‘কালো হওয়ায়’ স্ত্রীকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা, স্বামীর মৃত্যুদণ্ড

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৬:০২ পিএম

স্ত্রীর গায়ের রঙের কারণে তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ভারতের একটি আদালত। মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দিতে স্ত্রী লক্ষ্মী জানান, তার স্বামী কিশানদাস তাকে সবসময় ‘গায়ের রঙ কালো’ বলে ব্যঙ্গ করতেন।

উদয়পুর শহরের জেলা বিচারক রাহুল চৌধুরী মৃত্যুদণ্ডের ব্যাখ্যায় বলেন, এই হত্যাকাণ্ড ‘নজিরবিহীন ঘটনার’ মধ্যে পড়ে যা মানবতাবিরোধী অপরাধ।

দণ্ডপ্রাপ্ত কিশানদাসের আইনজীবীর বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, তার মক্কেল নির্দোষ এবং তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।

লক্ষ্মী হত্যার ঘটনা ঘটেছে আট বছর আগে। সম্প্রতি ঘোষিত এই রায় দেশটিতে তুমুল সামালোচনা সৃষ্টি করেছে। দেশটিতে গায়ের রঙ নিয়ে সামাজিক মোহ দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে।

আদালতের রায়ে দেখা যায়, ২০১৭ সালের ২৪ জুন রাতে লক্ষ্মীর ওপর হামলা চালানো হয়। মৃত্যুর আগে তিনি পুলিশের কাছে, চিকিৎসকদের কাছে এবং এক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে ঘটনার বিবরণ দেন।

লক্ষ্মী জানান, ২০১৬ সালে বিয়ের পর থেকে তার স্বামী তাকে প্রায়ই ‘কালি’ বলে ডাকতেন এবং শরীর নিয়ে উপহাস করতেন। মৃত্যুর রাতে কিশানদাস একটি প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে আসেন। বোতালের ভেতরে বাদামি রঙের তরল ছিল। তিনি বলেন, এটি নাকি গায়ের রঙ ফর্সা করার ওষুধ।

জবানবন্দি অনুযায়ী, কিশানদাস সেই তরল লক্ষ্মীর শরীরে মাখিয়ে দেন। তখন লক্ষ্মী বলেন তরলে অ্যাসিডের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এরপরই তিনি আগরবাতি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। শরীর জ্বলে উঠলে বাকি তরল ঢেলে দিয়ে পালিয়ে যান স্বামী।

কিশানদাসের বাবা-মা ও বোন লক্ষ্মীকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তিনি মারা যান।

বিচারক তার রায়ে বলেন, এটি কেবল লক্ষ্মীর বিরুদ্ধে নয়, বরং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এটি হৃদয়বিদারক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড।

তিনি আরও বলেন, কিশানদাস তার স্ত্রীর আস্থা ভেঙেছেন এবং শরীর জ্বলতে থাকা অবস্থায়ও অবশিষ্ট তরল ঢেলে দিয়ে চরম নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেছেন।

রায়ে বলা হয়, এটি এমন এক অপরাধ যা মানবতার বিবেককে নাড়িয়ে দেয়—যা একটি সুস্থ ও সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না।

সরকারি কৌঁসুলি দিনেশ পালিওয়াল এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি আশা করেন এটি সমাজের জন্য শিক্ষা হিসেবে কাজ করবে।

পালিওয়াল আরও জানান, তিনি মৃত্যুদণ্ডের রায় অনুমোদনের জন্য উচ্চ আদালতে পাঠিয়েছেন, তবে আসামির কাছে আপিল করার জন্য ৩০ দিন সময় আছে।

অন্যদিকে কিশানদাসের আইনজীবী সুরেন্দ্র কুমার মেনারিয়া বলেন, লক্ষ্মীর মৃত্যু দুর্ঘটনাজনিত ছিল এবং তার মক্কেলের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই। তাকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছে।

উদয়পুর আদালতের এই রায় আবারও ভারতের সমাজে ফর্সা ত্বক নিয়ে অসুস্থ চর্চাকে প্রকাশ্যে এনেছে। গায়ের রঙ একটু শ্যামলা বা কালো হলে মেয়েদের অপমানসূচক নামে ডাকা হয়, তাদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়। আর ত্বক ফর্সাকারী প্রসাধনীর বাজারে প্রতি বছর বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হয়।

পত্রিকার বিয়ের বিজ্ঞাপনগুলোতে কনের গায়ের রঙ প্রায় সবসময় উল্লেখ করা হয়, আর ফর্সা মেয়েদের চাহিদাই বেশি থাকে। স্বামীর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ সহ্য করতে না পেরে অনেক নারী আত্মহত্যা করেছেন এমন অনেক প্রতিবেদনও অতীতে প্রকাশিত হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত