নির্বাচন বানচালের সর্বোচ্চ চেষ্টা হবে

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৩৪ এএম

আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচনে সর্বোচ্চ বাধা আসবে এবং সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি এও বলেছেন, নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করতে যা যা করার দরকার তার সব পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাতটি রাজনৈতিক দল ও একটি সংগঠনের প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়।

পরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং দলগুলোর নেতারা পৃথক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বৈঠকের বিষয় তুলে ধরেন।

 বৈঠকে অংশ নেওয়া দলগুলো ও সংগঠনটি হচ্ছে এবি পার্টি, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, এলডিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় গণফ্রন্ট ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।

ব্রিফিংয়ে শফিকুল আলম বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্য সরকারের। এ বিষয়ে বাধা আসবে বলে বৈঠকে সতর্ক করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘যারা অন্তর্বর্তী সরকারকে নির্বাচন পর্যন্ত পৌঁছাতে দিতে চায় না, তারা যত রকমভাবে পারবে বাধা দেবে। বাংলাদেশের সত্তাকে গড়ে তুলতে তারা বাধা দেবে। তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে নির্বাচন বানচাল করার। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে যাতে নির্বাচন না হয়।’

এগুলোর কিছু কিছু লক্ষণ এখন দেখা যাচ্ছে জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেছেন, ‘সামনে আরও আসবে। এজন্য আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে।’

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচিত সরকারের হাতে আমরা ক্ষমতা হস্তান্তর করব।’ এই নির্বাচন নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর, সাহস অর্জনের নির্বাচন হবে বলে উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘নিজের ভূমিতে দেশ পরিচালনার নির্বাচন। এই নির্বাচনে অন্য কোনো দেশের থাবা মারার সুযোগ যেন না থাকে।’

এই নির্বাচন আয়োজনে প্রতি পদে পদে বাধা আসবে উল্লেখ করে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সতর্ক করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘সবার মনে দ্বন্দ্ব তৈরি করার চেষ্টা করবে। আমরা যেন সঠিক থাকি, স্থির থাকি। সবাই একসঙ্গে সহযোগিতা করি।’

এবারের নির্বাচন অনন্য নির্বাচন হবে বলে আশাবাদ জানান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘এটা অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন নয়। এটা এ দেশের সব মানুষের, সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচন। আমরা এই নির্বাচন আয়োজনে আপনাদের সর্বাত্মক সমর্থন চাই।’

প্রধান উপদেষ্টা আসন্ন দুর্গাপূজায় সবাইকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বলেও জানান প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

বৈঠকে উপদেষ্টাদের মধ্যে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

আগামী নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা : প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক শেষে বেরিয়ে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি সাংবাদিকদের বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি আগামী নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, বৈঠকে তারা দুটি বিষয় প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছেন। একটি হলো নির্বাচনী পরিবেশ এবং অন্যটি বিচার ও সংস্কার। তিনি বলেন, সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করতে পারেনি। সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এতে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, কোনো ভয়, চাপ প্রতিকূল পরিস্থিতি ছাড়াই নির্বাচন আয়োজনে পরামর্শ চেয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। এই সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনা ও পুনর্গঠন যথার্থ হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। নুরুল হক নুরের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

জোনায়েদ সাকি বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিদের নিয়ে নির্বাচনের পরিবেশ সমন্বয় করার জন্য প্রধান উপদেষ্টাকে একটি কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। বিচার ও সংস্কার বিষয়ে তিনি বলেন, বিচার দৃশ্যমান করা যেমন জরুরি, তেমনি সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেটাও জরুরি। যেসব বিষয় সংবিধান-সংশ্লিষ্ট নয় কিন্তু দলগুলো একমত হয়েছে, সেগুলো বর্তমান সরকারকে অধ্যাদেশের মাধ্যমে করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। যেটি পরে সংসদ বৈধতা দেবে।

জোনায়েদ সাকি বলেন, যেগুলো সংবিধান-সংশ্লিষ্ট কিন্তু ঐকমত্য হয়নি, সেগুলোর ফয়সালা জনগণ করবে। সে জন্য আগামী নির্বাচনের নাম ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের নির্বাচন’ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

তিনি বলেন, একই সঙ্গে সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের অনুমোদন পাবে, অন্যদিকে পাঁচ বছর ধরে জাতীয় সংসদ হিসেবে সরকার গঠন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কাজ করবে।

জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ চায় ইসলামী আন্দোলন : প্রধান উপদেষ্টার কাছে আওয়ামী লীগের মতো জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এমন তথ্য জানিয়ে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন্দ বলেন, আওয়ামী লীগের যে পরিণতি হয়েছে, একইসঙ্গে আমরা জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ চাই।

তিনি বলেন, ‘গত ৫৩ বছরে জনমতের প্রতিফলন হয়নি। যেই লাউ সেই কদু করে ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতিতে নির্বাচন করলে জনমতের প্রতিফলন হবে না।’

পিআর পদ্ধতির কথা উল্লেখ করে ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা বলেন, ৩১টি দলের মধ্যে ২৬টি দল পিআর পদ্ধতির পক্ষে। বিশ্বের ৯১টি দেশে পিআর পদ্ধতি আছে। এটা সুষ্ঠুভাবে জনমতের প্রতিফলন ঘটায়। ৫৩ বছরের জঞ্জাল দূর করার জন্য পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রয়োজনে পিআর পদ্ধতি হবে কি না, সেজন্য গণভোট হতে পারে।

দেশের আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, কোনো উন্নতি হয়নি দাবি করে অধ্যাপক আশরাফ বলেন, বৈঠকে এ নিয়েও কথা হয়েছে। সংস্কার ও বিচার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলেও এ সময় মন্তব্য করেন তিনি।

অধ্যাপক আশরাফ আরও বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা বিষয়টি নিজে নোট করেছেন। তিনি বলেছেন, একটি অপশক্তি সুষ্ঠু নির্বাচনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।’

প্রশাসনে থাকা আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সরিয়ে দেওয়ার দাবি হেফাজতের : বৈঠক শেষে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠুু ও নিরপেক্ষ করার বিষয়ে আমরা বলেছি। সেই সঙ্গে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসরদের গ্রেপ্তার এবং এখনো প্রশাসনে থাকা আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সরিয়ে দেওয়ার কথা বলেছি।’

তিনি বলেন, আজ আমরা দাবি জানিয়েছি সংবিধানের মূলনীতিতে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস কথাটি ফিরিয়ে আনতে। এ ছাড়াও ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের ওপর চালানো গণহত্যা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের বিপক্ষে এলডিপি : এদিকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টার জিজ্ঞাসা ছিল নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য কী কী করা যেতে পারে। আমরা সেই বিষয়ে কিছু পরামর্শ দিয়েছি। সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় যেমন, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এখনো এই সরকার ঠিক করতে পারেনি।

তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা যেভাবে লটারি ব্যবস্থায় পুলিশ ও প্রশাসন সাজানোর কথা বলেছেন, সেটি শিশুসুলভ কথা। কারণ, কিছু জায়গা আছে ভালনারেবল, সেখানে সেভাবে বদলি ও স্থানান্তর করতে হবে। সেটা লটারির মাধ্যমে যথোপযুক্ত নয়।

তিনি আরও বলেন, কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আলোচনা হয়নি।

নির্বাচনে পিআর বা বা সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইতালি, নেপালে আমরা দেখতে পাই পিআর পদ্ধতি সাকসেসফুল না।’

সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে কমিটি চায় এবি পার্টি : এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু বলেছেন, ‘সরকারের নিয়ন্ত্রণ, দৃঢ়তা ও কর্তৃত্ব নিয়ে কথা বলেছি। আমরা এ বিষয়ে জাতীয়, জেলা ও উপজেলাপর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে একটা সমন্বয় কমিটির কথা বলেছি বৈঠকে।’

মজিবুর রহমান আরও বলেন, ‘সরকারের কাজে দৃঢ়তা ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে একটা গ্যাপ আছে, সেটা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নুরের ঘটনায় আমরা দেখেছি। এর সমাধান না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হবে না। একটি সমন্বয় কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করার পরামর্শ দিয়েছি।’

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছি। তাদের কারও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করার অভিজ্ঞতা নেই। আমরা বলেছি সাবেক রিটার্নিং অফিসারসহ যাদের অভিজ্ঞতা আছে, তাদের প্রয়োজনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে।

গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেছেন, নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলে যে অত্যাচারিত হলো সে আমাদের আমলেও মার খাওয়া দুঃখজনক, সে কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা। আজ রাতের মধ্যেই এ বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি প্রকাশ করা হবে।

এর আগে গত রবিবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা। তবে এতেও সংস্কার ও জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে দলগুলোর মতভিন্নতা কাটেনি।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে এসব বিষয়ে নিজেদের আগের অবস্থানই তুলে ধরে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। তবে প্রধান উপদেষ্টা স্পষ্ট করে বলেছেন যে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কেউ যদি নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নিয়ে ভাবে, সেটা হবে জাতির জন্য গভীর বিপজ্জনক।

গত শুক্রবার রাতে জাতীয় পার্টি (জাপা) ও গণ অধিকার পরিষদের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠিপেটায় গণ অধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হকের আহত হওয়ার ঘটনায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বসছেন প্রধান উপদেষ্টা। অন্তর্বর্তী সরকারসহ দেশের প্রায় সব দল নুরুল হকের ওপর হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত