অস্ত্রোপচার কক্ষে টিকটক ভিডিও বানাচ্ছিলেন নার্স

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৫০ এএম

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার প্রত্যাশা ক্লিনিকের অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) অচেতন ও মুমূর্ষু রোগীর সামনে দাঁড়িয়ে নার্সের টিকটক ভিডিও ধারণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে ক্লিনিকটি। এ ঘটনার পর গতকাল বৃহস্পতিবার উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ক্লিনিকের অপারেশন থিয়েটার সিলগালা করে দিয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের এই পদক্ষেপের পাশাপাশি ঘটনাটি তদন্তের জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

জানা গেছে, লোহাগড়া পৌরসভার জয়পুর ফুলতলা বাজারের ফুলিকাজির মোড়ে অবস্থিত প্রত্যাশা ক্লিনিকে কর্মরত নার্স প্রিয়া (২৪) অপারেশন থিয়েটারে অচেতন ও মুমূর্ষু রোগীর সামনে দাঁড়িয়ে টিকটক ভিডিও ধারণ করেন এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটক ও ফেসবুকে আপলোড করেন। এই ভিডিওতে রোগীর গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং অপারেশন থিয়েটারের পবিত্রতা ক্ষুণœ করার অভিযোগ উঠেছে, যা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি-নিষেধের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। গত বুধবার রাতে এমন ভিডিওটি সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর স্থানীয় জনগণ ও নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

ঘটনার তীব্রতা বিবেচনা করে বৃহস্পতিবার সকালে লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবুল হাসনাতের নেতৃত্বে একটি তদন্ত টিম ক্লিনিকটি পরিদর্শন করে। পরিদর্শনকালে অপারেশন থিয়েটার সিলগালা করা হয় এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এটি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। সে সময় উপস্থিত ছিলেন চিকিৎসক কৃষ্ণপদ বিশ্বাস, ইপিআই (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়কারী প্রশান্ত ঘোষ, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া, লোহাগড়া উপজেলা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী মুরাদ হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ বাপ্পি। 

অভিযুক্ত নার্স প্রিয়া লোহাগড়া উপজেলার লাহুড়িয়া ইউনিয়নের সরুশুনা গ্রামের মোসাব শেখের মেয়ে। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তার ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। প্রিয়া জানান, তিনি নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন এবং নার্স হিসেবে কাজ করার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা যোগ্যতা তার নেই। তিনি অভিযোগ করেন, ক্লিনিক মালিক সেলিম রেজা তার স্বার্থসিদ্ধির জন্য তাকে নার্স হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। অন্যদিকে, ক্লিনিক মালিক সেলিম রেজা ঘটনাটিকে ‘অজ্ঞতার কারণে সংঘটিত’ বলে উল্লেখ করে প্রিয়াকে ক্ষমা করে দেওয়ার আহ্বান জানান। তবে তিনি ক্লিনিকের পক্ষ থেকে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন।

লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবুল হাসনাত বলেন, ‘অপারেশন থিয়েটারে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড প্রকাশ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। মুমূর্ষু রোগীর সামনে টিকটক ভিডিও ধারণ করা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালার লঙ্ঘন।’

তিনি জানান, নড়াইল জেলা সিভিল সার্জন ডা. সাজেদা বেগমের নির্দেশে অপারেশন থিয়েটার সিলগালা করা হয়েছে এবং ঘটনার বিস্তারিত তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিলসহ আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। 

ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এটিকে ‘চিকিৎসা পেশার প্রতি অবমাননা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা শুধু রোগীর গোপনীয়তাই লঙ্ঘন করে না, বরং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি করে।’

সামাজিকমাধ্যমে অনেকে প্রত্যাশা ক্লিনিকের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত