ফের উঁকি দিচ্ছে একতরফা!

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৫, ০২:২৮ এএম

ফেব্রুয়ারি যতই ঘনিয়ে আসছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর নির্বাচন চাই, নির্বাচন চাই না মতবিরোধের রাজনীতি ততই জটিল হয়ে উঠছে। যতই প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক, নির্বাচনের পক্ষে বিএনপি, শর্ত জুড়ে দিয়ে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচনের বিরোধিতা করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ ও মতবিরোধের রাজনীতি কাক্সিক্ষত নির্বাচন অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত করছে। এটি উদ্বেগের বিষয়। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিস্থিতি যেদিকেই যাক, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করাই একমাত্র অগ্রাধিকার।

সূত্র জানায়, ফেব্রুয়ারির ভেতরে নির্বাচন দিতেই হবে এমন চাপই অনুভব করছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই চাপ থেকেই আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিতে হয়েছ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। এরপর রাজনৈতিক দলগুলো সরকারকে সাধুবাদ না জানিয়ে নির্বাচন চাই আর নির্বাচন চাই না বলে বিরোধের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনকেন্দ্রিক এ রাজনীতিতে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের আশঙ্কা, তবে কি আরেকটি একতরফা নির্বাচন উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে? এর কারণ, নির্বাচনের স্টেকহোল্ডাররা কোনো ছাড়ে রাজি হচ্ছেন না। দূরত্ব ঝেড়ে ফেলে সব দল নির্বাচন করতে না পারলে ‘জনগণের গণতান্ত্রিক যাত্রা’ ব্যাহত হবে।

দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়। এগুলোর ভিত্তিতেই হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ। তবে এ সনদ বা সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি কী হবে তা নিয়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে চরম মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। বিএনপির অবস্থান হলো সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে আগামী জাতীয় সংসদে। জামায়াত চায় গণভোট বা রাষ্ট্রপতির প্রেক্লেমেশন। আর এনসিপি চায় গণপরিষদ করে সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়ন। এ তীব্র মতবিরোধে জামায়ত ও এনসিপি নির্বাচনে না গেলে একতরফা নির্বাচনের দিকেই সরকারের হাঁটার পথ তৈরি হচ্ছে। যদিও দলগুলো শেষ সময়ে ছাড় দেয়। এক মাস আগে যে পরিস্থিতি ছিল, এখন অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। আরও পরিবর্তন হলে নির্বাচনের দিকে হাঁটতে নাও হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘দলীয় এজেন্ডার কারণে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে গেলে গণঅভ্যুত্থানের অর্জন বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। দেশের বিদ্যমান নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাবে এবং সেরকম পরিস্থিতিতে আম-ছালা দুটোই চলে যেতে পারে।’ এমন পরিস্থিতিতে তিনি নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

সরকারসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমনিতেই আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে নির্বাচন এক কঠিনতর কাজ। এবারই প্রথম অন্তর্বর্তী সরকারকে একটি বড় দল আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। অবশ্য, সব রাজনৈতিক দল মিলে দেশের সবচেয়ে পুরনো দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে অলিখিত চুক্তিপত্র করেছে। মূলত সেটি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। ফলে সতর্কতার সঙ্গে পথ চলতে হচ্ছে সরকারকে। এখন রাজনৈতিক দলের মতবিরোধ চরম বেকায়দার মুখোমুখি ফেলতে পারে তাদের। এ প্রসঙ্গে বিদেশি নানা প্রশ্ন পাশ কাটাতে হচ্ছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ না করে দলগুলোর ভেতরে নির্বাচন চাওয়া না চাওয়ার রাজনীতি আগামী নির্বাচনকে একতরফা নির্বাচনের তকমা নিতে হতে পারে। শর্ত জুড়ে নির্বাচন আটকাতে মরিয়া হয়ে রাজনীতি করছে মূলত এনসিপি। তাদের সঙ্গে জামায়াত ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা ছোট ছোট একাধিক সংগঠনও রয়েছে।

দেশের অন্যতম জনসমর্থিত দল বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে নির্বাচন আদায় করার রাজনীতি অব্যাহত রেখেছে। গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সৃষ্ট নতুন রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচন প্রশ্নে ততটাই বিরোধের রাজনীতি করছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক এ রাজনীতি যেকোনো সময়ে আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সবদিক থেকে নির্বাচনের যে জোরালো আওয়াজ উচ্চারিত হতে শুরু করেছে, তাতে নির্বাচন আটকানোর সুযোগ কম বলেই মনে হচ্ছে। সেটি বুঝতে পেরে অন্তর্বর্তী সরকারও এখন নির্বাচন আটকে রাখার অসম্ভব সেই চিন্তা আর করতে পারছে না। ফলে ছাত্রদের আন্দোলনের ফসল অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচন প্রশ্নে বিরোধ শুরু হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে এ বিরোধে এনসিপির নেতাদের মুখ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের কড়া সমালোচনাও শুনতে হচ্ছে। কেউ কাউকে বুঝতে পারছে না বলে উভয়ের অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ উল্কাগতিতে বেড়ে চলেছে।

সরকারসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, এক বছর পর এসে নির্বাচন আটকিয়ে রাখার মতো কোনো সুযোগ সরকারের হাতে অবশিষ্ট নেই। ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এনসিপির আগের সেই অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা নেই, তাদের কথামতো নির্বাচন বিলম্বের সিদ্ধান্ত সরকার নিলে জনগণ শান্ত নাও থাকতে পারে। তাছাড়া একটি বাহিনী নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচন নিয়ে গড়িমসি করলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ফেব্রুয়ারিতে ভোট দিতে বাংলাদেশের মানুষ উন্মুখ হয়ে আছে। গতকাল সোমবার জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের ৩৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে এসে ড. মঈন বলেন, ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশন জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছে। এতে জনগণের ভোট দেওয়ার প্রত্যাশা পূরণ হবে। তিনি বলেন, একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই শুধু বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্র ফিরে পেতে পারে। তাদের পছন্দমতো ৩০০ প্রতিনিধি বাছাইয়ের একমাত্র মাধ্যম নির্বাচন।

গতকাল সেগুনবাগিচায় সংহতি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘আগামী ফেব্রুয়ারিতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা হলেও জনমনে নির্বাচন নিয়ে সংশয় কাটছে না। অবাধ জাতীয় নির্বাচন নিশ্চিত করতে সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য সরকারকে দ্রুত যাবতীয় পক্ষপাতদুষ্টতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিতর্কিত উপদেষ্টাদের দ্রুত প্রত্যাহার করে প্রয়োজনে উপদেষ্টামন্ডলী পুনর্গঠন করতে হবে।’

বিদ্যমান সংবিধানের অধীনে নির্বাচন হলে তাতে এনসিপির অংশগ্রহণের বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছি। যদি সরকার সামনে নতুন সংবিধান ও জুলাই সনদের বিষয় অপরিপূর্ণ রাখে এবং তা বাস্তবায়ন না করে নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হয়, সে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এনসিপির সংশয়ের জায়গা রয়েছে।’ গত রবিবার রাজধানীর বাংলা মোটরে দলের অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আখতার হোসেন আরও বলেন, ‘আমরা মনে করি বাংলাদেশে যে নির্বাচন হবে তার মাধ্যমে এ দেশের মানুষ একটা নতুন শাসনতান্ত্রিক কাঠামো পাবে। এ আকাক্সক্ষা যদি নির্বাচনের মাধ্যমে পূরণ না হয়, তাহলে সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কোনো মানে থাকে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত