন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থাকার পরও কমিটিতে তাদের পদ দেওয়া হয়েছে। ওই তিনজন হলেন বীর প্রতীক তারামন বিবি হলের যুগ্ম সম্পাদক নোসিস মোকাররমা তেরেসা, রিফা নানজীবা হিয়া এবং নওয়াব ফয়জুন্নেসা হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক উম্মে হাবিবা।

এছাড়াও ছিনতাই, মাদকের কারণে বহিষ্কৃত হয়েও কমিটিতে পদ পেয়েছেন তিন শিক্ষার্থী। থার্টিফার্স্ট নাইটে মাদকসহ আটক হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার হওয়া শিপন হোসাইন ও সতীর্থ বিশ্বাস বাঁধন সদস্য হিসেবে বর্ধিত কমিটিতে স্থান পেয়েছেন।

গত বছরের ২৯ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরতে আসা স্কুলশিক্ষার্থীর কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের অভিযোগে বহিষ্কার হয়েছিলেন ইমরান নাজিজ। তাকেও রাখা হয়েছে কমিটিতে।

এদিকে সমালোচনার মুখে ছাত্রদলের হল কমিটি ঘোষণার দুই দিনের মাথায় আজ রবিবার (১০ আগস্ট) সকালে সমালোচনার মুখে মওলানা ভাসানী হল কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

ছাত্রত্ব না থাকার বিষয়ে তথ্য গোপন করার কারণে এবং মিথ্যা তথ্য প্রদান করার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর বলেন, যথেষ্ট যাচাই-বাছাই করে কমিটি করা হয়েছে। এ ছাড়া কাউকে না জানিয়ে কমিটিতে পদ দেওয়া হয়নি। কমিটির জন্য ফরম পূরণ করা হয়েছিল। যারা পূরণ করেছিলেন, তাদের মধ্য থেকে পদ দেওয়া হয়েছে। যোগ্যদেরকেই পদ দেওয়া হয়েছে। কমিটিতে যোগ্য কাউকে অবমূল্যায়ন করা হয়নি। আমরা এখনও যাচাই-বাছাই করছি। কারো বিরুদ্ধে তথ্য গোপন করার বা ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শাখা ছাত্রদলের হল কমিটি ঘোষণার পর ওইদিন রাতে সংবাদ সম্মেলন করে উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। এ কমিটির মাধ্যমে আবাসিক হলে কালো রাজনীতি ফেরার শঙ্কায় প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। এসময় সংগঠনটির নেতারা হলে ফের রাজনীতি চালু হলে, গণরুম, গেস্টরুম, জোরপূর্বক মিছিল-মিটিংয়ে নেওয়া, সিট সংকট, অস্ত্র মজুদ ইত্যাদি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তেব্যে বাগছাসের জাবি শাখার আহ্বায়ক আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, ‘জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল হলগুলোতে রাজনৈতিক কমিটি গঠন করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এই প্রাণের চাওয়াকে উপেক্ষা করেছে। এর মাধ্যমে হলগুলোতে পুনরায় গণরুম, গেস্টরুম ও র‌্যাগিং সংস্কৃতি ফেরত আসবে, যা হবে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনায় সাথে চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা।

আবাসিক হলে রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গতকাল শনিবার রাতে আবাসিক হলের ভেতরে সকল প্রকার রাজনীতি নিষিদ্ধসহ ছয় দফা দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন একদল শিক্ষার্থী।

অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে ইতিহাস বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ বলেন, আমরা বিগত বছরগুলোতে দেখেছি হল পলিটিক্স এর মাধ্যমে ছাত্রলীগ কীভাবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল। আমরা চাই না নতুন করে আবার সেই পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসুক। আমরা চাই আমাদের হলগুলোতে সকল প্রকার ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করতে হবে এবং অনতিবিলম্বে সকল রাজনৈতিক দলের ঘোষিত হল কমিটিগুলো বাতিল করতে হবে।

সেসময় উপস্থিত হয়ে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, ‘আমি শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো লিখিত আকারে পেশ করার কথা বলেছি। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল এবং হল প্রাধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে এ ব্যাপারে একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত দিতে পারব বলে আশা করি।’

আবাসিক হলে সুষ্ঠুধারার ছাত্র রাজনীতি চর্চার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ছাত্র ইউনিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের একাংশের সভাপতি অদ্রি অংকুর। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণরুম, গেস্টরুমের পুনরাবৃত্তি আমরা আর মেনে নেব না। আমরা এই (ছাত্রদলের) হল কমিটি গুলোতে দেখতে পেয়েছি নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের অনেক কর্মী, নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী শামীম মোল্লার খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরাসহ নানা অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িত অনেক শিক্ষার্থী জায়গা পেয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা এই ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার আহবান জানাচ্ছি।

কোনো সংগঠন হলে রাজনৈতিক চর্চার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামতকে প্রাধন্য দেওয়া উচিত বলে মনে করেন শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের মতামতকে উপেক্ষা করে কখনো আবাসিক হলে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাবো না। অন্য সংগঠনের রাজনীতি নিয়ে আমাদের মতামত নেই। সম্প্রতি ছাত্রদল হল কমিটি দিয়েছে। ছাত্রদল যদি শিক্ষার্থীদের আপত্তি স্বত্বেও হলে রাজনৈতিক চর্চা করে তাহলে তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট জাবি শাখার (মার্ক্সবাদী) সংগঠক সজিব আহমেদ বলেন,ছাত্ররাজনীতি প্রত্যেক শিক্ষার্থীর গণতান্ত্রিক অধিকার। যদি কোন সংগঠনের উদ্দেশ্য থাকে যে, হলের  সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করবে তাহলে হল রাজনীতি করতে পারে, কিন্তু সেই উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের সামনে পরিস্কার থাকতে হবে। হলের গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষা করেই হলে রাজনীতি করতে হবে। তবে এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যে, কোন রকম নিপীড়নমূলক রাজনীতি, আধিপত্যের রাজনীতি  দাঁড়াতে দেওয়া যাবে না। কিন্তু কারও রাজনীতি করার অধিকার হরণ করে, রাজনীতি বন্ধ করে নিপীড়ন, নির্যাতন ঠেকানো যাবে না।

তবে ছাত্রদলের রাজনীতির মাধ্যমে আবাসিক হলে আর কখনো গণরুম, গেস্টরুমের মতো অপসংস্কৃতি ফিরবে না বলে মনে করেন শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, হলের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মতামত নিয়েই আমরা হল কমিটি দিয়েছি। এখনও অধিকাংশ শিক্ষার্থী হল রাজনীতির পক্ষে। তবে শিক্ষার্থী চার হলগুলোতে ছাত্রলীগের মতো অপসংস্কৃতির চর্চা না হোক। আমরাও আশাবাদী ছাত্রদলের মাধ্যমে গণরুম, গেস্টরুমের অপসংস্কৃতি ফিরে আসবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত