বাবা মায়ের কোল থেকে নানা চড়াই-উতরাইয়ের পর বীরগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে বেড়ে ওঠা মনি-মুক্তা পা দিয়েছে ১৬ বছরে, এসেছে স্বাভাবিক জীবনে। ২০০৯ সালের ২২ আগস্ট দিনাজপুরের পার্বতীপুর ল্যাম্ব হাসপাতালে জন্ম হয় দুই জমজ শিশুর। কিন্তু দেখা গেল, তাদের পেট জোড়া লাগা, পাকস্থলী সংযুক্ত! শিশুর জন্মের পর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার শতগ্রাম ইউনিয়নের পালপাড়ার শরৎ চন্দ্র পাল ও কৃষ্ণা রানী পাল পড়েন চরম দুশ্চিন্তায়। রংপুরের চিকিৎসকদের পরামর্শে ২০১০ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকা শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয় শিশু মনি ও মুক্তাকে। ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিশু হাসপাতালে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এ আর খানের সফল অপারেশনের মাধ্যমে মনি-মুক্তা ভিন্ন সত্তা লাভ করে, যা বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানে সৃষ্টি হয় এক নতুন ইতিহাস।
মনি-মুক্তা এখন স্থানীয় ঝাড়বাড়ী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্রী। সাইকেল চালিয়েই তারা স্কুলে যায়। পড়ালেখার পাশাপাশি কো-কারিকুলামেও পারদর্শী। হতে চায় চিকিৎসক, সেবা করতে চায় দুস্থ-অসহায় মানুষের। আজ নিজ বাড়িতে পালন করা হবে মনি-মুক্তার জন্মদিন। প্রতি বছর বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মনি-মুক্তার বন্ধু-বান্ধবসহ প্রতিবেশী এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে কেক কেটে জন্মবার্ষিকী পালন করা হয়।
জন্মদিনে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছে মনি-মুক্তা। বড় হয়ে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন তাদের। মনি বলে, আমাদের জন্মের পর স্বাভাবিক ছিলাম না। সেই সময়ের যে ছবিগুলো তোলা হয়েছিল তা দেখে বুঝেছি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বদৌলতে আমরা আজ স্বাভাবিক জীবনযাপন করছি। তাই আমাদের ইচ্ছা চিকিৎসক হওয়া। চিকিৎসক হয়ে আমরা গরিব, অসুস্থ, অসহায় মানুষের সেবা করতে চাই।
মুক্তা বলে, আমাদের গর্ব হয় যে আমরা বাংলাদেশে প্রথম সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পৃথক হয়েছি। চিকিৎসক এ আর খানসহ যেসব চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা আমাদের এ পর্যন্ত আসতে সহায়তা করেছে তাদের কাছে আমরা চির কৃতজ্ঞ। সবার কাছে দোয়া কামনা করি, যাতে মানুষের মতো মানুষ হতে পারি। যাতে চিকিৎসক হতে পারি।
শত বাধা পেরিয়ে মনি ও মুক্তা পৌঁছে যাক তাদের গন্তব্যে, এমন চাওয়া বাবা ও মায়ের। তবে পরিবারের সীমাবদ্ধতাও কম নয়। তাদের বাবা জয় প্রকাশ পাল কৃষিকাজ করেন। পাশাপাশি গ্রামের মধ্যে ছোট একটি ওষুধের দোকান রয়েছে। যার স্বল্প আয় দিয়েই স্ত্রী, তিন মেয়ে ও এক ছেলের পড়াশোনা ও ভরণপোষণ করেন তিনি।
বাবা জয় প্রকাশ পাল বলেন, চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের আলাদা করেন। এখন তারা সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। আমার মেয়ে দুটির মেধা ভালো। ভালো ছবি আঁকে, ভালো নৃত্য করে। এখন তাদের নিয়ে আমার গর্ব হয়। তারা যাতে মানুষের মতো মানুষ হতে পারে। তাদের স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়ার, তাদের এই স্বপ্ন পূরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাব।
