হুমকিতে নৌবন্দর বিদ্যুৎকেন্দ্র

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৫৩ এএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মেঘনা নদী থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের কারণে ভয়াবহ নদীভাঙন ও মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে আশুগঞ্জ নৌবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং তীরবর্তী জনবসতি হুমকির মুখে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন একসঙ্গে ২০টিরও বেশি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দিন-রাত বালু তোলা হচ্ছে। প্রশাসনের নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম করে সরাসরি নদীর পাড় পর্যন্ত গিয়ে বালু তোলায় নদীর তলদেশের পাশাপাশি তীরও ভেঙে পড়ছে। ফলে কৃষিজমি, বসতভিটা, এমনকি চরসোনারামপুর গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বসতিও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষভাবে হুমকির মুখে পড়েছে চরসোনারামপুরের পাশে মেঘনার তীরে স্থাপিত জাতীয় গ্রিডের ২৩০ কেভি বিদ্যুতের রিভার ক্রসিং টাওয়ার। ইতিমধ্যেই এর নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে জাতীয় গ্রিডে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

এ ব্যাপারে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (পিজিসিবি) স্থানীয় কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আবু হানিফা জানান, রিভার ক্রসিং টাওয়ারের কাছে বালু উত্তোলন করা হলে টাওয়ারটি হুমকিতে পড়বে। এতে সারা দেশে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। এসব বিষয় স্থানীয় প্রশাসনকে লিখিতভাবে অবগত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে পিজিসিবির নরসিংদী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুর কবিরও একই মত পোষণ করেন।

প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ফোরলেন প্রকল্পে বালুর চাহিদা মেটাতে গত ২০ আগস্ট জেলা প্রশাসন তিন মাসের জন্য মহাসড়কের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিগো মীর আক্তারের প্রতিনিধি এ-টু-বি করপোরেশনকে বালু তোলার অনুমতি দেয়। তবে শর্তসাপেক্ষে নির্দিষ্ট সীমানা লাল নিশান দিয়ে চিহ্নিত করে দেওয়া হলেও তা অমান্য করে সীমা অতিক্রম করে চলছে বেপরোয়া বালু উত্তোলন। এতে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২ সালে তৎকালীন আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরবিন্দ বিশ্বাস নদী জরিপ করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলেন চরসোনারামপুর ও আশপাশের এলাকা থেকে বালু উত্তোলন হলে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড, আশুগঞ্জ বন্দর এলাকা, তীরবর্তী বাড়িঘর ও কৃষিজমি নদীভাঙনের শিকার হবে। একই মত প্রকাশ করেছিল তৎকালীন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ও। এরপরও সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন মাসের জন্য বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

আশুগঞ্জ জেনারেল মার্চেন্ট অ্যান্ড কমিশন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. জহিরুল ইসলাম জারু বলেন, ‘এভাবে চলতে

থাকলে শুধু তীরবর্তী গ্রাম নয়, আশুগঞ্জ বন্দরও হুমকির মুখে পড়বে। আমরা ইতিমধ্যে ইজারা বাতিলের আবেদন করেছি, প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হব।’

অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ-টু-বি করপোরেশনের স্থানীয় প্রতিনিধি কামাল হোসেন জয় দাবি করেন, তারা শর্ত মেনেই বালু তুলছেন। ভৈরবের একটি প্রভাবশালী মহল অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু তুলছে, যার দায় অন্যায়ভাবে তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে।

এ বিষয়ে আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাফে মোহাম্মদ ছড়া জানান, ‘ফোরলেন প্রকল্পের প্রয়োজনে তিন মাসের জন্য বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে সীমা অতিক্রম বা চুক্তি ভঙ্গ হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে নদী ও প্রকৃতি সুরক্ষা সামাজিক আন্দোলন ‘তরী বাংলাদেশ’-এর আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, ‘আশুগঞ্জের বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল ও নৌবন্দর দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ নির্বিচারে বালু উত্তোলনের কারণে এ অঞ্চল মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত