রাজনৈতিক দল বা অন্য কোনো সংগঠনের আহ্বানে অবরোধ-বিক্ষোভ সমাবেশ হচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। কোনো কোনো স্থানে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাতে বাধা দিলে সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই পুলিশ বিক্ষোভ কর্মসূচি বানচালে লাঠিচার্জ করে, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে বিক্ষোভকারী ও পুলিশ উভয়ই আহত হয়।
সম্প্রতি ঢাকায় বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর এবং গণ অধিকার পরিষদ ও জাতীয় পার্টির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয় ঘটনায় ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর গুরুতর আহত হন। তার অবস্থা আশঙ্কামুক্ত নয়, তিনি এখন চিকিৎসাধীন। ঢাকার বাইরেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘উৎসাহী’ কিছু সদস্যের কর্মকান্ড দেখে পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের মনে সন্দেহ জাগছে। পুলিশ সদর দপ্তর অতি উৎসাহী পুলিশ সদস্যদের খোঁজ নিচ্ছে! এ ব্যাপারে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশ সূত্র বলছে, সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে অনির্ধারিত বিশেষ বৈঠক হয়েছে। তাতে ক্ষেত্রবিশেষে পুলিশের বাড়াবাড়ি নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের সহনশীল থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত থাকা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশ অনেকটা বিশৃঙ্খলার মধ্যেই ছিল। পুলিশকে ক্রমান্বয়ে শৃঙ্খলায় ফেরানো হচ্ছে। কিন্তু ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভের সংখ্যা এমনভাবে বেড়েছে যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশ কঠিন। পুলিশের কিছু সদস্যের মারমুখি হওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে উঠছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এসবের পেছনে আওয়ামী লীগের ইন্ধন রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার; পুলিশের কোন সদস্য বেশি উৎসাহী তাদেরও চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার। পুলিশের সব ইউনিটে বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে এ-সংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধানের। এমন ঘটনায় বড় কর্তারা বিব্রত। আমরা চেষ্টা করছি দেশের পরিস্থিতি শান্ত রাখতে। ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। পুলিশ কাউকে দেশের পরিস্থিতি ঘোলাটে করার সুযোগ দেবে না।’
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা অত্যুৎসাহী কি না, তা আমরা খতিয়ে দেখছি।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘হার্ডলাইন বা সফট লাইনের কিছু নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আইনানুগভাবে যা করা দরকার পুলিশ তাই করছে। আলোচিত ঘটনাগুলো তদন্তাধীন। বুয়েটের ঘটনায় পুলিশের একটি কমিটি কাজ করছে। গণ অধিকার পরিষদের কর্মসূচির ঘটনাতেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত কমিটি হয়েছে।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব পুলিশ সদস্য সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে, তাদের একটি তালিকা করা হয়েছে। তারা বিসিএসের ১৫, ১৭, ১৮, ২০, ২১, ২২, ২৪, ২৫, ২৭ ও ২৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা। সাবেক কজন আইজিপি ও পুলিশ কমিশনারের নামও আছে তালিকায়। এখনো শতাধিক পুলিশ সদস্য কাজে যোগ দেয়নি। তাদের কর্মকান্ডও মনিটরিং করছে সদর দপ্তর। অতিরিক্ত আইজিপি থেকে শুরু করে কনস্টেবল ওই তালিকায় আছে।
সূত্র জানায়, কোটা সংস্কার নিয়ে ছাত্রদের আন্দোলন দমন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দমনপীড়ন চালায়। গুলিতে শিক্ষার্থী ও নিরীহ লোকজন, পুলিশ, আনসারসহ আট শতাধিক লোক প্রাণ হারান। পরে তা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিলে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন। এরপর পুলিশ সদর দপ্তরের পিআইএমএস (কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্যভান্ডার) হ্যাক হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেছেন, “এখন মবের ঘটনা আমাদের বেশি ভোগাচ্ছে। কিছুতেই মব নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যাচ্ছে না। চুরি, ডাকাতি, হত্যাকান্ড, চাঁদাবাজির ঘটনাও বেড়েছে। বৈষম্যবিরোধী অন্দোলনের ঘটনায় যেসব মামলা হয়েছিল সেগুলোর তদন্তকাজ অনেকদূর এগিয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান চালানো হবে শিগগির। পুলিশের মনোবল বাড়াতে বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে। ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তারপরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যত ভালো হওয়ার কথা, তত ভালো নয়। মামলাবাণিজ্য হচ্ছে অনেক বেশি। রাজনৈতিক নেতা-পুলিশ যোগসাজশ রয়েছে। কিছু পুলিশ ‘সাবোটাজ’ করার চেষ্টা করছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি।”
পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হঠাৎ করেই কঠোর অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সড়ক অবরোধের মতো জনভোগান্তি বন্ধ আর ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও ঠেকাতে সরকারই পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ন্যূনতম ছাড় না দেওয়ার মনোভাব নিয়ে দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ। মব ভায়োলেন্সের মতো অপরাধকে একেবারেই ছাড় নয় এমন বার্তাও রয়েছে। পরিস্থিতির আইনানুগ মোকাবিলারও নির্দেশনা আছে। তবে কয়েকটি ঘটনায় শীর্ষ পুলিশ কর্তারা নাখোশ। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য কিছুটা উৎসাহী বলে গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পুলিশসংশ্লিষ্টরা জানায়, সার্বিক বিষয় নিয়ে গত রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। এতে সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। বৈঠকে জানানো হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১২৩টি সংগঠন ১ হাজার ৬০৪ বার অবরোধ করেছে। গত বুধবার বুয়েটসহ দেশের অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তিন দাবিতে রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করে। একপর্যায়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা ঘেরাও করতে মিছিল বের করেন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে দফায় দফায় লাঠিপেটা, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে পুলিশ। এতে অন্তত ৬০ শিক্ষার্থী ও পুলিশের ৮ সদস্য আহত হন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষের একপর্যায়ে এক শিক্ষার্থীর মুখ চেপে ধরেন পুলিশের একজন কর্মকর্তা। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
গত শুক্রবার রাজধানীর কাকরাইলে গণ অধিকার পরিষদের কর্মসূচিতে লাঠিপেটা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এতে দলটির অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হন। গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর গুরুতর আহত হন।