ওষুধ পাটজাত পণ্যসহ সাত খাতে বাণিজ্য বৃদ্ধির আশা

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৫, ০৭:২৩ এএম

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পরিবর্তনের পর থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে উদ্যোগী হয় পাকিস্তান। এবার যৌথ বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়াতে ঢাকায় আসছেন পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান। আগামীকাল রাত সাড়ে ১১টায় এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে তার।

বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া চার দিনের (২৪ আগস্ট ঢাকা ত্যাগ করবেন তিনি) সফরে বাণিজ্য, শিল্প ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে জাম কামাল খানের। একই সঙ্গে তিনি টাঙ্গাইল ও চট্টগ্রামের দুটি শিল্প-কারখানা পরিদর্শনের পাশাপাশি তিনটি বাণিজ্য সংগঠনের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করতে পারেন বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। সফরের সময় সরকারের চারটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চারটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার সম্ভাবনা রয়েছে, যা দুই দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করবে।

সরকারের মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় সাতটি খাতের ব্যবসাকে সামনে রেখে চলতে পারে। ওষুধ শিল্প, কৃষি ও খাদ্যপণ্য, ইস্পাত শিল্প, পাট ও পাটজাত পণ্য, বস্ত্র ও পোশাক খাত, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ডিজিটাল পণ্য ও সেবা খাতের বিষয়গুলো আলোচনায় প্রাধান্য পেতে পারে। বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়াতে কীভাবে এ খাতগুলো পণ্য ও সেবার আমদানি-রপ্তানিতে ভূমিকা রাখতে পারে, তা আলোচনার টেবিলে উঠে আসবে।

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের সফর খুব গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রীর এ সফরে আমরা দুই দেশের বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করব। দুই দেশের আগ্রহের পণ্যগুলোর আমদানি-রপ্তানি সহজ করতে আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি করব।’ 

জানা গেছে, খাতভিত্তিক আলোচনার ক্ষেত্রে পাকিস্তান সুতা (কটন ইয়ার্ন, ফেব্রিক) রপ্তানি করে, যা বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ পাকিস্তানে তৈরি পোশাক রপ্তানির সম্ভাবনার বিষয়টি আলোচনায় তুলবে। যদিও পাকিস্তান টেক্সটাইল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। পাকিস্তান গম, চাল, ফল ও শুকনো খাবার (খেজুর, বাদাম) রপ্তানি করে, বাংলাদেশের বাজারে যেসবের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের সুযোগ রয়েছে মিঠা পানির মাছ, চিংড়ি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার রপ্তানি করার।

বাংলাদেশের ওষুধ পাকিস্তানের বাজারে রপ্তানির বড় সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ। ওষুধ সাশ্রয়ী ও প্রতিযোগিতামূলক দামে রপ্তানি করা যায় কি না, সে বিষয়ে আলোচনা তুলবে বাংলাদেশ। অন্যদিকে পাকিস্তানে পাটের চাহিদা (বস্তা, কার্পেট ব্যাকিং) থাকলেও বাংলাদেশ থেকে সরাসরি রপ্তানি সীমিত। বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়লে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্য (জুতা, ব্যাগ) পাকিস্তানের বাজারে বিক্রয়ের সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ইস্পাত খাতের পণ্য রপ্তানি, সফটওয়্যার পণ্য, আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতে বাংলাদেশের দক্ষতা বিনিময়ে সহযোগিতার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, সর্বশেষ গত অর্থবছরে বাংলাদেশ পাকিস্তানে ৪ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। একই সময়ে ৬২ কোটি ৪৪ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, ২০০১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান বাংলাদেশে ১৮ কোটি ৩২ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে।  এটা খুবই সামান্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যাংক, টেক্সটাইল এবং ওয়্যারিং, ট্রেডিং, কনস্ট্রাকশন, ওষুধ ও অন্যান্য খাতে অল্প বিনিয়োগ রয়েছে।

পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খানের সফরের সম্ভাব্যসূচি থেকে জানা গেছে, সফরের প্রথম দিনে শিল্প, খাদ্য ও বাণিজ্য উপদেষ্টার সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে পাকিস্তানি বাণিজ্যমন্ত্রীর। এদিন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্র্রির (ডিসিসিআই) ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও তার বৈঠক হতে পারে। রাতে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে রাতের খাবারের আয়োজন থাকতে পারে।

সফরের দ্বিতীয় দিনে চট্টগ্রাম ভ্রমণ করবেন পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্র্রির ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হতে পারে। সেখানে তার বিএসআরের ইস্পাত কারখানা পরিদর্শনের কথা রয়েছে। চট্টগ্রামে ভ্রমণ শেষে তৃতীয় দিন সকালে তিনি ঢাকায় ফিরবেন। সেদিন ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে স্কয়ার গ্রুপের ওষুধ কারখানা পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে।

শেষ দিনেও পাকিস্তানি বাণিজ্যমন্ত্রীর ব্যস্ত সূচি থাকতে পারে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাণিজ্য উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র্র উপদেষ্টা, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, সিটিবি, ট্যারিফ কমিশন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি, বিডা, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রধানদের সঙ্গে একটি সভা হবে। সেখানে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারও উপস্থিত থাকতে পারেন। এরপর তার দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্র্রির (এফবিসিসিআই) ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। ওই বৈঠকের পর হতে পারে বেশ কিছু সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর। ২৪ আগস্ট পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তার।

গত এপ্রিলে ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচ। পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রীর ঢাকা সফরের মধ্যেই ২৩ আগস্ট দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের দুদিনের সফরে ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজনৈতিক স্তরে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত