জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় নূন্যতম পাশ নাম্বার ২৬.৪ পেলেই ভর্তি হতে পারতেন পোষ্য কোটাধারীরা। প্রতি বিভাগে সর্বোচ্চ চারজন করে ১৪৮ জনের ভর্তির সুযোগ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাধিক সন্তান, স্ত্রী ও ভাই-বোন এ সুবিধা পেতেন। সর্বশেষ পাঁচ বছরে এসব সুবিধায় আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল পোষ্যকোটা বাতিল ঘোষণা করেছিলেন। তবে প্রথম বর্ষের ভর্তি কার্যক্রমের শেষ পর্যায়ে এসে পোষ্যকোটাকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা’ নাম দিয়ে পুনরায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গত বুধবার (১৩ আগস্ট) রাতে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরিচালনা কমিটির এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর কোটাবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী সরকারের পতনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ভিসি কোটা বাতিল এবং মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও পোষ্যকোটা সংস্কারের দাবি তোলেন শিক্ষার্থীরা।
গত বছরের ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভিসি কোটা বাতিল ও মুক্তিযোদ্ধা সংস্কার করলেও পোষ্যকোটার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। পরে চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি পোষ্যকোটাকে অযৌক্তিক উল্লেখ করে যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে আমৃত্যু গণঅনশন শুরু করেন ১৪ জন শিক্ষার্থী।
এরপর উপাচার্যের আশ্বাসে ১৯ ঘণ্টা অনশনের পর পরদিন সকালে অনশন ভাঙেন তারা। ওইদিন রাতেই পোষ্য কোটায় ভর্তির ক্ষেত্রে নতুন সিদ্ধান্ত জানান উপাচার্য। সে সময় উপাচার্য নতুন যে সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন সেগুলো হলো—পোষ্য কোটায় মোট ৪০টি আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে এবং শুধু সন্তানের ক্ষেত্রে এ সুবিধা পাবেন সংশ্লিষ্টরা। পোষ্য কোটাধারীদের সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশ পাস মার্ক থাকতে হবে।
এ ঘটনার পরদিন ৪ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনের ওই সংস্কারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ওইদিন একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন তারা। এ সময় ভবনের দেয়ালে শিক্ষার্থীদের লাগানো ‘পোষ্য কোটা বাতিল করো’ পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেন কয়েকজন কর্মচারী।
পোস্টার ছেঁড়ার প্রতিবাদ জানাতে কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রশাসনিক ভবনের সামনে গেলে কর্মচারীদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। তখন এক শিক্ষার্থীকে একজন কর্মচারী ধাক্কা দেন বলে অভিযোগ করন শিক্ষার্থীরা।
এ ঘটনা জানাজানি হলে বিভিন্ন আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা এসে প্রশাসনিক ভবনের সামনে জড়ো হন এবং দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এরপর চার শতাশিক শিক্ষার্থী একটি মিছিল নিয়ে পোষ্যকোটা পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানিয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন ও প্রশাসনিক ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পোষ্য কোটা সম্পূর্ণরূপে বাতিল ঘোষণা করেন।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, উপাচার্য পোষ্যকোটা বাতিল ঘোষণার পর আবার সেটা ভিন্ন নামে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।
তবে প্রশাসন বলছে, পোষ্যকোটা সম্পূর্ণরুপে ফিরিয়ে আনা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা রয়েছে সেটার আওতায় তাদের সন্তানদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে।
পোষ্য ভর্তির ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগ পর্যালোচনা করে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি বিবেচনায় নিয়ে পোষ্য ভর্তির নিয়ম সংস্কারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরিচালনা কমিটি নীতিগতভাবে একমত পোষণ করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার রাতে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সকল অনুষদের ডিনসহ প্রশাসনের বিভিন্ন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় পোষ্য ভর্তিতে পূর্বের নিয়মগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় সংস্কার করে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর শুধু একজন ঔরসজাত/গর্ভজাত সন্তান পোষ্য হিসেবে ভর্তির সুযোগ পাবে, প্রতিটি বিভাগে সর্বোচ্চ ৪ জন ভর্তি হতে পারবে। তবে সর্বমোট ৪০ জনের অধিক ভর্তি করা যাবে না, পোষ্য ভর্তির ক্ষেত্রে ন্যুনতম পাশ নম্বর ৪০% (লিখিত ৮০ নম্বরের মধ্যে) থাকতে হবে এবং কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সন্তানকে তার কর্মরত বিভাগে পোষ্য হিসেবে ভর্তি করতে পারবেন না।
এ বিষয়ে পোষ্য কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ জাবি শাখার আহ্বায়ক আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, পোষ্য ভর্তি নিয়ে প্রশাসন যে ধৃষ্টতা দেখালেন, তাতে আমরা সত্যিই মর্মাহত। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে বাতিল হওয়া পোষ্য ভর্তি ফের চালু করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। অবিলম্বে প্রশাসনকে শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে যৌক্তিক অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের শিক্ষা শাখার তথ্য বলছে, গত ৫ বছরে মোট ২৭৮ জন শিক্ষার্থী পোষ্য কোটায় ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ৫৯ জন, ২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ৫৬ জন, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ৫৪ জন, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ৫৬ জন, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ৫৩ জন ভর্তি হয়েছেন। এদেট মধ্যে ভর্তি পরীক্ষায় শুধু পাস নম্বর ২৬ দশমিক ৪ পেয়েই পছন্দের বিষয়ে ভর্তির সুযোগও পেয়েছেন অনেকে।
পোষ্য কোটার জটিলতায় প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরুতেও দেরি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের (৫৪তম ব্যাচ) ভর্তি পরীক্ষা গত ৯ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় যা শেষ হয়েছিল ১৭ ফেব্রুয়ারি। অন্যান্য কয়কটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যায়ে এই শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার ৬ মাস পরেও ক্লাস শুরু করতে পারেনি। পোষ্যকোটার হিসাব-নিকাশে ভর্তি কার্যক্রম পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী এখনো ৬১টি আসন শূন্য রয়েছে।
ফলে ভর্তির শুরুতেই অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছেন নবীন শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে ৫৪তম ব্যাচে ভর্তি হওয়া নবীন শিক্ষার্থী সামিয়া জামান বলেন, আমাদের বন্ধুবান্ধবরা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু করে অনেকে পরীক্ষা দিচ্ছে সেখানে আমাদের এখনো ভর্তি কার্যক্রমই শেষ হয়নি। বাসায় বসে থেকে আমরা এক ধরনের মানসিকভাবে হতাশার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।
এ বিষয়ে জানতে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসানের কার্যালয়ে গেলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে জানান তার ব্যাক্তিগত সহকারী। মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
তবে গত শনিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞাপ্তিতে বলা হয়, কেন্দ্রীয় ভর্তি পরিচালনা কমিটির সভায় পোষ্য ভর্তির ক্ষেত্রে নানা ধরণের অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় তাদের দাবির প্রেক্ষিতে পোষ্য ভর্তির নিয়ম সংস্কারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ভর্তি পরিচালনা কমিটি নীতিগতভাবে একমত পোষণ করে।
একইসাথে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ থেকে পোষ্য ভর্তির বিষয়টি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সকল অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট পর্ষদে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে শর্ত মেনে পোষ্যদেরকে ভর্তি হতে হবে।
