বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবীরা সবসময়ই কাজের চাপে থাকেন। যতটা না কাজ তার চেয়ে বড় অংশ অফিস রাজনীতি। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মী হঠাৎ চাকরি হারান বা চলে যেতে বাধ্য হয়।
কেন এমন হয়
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রভাবশালী বা দীর্ঘদিনের স্থিতিশীল কিছু কর্মকর্তার চারপাশে ছোট ছোট গ্রুপ বা গোষ্ঠী তৈরি হয়। এই গোষ্ঠীগুলোর বাইরে থাকা কর্মীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন না বা সুযোগ একেবারেই দেওয়া হয় না। ফলে যারা ‘ফেভারিট’ নন, তারা সবসময় চাকরি হারানোর ঝুঁকি বা পেছনের কাতারে থাকেন।
যোগ্যতার বদলে ‘সম্পর্ক’ কাজের মূল্যায়নে দক্ষতা নয়, বরং বস বা বসের আমলাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা তোষামোদি প্রাধান্য পায়। যে কর্মী বসের পছন্দের তালিকায় নেই, তার পদোন্নতি বা ইনক্রিমেন্ট আটকে যায়। এমনকি চাকরিও চলে যেতে পারে। এছাড়া দুর্ব্যবহার বা হেনস্তারও শিকার হন কেউ কেউ।
স্বচ্ছ নীতির অভাব বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধি বা চাকরি নবায়নের জন্য কোনো নীতি নেই। তবে যা-ই আছে, তা মনগড়া আর অস্পষ্ট এবং জটিল। সিদ্ধান্ত হয় গোপনে, ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্বের আলোকে। এতে একজন কর্মীর দীর্ঘদিনের অবদানও মূল্যহীন হয়ে ছিটকে পরে মুহূর্তেই। যেমন বস বা মালিকের পছন্দসহ কোনো কর্মকর্তা, তার অনুকূলে যে কোনো পরিবেশ সৃষ্টির জন্য একটা প্রভাব বা ক্ষমতা ব্যবহার করেন। কথায় কথায় ‘স্যার’ এটা বলেছেন, ঐটা বলেছেন বলে অদৃশ্য হুমকি দিতে থাকেন।
হুমকি ও মানসিক চাপ অফিস রাজনীতির কারণে কর্মীদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। কেউ কেউ সহকর্মীর সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা করেন, আবার কেউ বসের সামনে অন্যকে ছোট করে নিজের অবস্থান মজবুত করেন। আবার কেউ নিজের অস্তিত্বের সংকট থাকা সহকর্মীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এ ধরনের পরিবেশে কর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অনেকেই চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
নারীকর্মীদের অতিরিক্ত ঝুঁকি শুধু দক্ষতার ঘাটতিতে নয়, অফিস রাজনীতির ‘বায়াস’ এর শিকার হয়েও হয়। একই কাজ করে যেখানে পুরুষ সহকর্মীরা অগ্রাধিকার পান, সেখানে নারীদের ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্র দেখা যায়। তাছাড়া কিছু নারীকর্মী নিজেকে ভিন্নমাত্রায় উপস্থাপন করতে গিয়েও অযোগ্যতার ঝুঁকিতে পড়েন।
বাংলাদেশে শ্রম আইন আছে। তারপরও অফিস রাজনীতির কারণে অন্যায়ভাবে চাকরি হারালে কর্মীরা আইনি প্রতিকার খুব কমই পেয়ে থাকেন। যেখানে অফিসের অভ্যন্তরেই অসহযোগী ভাবাপন্ন সেখানে বাইরে থেকে তার সহযোগিতা পাওয়া আরও দুরূহ।
বাংলাদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অফিস রাজনীতি এমন এক অদৃশ্য শক্তি, যা একজন কর্মীর যোগ্যতা বা পরিশ্রমকে এক নিমেষে মূল্যহীন করে দিতে পারে। অফিস রাজনীতি ঠেকাতে সবচেয়ে জরুরি হলো স্বচ্ছ নীতি, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং শ্রম আইন কার্যকর করা। না হলে, যত মেধাবী কর্মীই হোক না কেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তার চাকরি সবসময় অনিশ্চিত থাকবে।
