উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক

অভিজ্ঞরাই নেতৃত্ব দেবেন রাজস্ব খাতে

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৫১ এএম

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুই ভাগ করে জারি করা অধ্যাদেশের সংশোধনী উপদেষ্টা পরিষদে পাস হয়েছে। এতে ১১টি সংশোধন আনা হয়েছে, যার অন্যতম প্রধান সংশোধন হলো রাজস্বনীতি বিভাগে রাজস্ব খাতের অভিজ্ঞ ও যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মকর্তাকে প্রধান করা হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

সভা শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের এ সংশোধনীর বিষয়ে অবহিত করেন।

গত ১২ মে এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এ দুটি বিভাগ করার অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এরপর থেকে এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে যৌক্তিক সংস্কারে দাবিতে প্রায় দেড় মাস আন্দোলন করেন।

ব্রিফিংয়ে প্রেস সচিব বলেন, এনবিআরের দুটি নতুন ইউনিটের প্রধান বাছাই করা হবে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে। প্রয়োজন হলে যেকোনো ক্যাডার থেকেই নিয়োগ দেওয়া হবে। এটি আজকের (গতকালের) বৈঠকে উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত।

শফিকুল আলম আরও বলেন, সরকারের রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করতে চলতি বছর ১২ মে ‘রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থা অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারি করা হয়। অধ্যাদেশ জারির পর এর কয়েকটি ধারা নিয়ে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনা হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, বন্দর ও রাজস্ব আদায় কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে গত ২৯ জুন উপদেষ্টা পরিষদ একটি কমিটি গঠন করে। এতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, এনবিআর সদস্য, বিসিএস ট্যাক্সেশন ও কাস্টমস ক্যাডার প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সংস্কারসংক্রান্ত পরামর্শ কমিটির সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

যেসব সংশোধন করা হয়েছে : ধারা-৪-এর উপধারা (৩) এ রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫ বলা হয়েছিল, সরকার উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে রাজস্বনীতি বিভাগের সচিব পদে নিয়োগ করবে। এখন সংশোধন করে বলা হয়েছে, সরকার সামষ্টিক অর্থনীতি, বাণিজ্যনীতি, পরিকল্পনা, রাজস্বনীতি বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনা কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে রাজস্বনীতি বিভাগের সচিব পদে নিয়োগ প্রদান করবে।

ধারা-৪-এর উপধারা (৪) এ আগে বলা হয়েছিল, রাজস্বনীতি বিভাগের বিভিন্ন পদ আয়কর, মূল্য সংযোজন কর, কাস্টমস, অর্থনীতি, ব্যবসা প্রশাসন, গবেষণা ও পরিসংখ্যান, প্রশাসন, নিরীক্ষা ও হিসাব এবং আইনসংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের থেকে পূরণযোগ্য হবে।

সংশোধনে বলা হয়েছে, রাজস্বনীতি বিভাগের আয়করনীতি, দ্বৈতকর পরিহার চুক্তি, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও মতামত, শুল্কনীতি, মূল্য সংযোজন করনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কাস্টমস-সংক্রান্ত চুক্তি অনুবিভাগের বিভিন্ন পদ রাজস্ব আহরণ-সংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে পূরণযোগ্য হবে।

ধারা-৪-এর উপধারা (৪ ক) এ সংশোধনীতে একটি নতুন উপধারা সংযোজন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাজস্বনীতি বিভাগের অন্য অনুবিভাগের পদে জনপ্রশাসন, অর্থনীতি, বাণিজ্যনীতি, গবেষণা ও পরিসংখ্যান, হিসাব ও নিরীক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ এবং আইন প্রণয়নসংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তা বা ব্যক্তিদের মধ্য থেকে পূরণ করা হবে।

ধারা-৫-এর দফা (চ) এ মূল অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, কর আইন প্রয়োগ এবং কর আহরণ পরিস্থিতির মূল্যায়ন। সংশোধনীতে বলা হয়েছে, রাজস্বনীতি, কর ব্যয় ও রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতির প্রভাব বিশ্লেষণ।

ধারা-৭-এর উপধারা (৩) অধ্যাদেশে আগে বলা হয়েছিল, সরকার রাজস্ব আহরণ-সংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞতা আছে এমন যোগ্য কোনো সরকারি কর্মচারীকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান করবে।

এখন সংশোধনীতে বলা হয়েছে, সরকার রাজস্ব আহরণসংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞতা আছে এমন যোগ্য কোনো সরকারি কর্মচারীকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব পদে নিয়োগ প্রদান করবে।

আগে ধারা-৭-এর উপধারা (৪) এ বলা হয়েছিল, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের আয়কর, মূল্য সংযোজন কর ও কাস্টমস আইন বাস্তবায়ন এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগের বিভিন্ন পদে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (শুল্ক ও আবগারি) এবং বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (কর) ক্যাডারে কর্মরত জনবলের মধ্য থেকে নিয়োগ করা হবে।

এখন সংশোধনীতে বলা হয়েছে, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের আয়কর, মূল্য সংযোজন কর, কাস্টমস আইন বাস্তবায়ন এবং মাঠপর্যায়ের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগের বিভিন্ন পদ রাজস্ব আহরণ-সংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে পূরণযোগ্য হবে।

ধারা-৭-এর উপধারা (৫) এ মূল অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রশাসনিক অনুবিভাগের বিভিন্ন পদ বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন), বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (কর), বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (শুল্ক ও আবগারি) ক্যাডার এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রশাসনিক অনুবিভাগের বিভিন্ন পদ রাজস্ব আহরণ ও জনপ্রশাসন-সংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে পূরণযোগ্য হবে।

এখন সংশোধন করা হয়েছে যে, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রশাসনিক অনুবিভাগের বিভিন্ন পদ রাজস্ব আহরণ ও জনপ্রশাসন-সংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে পূরণযোগ্য হবে।

ধারা-৭-এর উপধারা (৬) এ বলা হয়েছিল, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ কর্তৃক তফসিলে বর্ণিত আইনগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে নিয়োজিত পদগুলো বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (কর), বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (শুদ্ধ ও আবগারি) ক্যাডারে কর্মরত কর্মকর্তা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মচারীদের থেকে পূরণযোগ্য হবে।

সংশোধনীতে বলা হয়েছে, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ কর্তৃক তফসিলে বর্ণিত আইনগুলো বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট মাঠপর্যায়ের পদগুলো রাজস্ব আহরণ-সংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মচারীদের থেকে পূরণযোগ্য হবে।

ধারা-৮-এর দফা (জ) এর মূল অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত পদ্ধতি প্রণয়ন। সংশোধনীতে বলা হয়, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান, প্রজ্ঞাপন, রুলিং, নীতিমালা, স্থায়ী আদেশ ও অন্য নির্দেশাবলি প্রণয়ন, সংশোধন ও তাদের ব্যাখ্যা প্রদান।

ধারা-৮-এর দফা (ট) এ মূল অধ্যাদেশে বলা হয়, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের আন্তঃশাখা এবং রাজস্বনীতি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের মধ্যে আন্তঃসংযোগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সার্বিক অটোমেশন কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা।

এখন সংশোধনীতে বলা হলো, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের অটোমেশন কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন এবং আন্তঃউইং, রাজস্বনীতি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের মধ্যে আন্তঃসংযোগ প্রতিষ্ঠা।

ধারা-৯-এ আগে বলা হয়েছিল, রাজস্বনীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিদ্যমান জনবল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে ন্যস্ত হবে এবং ন্যস্ত করা জনবল থেকে প্রয়োজনীয় জনবল রাজস্বনীতি বিভাগে পদায়ন করা যাবে।

সংশোধনীতে বলা হয়েছে, রাজস্বনীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিদ্যমান জনবল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে ন্যস্ত হবে এবং ন্যস্ত করা জনবল থেকে প্রয়োজনীয় জনবল বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে রাজস্বনীতি বিভাগে পদায়ন করা যাবে।

বাংলাদেশ-পাকিস্তান; ‘ভিসা লাগবে না’ অফিশিয়াল পাসপোর্টধারীদের : বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক ও অফিশিয়াল পাসপোর্টধারীরা দুই দেশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারবেন। গতকাল উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক ভিসা অব্যাহতি চুক্তির খসড়া অনুমোদন করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ।

এ বিষয়ে প্রেস সচিব বলেন, পাকিস্তানের মতো এরকম চুক্তি আমরা আরও ৩১টি দেশের সঙ্গে করেছি, এ চুক্তি হবে পাঁচ বছরের জন্য। এর ফলে যারা অফিশিয়াল পাসপোর্ট এবং কূটনীতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন, তারা এখন বিনা ভিসায় পাকিস্তান সফর করতে পারবেন। একইভাবে পাকিস্তানের যারা অফিশিয়াল এবং কূটনীতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন, তারাও বাংলাদেশে সফর করতে পারবেন, কোনো ভিসা ছাড়াই। এটা একটা স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস।

বিগত সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে বেশি চুরি হয়েছে জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, তাদের পছন্দের লোকদের এ খাতে চুরির লাইসেন্স দিয়েছিলেন। এ ছাড়া রাষ্ট্র সংস্কারে গঠিত ১০টি সংস্কার কমিশনের ৩৬৭টি সংস্কার প্রস্তাব আশু বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার বলেও জানান শফিকুল আলম।

ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এবং সিনিয়র সহরকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত