‘এমন পরিস্থিতি আর আসেনি’

হামলা, মামলা ও হয়রানির আতঙ্কে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংবাদিকরা

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৫, ০৬:১৯ পিএম

সংবাদ প্রকাশের জেরে ক্রমবর্ধমান হামলা, মামলা ও হয়রানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মূলধারার সাংবাদিকরা। তাদের মতে, স্বাধীনতার পর এই প্রথম সাংবাদিকরা হতাশাগ্রস্ত। পেশাদার সাংবাদিকদের হয়রানিমূলক মামলায় জড়ানো হচ্ছে। প্রেসক্লাব সৃষ্টির পর থেকে এমন সংকটময় পরিস্থিতি আর আসেনি।

গতকাল রবিবার (২৪ আগস্ট) ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাব আয়োজিত এক সাংবাদিক সমাবেশে তারা এসব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা তুলে ধরেন। 

সভায় ৭০ বছর বয়স্ক সাংবাদিক আ ফ ম কাউসার এমরান জানান, তার দিন কাটছে আতঙ্কে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তার বিরুদ্ধে তিনটি পোস্টে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে, যেখানে তার পরিবারকে নিয়েও আপত্তিকর বক্তব্য রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এখন আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। ঘর থেকেও বের হতে সাহস পাই না, এমনকি মসজিদেও যাই না।’

আরেক সাংবাদিক আল মামুন জানান, ‘নিউজ করলেই মামলার ভয় দেখানো হচ্ছে, ট্যাগ লাগানো হয়। আমি কখনোই ছাত্রলীগ করিনি, কিন্তু আমাকে ছাত্রলীগ সভাপতি বানিয়ে প্রচার করা হচ্ছে।’

মামলা, গ্রেপ্তার ছাড়াও আরও নানাভাবে সাংবাদিক নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের এ সমাবেশে। 

সভায় জানানো হয়, জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ৮ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনে একাধিক থানায় মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি হয়ে দৈনিক সমকালের প্রতিনিধি সজল আহমেদ এক বছরের বেশি সময় ধরে বাড়িছাড়া। অথচ অভিযোগে উল্লেখিত তারিখে সংশ্লিষ্ট এলাকায় এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি।

প্রথম আলোর সরাইল প্রতিনিধি বদর উদ্দিনকে জড়ানো হয়েছে ঢাকার একটি হত্যা মামলায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরের অন্তত পাঁচ সাংবাদিককে অভ্যুত্থান পরবর্তী দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলায় জড়ানো হয়েছে।

এরমধ্যে সম্প্রতি সরাইলের একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় গাজী টিভির জেলা প্রতিনিধি জহির রায়হানকে। ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে শহরের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ সুপারের নির্দেশে তদন্তে তার সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ার পরও গ্রেপ্তার করা হয় বলে সমাবেশে অভিযোগ করা হয়।

গত ৬ জুলাই কালের কণ্ঠের বিশ্বজিৎ পাল বাবু ও যমুনা টিভির মহিউদ্দিন মিশুর বিরুদ্ধে রাজধানীর মামলা হয় বিমানবন্দর থানায়। আবার, ইমিগ্রেশন পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করায় চাঁদাবাজির মামলায় জড়ানো হয় যুগান্তর ও আরটিভির আখাউড়ার দুই সাংবাদিককে। ইফতারের নামে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগে গত ৭ আগস্ট ইমিগ্রেশনের ওসি মোহাম্মদ আবদুস সাত্তার বাদী হয়ে এ মামলা করেন। 

এদিকে বিজয়নগরে ফসলি জমির মাটি কাটা নিয়ে প্রতিবেদন করায় হামলা ও মামলার শিকার দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধি মাইনুদ্দীন রুবেল। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ৭০ বছরের পুরনো একটি পুকুর আওয়ামী লীগ আমলেও রক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর তা ভরাট করে ফেলা হয়। এই খবর প্রকাশ করায় যুবদল থেকে বহিষ্কৃত লিটন মুন্সি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা কাইয়ুমের নেতৃত্বে তার ওপর হামলা হয় এবং পরে তার বিরুদ্ধেই পাল্টা মামলা করা হয়।

বক্তারা অভিযোগ করেন, সরকার অনুমোদনবিহীন, ভূঁইফোড় কিছু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে চরিত্রহনন, গুজব ছড়ানো ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনের কিছু সদস্য এদের প্রশ্রয় দেওয়ায় প্রকৃত সাংবাদিকরা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছেন।

সভায় এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ, জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং মামলা থেকে সাংবাদিকদের অব্যাহতি প্রদানের জোর দাবি জানানো হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাব সভাপতি জাবেদ রহিম বিজনের সভাপতিত্বে সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. বাহারুল ইসলাম মোল্লা।

অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিনিধি মোহাম্মদ আরজু, দৈনিক সংবাদের মো. সাদেকুর রহমান, দৈনিক ইনকিলাবের খ আ ম রশিদুল ইসলাম, চ্যানেল আইয়ের মনজুরুল আলম, দৈনিক আমাদের সময়ের দীপক চৌধুরী বাপ্পী, এটিএন নিউজের পীযূষ কান্তি আচার্য, দৈনিক স্বদেশ প্রতিদিনের শেখ মো. শহিদুল ইসলাম, বাংলাভিশনের মো. আশিকুল ইসলাম, বাংলা টিভির আল আমীন শাহীন, দৈনিক কুরুলিয়ার মো. ইব্রাহীম খান সাদাত, দৈনিক আমার দেশের মফিজুর রহমান লিমন, মাইটিভির আ ফ ম কাউসার এমরান, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের মোশাররফ হোসেন বেলাল, সময় টিভির উজ্জল চক্রবর্তী, একাত্তর টিভির জালাল উদ্দিন রুমী, একুশে টিভির মীর মো. শাহীন, দৈনিক প্রথম আলোর শাহাদৎ হোসেন, দি এশিয়ান এজের আশিকুর রহমান মিঠু, আরটিভির আজিজুর রহমান পায়েল, দৈনিক কালের কণ্ঠের বিশ্বজিৎ পাল, যমুনা টেলিভিশনের শফিকুল ইসলাম, এটিএন বাংলার ইসহাক সুমন, দৈনিক নয়াদিগন্তের মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, দেশ টিভির মেহেদী নূর পরশ, দৈনিক যুগান্তরের মো. ফজলে রাব্বি, এখন টিভির আজিজুল সঞ্চয়, দেশ রূপান্তরের মাইনুদ্দীন রুবেল, নাগরিক টিভির আবুল হাসনাত মো. রাফি, দৈনিক বাংলাবাজারের আলমামুন, দৈনিক সংগ্রামের রোকনউদ্দিন, দীপ্ত টিভির রিফাত আন নাবিল মোল্লা প্রমুখ। 

বক্তব্যে ইফতেয়ার উদ্দিন রিফাত বলেন, হত্যা, চাঁদাবাজি ও মাদক মামলার আসামিরা এখানে সাংবাদিক পরিচয়ে নানা অপরাধে লিপ্ত।

রিফাত আন নাবিল মোল্লা বলেন, স্বাধীনতার পর এই প্রথম সাংবাদিকরা হতাশাগ্রস্ত। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ভুয়া সাংবাদিকরা মানুষের চরিত্রহননে নেমেছে। যাকে-তাকে আওয়ামী দোসর ট্যাগ দিয়ে মানসিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে মূলধারার সকল সাংবাদিকদের সোচ্চার হতে হবে।

আবুল হাসনাত রাফি বলেন, এখন নিউজ করতে গেলে ভয় লাগে। কারও বিরুদ্ধে নিউজ গেলেই ফ্যাসিস্টের দোসর ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিছু অপরাধী নিজেদের অপকর্ম ঢাকার জন্য এখন জাতীয়তাবাদী ট্যাগ লাগিয়ে সাংবাদিকতায় নেমেছে। বিগত সরকারের আমলে এদের কখনো দেখা যায়নি।

মোজাম্মেল হক বলেন, পেশাদার সাংবাদিকদের ফ্যাসিস্টের দোসর ট্যাগ দিয়ে হয়রানিমূলক মামলায় জড়ানো হচ্ছে। সংবাদ বিপক্ষে গেলে ট্যাগ দেওয়াটা হলো ফ্যাসিবাদী চরিত্র।

মফিজুর রহমান লিমন বলেন, ফেসবুকে সাংবাদিকদের মানহানি করা হচ্ছে।

শাহাদৎ হোসেন বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে মূলধারার সাংবাদিকদের চরিত্রহনন করছে একটি চক্র। তখনই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারলে আজকের পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

রোকন উদ্দিন বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সাংবাদিকদের তাল মেলানো যাবে না। সাংবাদিকদের সত্য তথ্য তুলে ধরতে হবে- সেটি যত কঠিনই হোক।

উজ্জল চক্রবর্তী বলেন, সাংবাদিকতা করুন, নয়তো রাজনীতি- এই নীতি প্রেসক্লাবের অন্তর্ভুক্ত সকল সাংবাদিকদের জন্য বাস্তবায়ন জরুরি।

শফিকুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকদের দোসর ট্যাগ দিয়ে উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত হয়রানি করা হচ্ছে।

নিয়াজ মোহাম্মদ খান বিটু বলেন, ভূঁইফোড় সাংবাদিকরা সমাজের কীট। বন্ধুত্ব পুলিশের সঙ্গে করবেন আর তারা আপনার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাবে, তার সঙ্গে দেখা করতে দেবে না; সেটা হয় না।

খ আ ম রশিদুল ইসলাম বলেন, প্রেসক্লাব সৃষ্টির পর থেকে এমন সংকটময় পরিস্থিতি আর আসেনি।

সাদেকুর রহমান বলেন, নামধারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রেসক্লাব সচেষ্ট থাকবে।

মঞ্জুরুল আলম বলেন, সৎ সাংবাদিকতা আর সৎ সাহস থাকলে সাংবাদিকদের কেউ দমাতে পারবে না।

মোহাম্মদ আরজু বলেন, সাংবাদিকরা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এই সময়ে সবার ঐক্যবদ্ধ থাকার বিকল্প নাই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত