দেশের প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা সম্প্রতি সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান পেশাগত বৈষম্যের প্রতিবাদে ঢাকার শাহবাগে এক আন্দোলনে জমায়েত হয়েছিলেন। তাদের আন্দোলনের দাবি ছিল দুটি : প্রথমত. ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্য সরকারি চাকরিতে সংরক্ষিত কোটা বাতিল করা এবং দ্বিতীয়ত. ‘প্রকৌশলী’ পদবি কেবল মাত্র স্নাতক প্রকৌশলীদের জন্য নির্দিষ্ট করা। এই প্রতিবাদ কেবল চাকরির অধিকার রক্ষার জন্য নয়, বরং এটি দেশের প্রকৌশল পেশার মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াইও বটে। দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে, এই আন্দোলন দেশের উচ্চশিক্ষা এবং পেশাগত কাঠামোর একটি গভীর সংকটের দিকনির্দেশ করে। এই বিশাল জমায়েত দেশের প্রকৌশল পেশাজীবীদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ।
মূল দাবি : প্রকৌশলীদের দাবির মধ্যে রয়েছে- সরকারি চাকরিতে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা বাতিল করা; সহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের নবম গ্রেডের পদগুলোতে কেবল বিএসসি প্রকৌশলীদের নিয়োগ নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো ধরনের পদোন্নতি বা কোটার মাধ্যমে নিয়োগ হবে না এবং ‘প্রকৌশলী’ পদবি শুধু স্নাতক প্রকৌশলীদের জন্য নির্দিষ্ট করা। তাদের পেশাগত মর্যাদা ও যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতেই, এই দাবিগুলো এসেছে। স্নাতক প্রকৌশলীরা বলছেন, তাদের চার বছর মেয়াদি শিক্ষাক্রমে প্রকৌশলের তাত্ত্বিক এবং মৌলিক জ্ঞান গভীরভাবে শেখানো হয়, যা পেশাগত জীবনে জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য অপরিহার্য। অন্যদিকে ডিপ্লোমাধারীদের শিক্ষাক্রম মূলত হাতে-কলমে এবং কারিগরি জ্ঞানভিত্তিক। এই দুটি ডিগ্রির প্রকৃতি এবং উদ্দেশ্যগত ভিন্নতার কারণে পেশাগত পদ এবং দায়িত্বেও একটি স্পষ্ট বিভাজন থাকা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিকভাবেও এই দুটি ডিগ্রির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। উন্নত বিশে^ ‘ইঞ্জিনিয়ার’ পদবি সাধারণত স্নাতক ডিগ্রিধারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকে, যেখানে ডিপ্লোমাধারীদের ‘টেকনিশিয়ান’ বা ‘টেকনোলজিস্ট’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
ডিপ্লোমা এবং স্নাতক প্রকৌশলীদের মধ্যে পার্থক্য : প্রকৌশল শিক্ষাব্যবস্থায় ডিপ্লোমা ও স্নাতক ডিগ্রির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশে ৫২টি সরকারি ও ১২৩টির বেশি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে প্রতি বছর দেড় লাখের বেশি শিক্ষার্থী ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হচ্ছেন। অন্যদিকে, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ স্নাতক প্রকৌশলী তৈরি হচ্ছেন। এই দুই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় ভিন্নতা থাকলেও, সরকারি চাকরির পদবিতে অনেক ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট বিভাজন নেই যা বৈষম্য তৈরি করছে।
পরিসংখ্যান ও বৈষম্য চিত্র : বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২১ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৫২টি সরকারি এবং ১২৩টিরও বেশি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট রয়েছে। প্রতি বছর ১,৫০,০০০-এর বেশি শিক্ষার্থী ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হয়। অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর প্রায় ১,০০,০০০ স্নাতক প্রকৌশলী বের হচ্ছেন, যাদের একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষা বা বিসিএসের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতি নেন। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, চাকরির বাজারের চাহিদা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যার মধ্যে কতটা বড় ফারাক রয়েছে। ফলে মেধাবীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে এবং অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। প্রকৌশলীদের এই আন্দোলন কেবল চাকরির কোটা নিয়ে একটি বিরোধ নয়, এটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার একটি বড় দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। ৩১তম থেকে ৪৫তম বিসিএসে মাত্র ৪৬৮টি সহকারী প্রকৌশলী পদ বিজ্ঞাপিত হয়েছে, যা প্রতি বছর বের হওয়া হাজার হাজার স্নাতক প্রকৌশলীর সংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। বিশেষ করে, নবম গ্রেডের সহকারী প্রকৌশলী পদের জন্য যেখানে বিএসসি প্রকৌশলীরা অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচিত হন, সেখানে দশম গ্রেড থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে ডিপ্লোমাধারীরা একই পদে পৌঁছাতে পারেন! এই পদ্ধতিকে স্নাতক শিক্ষার্থীরা ‘ব্যাকডোর’ বা ‘পেছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ’ হিসেবে দেখছেন, যা যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই কোটা প্রথা মেধার অবমূল্যায়ন করে এবং পেশাগত ক্ষেত্রে হতাশা তৈরি করে। এই বৈষম্য মেধাবীদের বিদেশে চলে যেতে উৎসাহিত করে, যা দেশের জন্য ‘মেধা পাচার’ (brain drain)-এর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও পেশাগত মর্যাদা : প্রকৌশলী পদবি নিয়ে এ বিতর্কটি শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বেশিরভাগ উন্নত দেশে প্রকৌশল পেশার মর্যাদা এবং ভূমিকা অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যে ‘Chartered Engineer Ges Incorporated Engineer’ পদবি দুটি ভিন্ন স্তরের যোগ্যতা নির্দেশ করে। স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং উচ্চ পেশাগত অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিরা সাধারণত ‘Chartered Engineer’ হিসেবে স্বীকৃত হন, যেখানে ডিপ্লোমা এবং ব্যবহারিক জ্ঞানসম্পন্ন প্রকৌশলীরা ‘ও ’Incorporated Engineer বা অনুরূপ পদবি পান। এ ধরনের পেশাগত শ্রেণিবিন্যাস পেশার স্বচ্ছতা বাড়ায় এবং প্রত্যেকের ভূমিকা ও দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করা অপরিহার্য, যা পেশার সম্মান বৃদ্ধি করবে। এতে একদিকে যেমন স্নাতক প্রকৌশলীরা তাদের যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন পাবেন, তেমনি ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরাও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য যথাযথ স্বীকৃতি লাভ করবেন।
সরকারের ভূমিকা এবং চ্যালেঞ্জ : প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার একটি কমিটি গঠন করলেও শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, এই কমিটি তাদের মূল দাবিগুলোকে পাশ কাটিয়ে একটি দায়সারা সমাধান প্রস্তাব করতে পারে। শিক্ষার্থীদের মতে, এ সমস্যার সমাধান তখনই সম্ভব যখন সরকার তাদের ন্যায্য দাবিগুলোকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করবে, যা সবার জন্য সুবিচার নিশ্চিত করবে। প্রকৌশলীদের এই আন্দোলন শুধু পদের জন্য নয়, বরং একটি সুস্থ পেশাগত পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সরকারের উচিত দ্রুত এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসা এবং এমন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা, যা দেশের সব প্রকৌশলীর মেধা, দক্ষতা এবং যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করবে। এই আন্দোলনটি শুধু প্রতিবাদ নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ প্রকৌশলীদের সম্মান এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার শক্তিশালী কণ্ঠস্বর।
লেখক : সিইও, ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড
