চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ৭ লাখ মানুষের একমাত্র ৫০ শয্যার সরকারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি চিকিৎসা সেবায় নানা ঘাটতি ও জনবল সংকট থাকায় আশানুরুপ সেবা পাচ্ছে না জনগণ। অপরদিকে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৫ জন ডাক্তার থাকার কথা থাকলে আছে মাত্র ১৩ জন।
স্বপ্ল সংখ্যক ডাক্তার নিয়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা চালু রাখায় প্রতিদিন শত শত রোগী বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে চিকিৎসা নিতে এসে চাহিদা অনুযায়ী সেবা না পেয়ে প্রাইভেট হাসপাতালের দিকে ঝুঁকে পড়েছে রোগীরা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তারদের আসা যাওয়ার যে স্বয়ংক্রিয় বায়োমেট্রিক মেশিন রয়েছে তা দীর্ঘদিন থেকে নষ্ট থাকার অজুহাতে যখন ইচ্ছে আসে এবং যখন ইচ্ছে যায় এ পদ্ধতিতে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম। তবে আসতে দেরী হলেও ১টা বাজার সাথে সাথে বেরিয়ে পড়েন অধিকাংশ ডাক্তার প্রাইভেট চিকিৎসার খোঁজে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সরকারি নম্বরটি (০১৭০১২৪৮৪১২) নানা অজুহাতে সারাদিন ব্যস্ত করে রাখা হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সুত্রে জানা যায়, প্রতিমাসে গড়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আন্তঃ বিভাগে ৭শ থেকে ১হাজার, বহির্বিভাগে ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার এবং জরুরী বিভাগে ২ থেকে ৩ হাজার রোগী চিকিৎসা নিলেও রোগীদের অধিকাংশ পরীক্ষা নিরিক্ষা ও ঔষধ বাহির থেকে কিনতে হয়। পর্যাপ্ত ঔষধ সরবরাহ না থাকার অজুহাতে বলে রোগীর স্বজনদের অভিযোগ।
এছাড়া বিগত ৭ বছর ধরে রেডিওলজি চিকিৎসক না থাকায় রোগীদের বাহির থেকে আল্টাসনো করতে হয়। গর্ভবতী নারী থেকে শুরু করে অন্য রোগীদের আল্টা মেশিনের প্রিন্ট নষ্ট থাকায় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি নিদিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নামও উল্লেখ করে দেন চিকিৎসকরা।
এ সুযোগে বহিরাগত ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিদের আনাগোনা চোখে পড়ার মত বলে ভুক্তভোগীরা উল্লেখ করেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সূত্রে জানা যায়, বাঁশখালী ৫০ শয্যার হওয়াতে এখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ প্রথম শ্রেনীর পদবীধারী রয়েছে ৩৫ জন। তার মধ্যে বর্তমানে চিকিৎসক রয়েছে মাত্র ১৩ জন। সিনিয়র কনসালটেন্ট চক্ষু, ইএনটি ডেপুটেশনে চট্টগ্রাম মেডিকেল, জুনিয়র কনসালটেন্ট রেডিওলজি ও প্যাথলজি এবং প্যাথলজিষ্টসহ ২২টি পদ খালি রয়েছে। জুনিয়ার কনসালটেন্ট রেডিওলজি ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে বদলী হওয়ার পর থেকেই পদটি শূন্য। তার মধ্যে ৮ জন চিকিৎসক প্রেষণে অন্যত্র বদলী। এছাড়া শূন্য রয়েছে সিনিয়র কনসালটেন্ট, চুক্ষ কনসালটেন্ট, সিনিয়র স্টাফ নার্স ৩০ টি পদের ১৭টি পদ খালি, মিডওয়াইফ ৭টি পদের মধ্যে ৫টি খালি, ড়িওলজিস্ট এবং ল্যাব টেকনোলজিস্ট পদে ৪ জন থাকার কথা থাকলে ও আছে শুধু ১ জন, ডেন্টাল পদে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নাই, ফার্মাসিস্ট পদে ৩ জন থাকার কথা থাকলেও ওই পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া মালি, নাইট গার্ড, সুইপার সংকট রয়েছে বলে জানা যায়। এর মধ্যে ওয়ার্ড বয় আয়া ২জন, কুক- মসালচী ১ জন এবং সুইপার পদে ৪টি পদ শূন্য। ভেসজ কর্মচারী পদের মধ্যে ২টি পদ শূন্য রয়েছে।
অন্যদিকে কমিউনিটি ক্লিনিকে বিগত প্রায় ১ বছর যাবৎ সরকারি ভাবে কোন ঔষধ বরাদ্দ নাই বলে জানা যায়। বিগত দিনে বাঁশখালীর দায়িত্বপ্রাপ্ত এমপিদ্বয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসার মান উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ গ্রহন করলেও বর্তমানে তা থমকে আছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগীদের খাবার নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। মেসার্স শাহ আমানতের স্বত্বাধিকারী মৌলভী ইউনুস নামে এক ঠিকাদার বিগত ১৫-২০ বছর যাবত এই খাদ্য ও পত্য (ডায়েট) এর দায়িত্ব পালন করছে। রোগীদের খাবারের জন্য সকালে একটি ডিম, একটি কলা, ২পিস পাউরুটি দেওয়া হয় বলে রোগীরা জানান। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের খাবারের জন্য দৈনিক সরকারীভাবে মাথাপিছু বরাদ্দ ১৭৫ টাকা। এর মধ্যে ১নং পণ্য ডাইড, ২নং পণ্য ডায়াবেটিক ও স্পেশাল পণ্য রয়েছে। এ টাকার মধ্যেই রোগীদের খাবার সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে ১নং পণ্যতালিকায় রোগীর প্রতিদিনের খাবার হিসেবে পাউরুটি ১৩৩ গ্রাম (২পিস), একটি ডিম, কলা ১টি, চাল ৪০০ গ্রাম, আলু ৫৯ গ্রাম, তরকারী ২০০ গ্রাম, ডাল ২৫ গ্রাম উল্লেখ রয়েছে। সপ্তাহে দুইদিন রোগীদের মাংস সরবরাহের কথা থাকলেও রোগীরা সপ্তাহে ১ দিন মাংস পান বলে জানা যায়। তার বদলে ডিম বা মাছ সরবরাহ করা হয়।
এ ব্যাপারে স্থানীয় সংবাদকর্মীদের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডাঃ তৌফিকুল আলম বলেন, রান্নার পরিবেশনের মান ভালোই তো দেখি। অনিয়ম পাওয়া গেলে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, চিকিৎসকসহ জনবল সংকট থাকায় রোগীদের কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। জনবল সংকট দুর হলেই এসব সমস্যা আর থাকবে না। ইতিমধ্যে আমি আর (টিএইচও) দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে চিকিৎসা সেবাসহ আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে পুরো হাসপাতাল আলোকিত করেছি। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা হাসপাতালের চতুর্পাশে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ ও ফুলের বাগান করেছি। আগের তুলনায় এখন ৮০% মানুষ তাদের কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছে। জনবল সংকট দূর হলে ১০০ ভাগ চিকিৎসা সেবা এই হাসপাতাল থেকে পাওয়া যাবে বলে তিনি দাবি করেন।
