কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের মধ্যে বহুল আলোচিত আলাস্কা বৈঠক শেষ হয়েছে। ‘পারসুয়িং পিস’ শীর্ষক ওই বৈঠকে ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির কোনো সিদ্ধান্তও আসেনি। অবশ্য বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই নেতাই বলছেন, আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, আলোচনায় অগ্রগতি হলেও এখনো লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেননি তারা। তবে তার ভাষ্য, পরে এ নিয়ে অগ্রগতি অর্জনের জন্য খুব ভালো সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে পুতিন বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধ হোক তা তিনিও আন্তরিকভাবে চান। তবে তার আগে যুদ্ধের কারণ অনুসন্ধান করে তা সমাধান করতে হবে।
বৈঠকের আলোচ্য বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানা না গেলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প-পুতিনের বৈঠকের মধ্য দিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধবিরতে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। অনিশ্চয়তার কালো মেঘের আড়াল থেকে দেখা গেছে আলোর ঝিলিক। কারণ, বৈঠকের পরই ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, ন্যাটো প্রধান ও ইউরোপের নেতাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলবেন। সে মোতাবেক তিনি ওই দিনই জেলেনস্কিকে ফোনও দিয়েছিলেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, আগামী সোমবার ওয়াশিংটন ডিসিতে ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠক হবে।
সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় আগে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইউক্রেন বা রাশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প ও পুতিনের এই বৈঠক ছিল বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণকারী একটি ঘটনা। ২০১৯ সালের পর এটিই ছিল দুই নেতার প্রথম মুখোমুখি সাক্ষাৎ। বৈঠকের আগে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে এই আশা জাগে যে, এটি ইউক্রেনে চলমান সংঘাতের একটি সমাধান সূত্র বের করতে পারে। তবে বৈঠকের ফল সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি, যদিও এটি ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য একটি পথ তৈরি করেছে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজ শহরের একটি সামরিক ঘাঁটিতে অনুষ্ঠিত ওই দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। রাশিয়ার পক্ষে পুতিনের সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ। প্রায় তিন ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার আলোচনা শেষে দুই নেতা যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। তবে এই সম্মেলনে তারা সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন গ্রহণ করেননি, যা অনেকের কাছে হতাশাজনক বলে মনে হয়েছে। ট্রাম্প বৈঠকটিকে ‘ফলপ্রসূ’আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘অনেক বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। কিছু জটিল বিষয়ের সমাধান না এলেও আলোচনায় অগ্রগতি এসেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত বলা যায় না আমরা সমঝোতায় পৌঁছেছি।’
তিনি জানান, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এবং ন্যাটো জোটের নেতাদের সঙ্গে ফোনে আলোচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন।
অন্যদিকে, পুতিন তার বক্তব্যে ইউক্রেন যুদ্ধের ‘মূল কারণ’ নিরসনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনে যা ঘটেছে তার সঙ্গে রাশিয়ার নিরাপত্তা সরাসরি জড়িত। স্থায়ী শান্তির জন্য সংঘাতের মূল কারণগুলো সমাধান করতে হবে।’
পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন ও ট্রাম্পের উদ্যোগের প্রশংসা করলেও ইউক্রেন ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। পুতিনের ভাষ্য, শান্তি প্রক্রিয়ায় বাধা বা উসকানিমূলক পদক্ষেপ সংকট সমাধানে বাধা সৃষ্টি করবে।
এদিকে বৈঠকের ফল নিয়ে বিশ্ব জুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বৈঠকটিকে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে বিবিসির উত্তর আমেরিকা সংবাদদাতা অ্যান্থনি জুরচারের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, এই বৈঠক ট্রাম্পের ‘চুক্তির কারিগর’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ধাক্কা দিয়েছে। জুরচার মনে করেন, ট্রাম্পের বক্তব্য যে চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত কিছু অর্জিত হয়েছে বলা যায় না, তা বৈঠকের ফলশূন্যতারই ইঙ্গিত দেয়।
ইউক্রেনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বৈঠক সাময়িক স্বস্তি দিলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। বিবিসি মনিটরিংয়ের রাশিয়ান সম্পাদক ভিটালি শেভচেঙ্কোর মতে, পুতিনের ‘সংঘাতের মূল কারণ’ নিরসনের বক্তব্য ইউক্রেনের জন্য উদ্বেগজনক। কিয়েভের ভাষায় এটি ইউক্রেনের স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জ করার ইঙ্গিত বহন করে। ফলে ইউক্রেনের জনগণ আশঙ্কায় রয়েছে যে, রাশিয়া তাদের আগ্রাসী নীতি অব্যাহত রাখতে পারে।
এদিকে বৈঠকের পর ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বৈঠকটিকে ‘১০/১০’হিসেবে মূল্যায়ন করলেও তিনি রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি। তিনি শুধু জানান, আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে বিবেচনা করা হবে। এর আগে তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, রাশিয়া যুদ্ধবিরতির জন্য এগিয়ে না এলে এর পরিণতি ভয়াবহ হবে। অন্যদিকে, পুতিনের মস্কোতে পরবর্তী বৈঠকের আমন্ত্রণ ইঙ্গিত দেয় যে, আলোচনা এখনো শেষ হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আলাস্কার এই বৈঠক ইউক্রেন যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট ফল আনতে না পারলেও এটি দুই পরাশক্তির মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার একটি দ্বার উন্মোচন করেছে। ট্রাম্প ও পুতিন উভয়েই আলোচনার ধারাবাহিকতার প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে ইউক্রেনের জন্য এই বৈঠকের ফলশূন্যতা এবং পুতিনের ‘মূল কারণ’ নিরসনের বক্তব্য উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সোমবার ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির বৈঠক : ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, আগামী সোমবার ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রামে একটি বার্তায় তিনি বলেছেন, তিনি ‘আমন্ত্রণের জন্য কৃতজ্ঞ’।
আলাস্কায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে জেলেনস্কির সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘দীর্ঘ’ ফোনালাপ হয় বলে জানিয়েছিল হোয়াইট হাউজ।
জেলেনস্কির সঙ্গে আলাপের পর ট্রাস্প ন্যাটোর নেতাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন বলে জানান হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। ইউক্রেনও এরপর নিশ্চিত করে যে ট্রাম্প এবং ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে ‘দীর্ঘ ফোনালাপ’ করেছেন জেলেনস্কি।
তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এটি একটি দীর্ঘ ফোনালাপ ছিল। প্রথমে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এবং ট্রাম্পের মধ্যে, তারপরে ইউরোপীয় নেতারা এতে যোগ দিয়েছিলেন।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, রাশিয়ার সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা ভালো হলে দ্বিতীয় বৈঠক হতে পারে এবং তিনি জেলেনস্কিকে কল করতে পারেন।
এদিকে, এক লিখিত বিবৃতিতে জেলেনস্কি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তার ‘দীর্ঘ ও বাস্তবসম্মত’ কথোপকথন হয়েছে। প্রথমে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে একান্তে এবং তারপর ইউরোপীয় নেতাদের নিয়ে যৌথভাবে কথা বলেছেন।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারও জেলেনস্কি-ট্রাম্পের ফোনালাপে যুক্ত হয়েছিলেন বলে নিশ্চিত করেছে তার কার্যালয়। পরে কিয়ের স্টারমার গতকাল সকালে দ্বিতীয়বারের মতো জেলেনস্কির সঙ্গে কথা বলেন। তিনি ইউরোপীয় ন্যাটো নেতাদের এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একটি গ্রুপ কলে যোগ দেন।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই দ্বিতীয় কলে যোগ দেননি। এই কলে যে নেতারা যোগ দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎস, পোলেন্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যারল নওরোকি, ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজা-ার স্টাব, ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে এবং ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন দের লেয়েন ছিলেন।
এদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনের ওভাল অফিসের বিপর্যয়কর বৈঠকের পর ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য ইউক্রেনের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টার প্রতিফলন হিসেবে হচ্ছে এই পদক্ষেপকে।
এখন ট্রাম্প-জেলেনস্কি বৈঠক, ভবিষ্যতে মস্কোতে সম্ভাব্য বৈঠক, ট্রাম্পের ন্যাটো ও ইউরোপের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা আগামীর গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে। পুরো বিশ্বও মুখিয়ে আছে আলোচনার এই ধারাবাহিকতা শান্তির পথে কতটা অগ্রসর হতে পারে সেদিকে।
