শুধু ফলাফলমুখী শিক্ষা নয়, বিকশিত হোক মানবতার দীক্ষা। এটি বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থকে ৫টি উপজেলায় শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষা অনুরাগী ব্যক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ৫টি কর্মশালা এবং জেলা পর্যায়ে সবাইকে নিয়ে আরও একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ওই কর্মশালার সুপারিশ নিয়ে একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় সেই প্রেক্ষিতে শিক্ষা উপদেষ্টা মহোদয়, মাধ্যমিক শিক্ষা সচিব, কারিগরি সচিব, ঢাকা বোর্ড চেয়ারম্যান, ডিজি মাউশিসহ অন্যদের নিয়ে দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। যার সুপারিশমালা প্রণয়নের কাজ চলমান। এমন প্রেক্ষাপট বিবেচনাতেই আজকের লেখা। প্রকৃতভাবে, একজন মানুষকে সফল হিসেবে গড়ে তোলার জীবনব্যাপী সব আয়োজনই শিক্ষা। একটি জাতি তথা দেশকে, সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম এটি। শিক্ষা মানবসভ্যতা বিকাশের অন্যতম প্রধান উপাদান হলেও, আজ তা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে কেবল জিপিএ-৫, সার্টিফিকেট অর্জন অথবা চাকরি পাওয়ার মধ্যে। শুধু পাস করা, ভালো রেজাল্ট করা ও শিক্ষিত হওয়া এক বিষয় নয়। যে কারণে পাসের হার বাড়লেও, শিক্ষার গুণগতমান বাড়ছে না। সন্তান কতটা মানবিক জ্ঞানসম্পন্ন হলো, কতটা সুশিক্ষিত হলো সেদিকে আমাদের খেয়াল নেই। সবাই ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে। অর্থের বিনিময়ে অর্জিত শিক্ষায় দেশপ্রেম, ভদ্রতা, সভ্যতা, মানবিক মূল্যবোধ আজ প্রায় বিলুপ্ত।
সমাজে সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার দৃঢ় মানসিকতাসম্পন্ন মানুষের বড্ড অভাব। তাই আমাদের সেøাগান-‘কেবল নয় ফলাফলমুখী শিক্ষা, বিকশিত হোক মানবতার দীক্ষা’। এ কথা সত্য, যে শিক্ষা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটায় না, বিবেক জাগ্রত করে না, মনের দিগন্ত প্রসারিত করে না, মানবতাবোধ জাগ্রত করে না তা প্রকৃত শিক্ষা নয়। তাই শিক্ষা হতে হবে মানবিক ও নৈতিকতা নির্ভর, যা শিক্ষার্থীর নৈতিক মানদ-কে উন্নত করার পাশাপাশি অন্তরের মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করবে। কারণ নৈতিকতা বিবর্জিত বিদ্বান ব্যক্তি, সমাজ-সংস্কার কিংবা সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষায় কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি বিকাশের বিষয়টি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক এই ত্রিভূজ সম্পর্কের ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠে। বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, শিক্ষার সামাজিক প্রভাব কী? সমাজব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে মেধা না অর্থ? সম্মানিত কে, অর্থশালী না বিদ্বান? আমাদের দেশে মানুষ ছুটছে, অর্থ না বিদ্যার পেছনে? জাতির মেরুদন্ড শিক্ষা না অর্থনীতি? শিক্ষা কি সমাজ গড়ছে, না সাম্রাজ্য? আমাদের রোল মডেল কি দুর্নীতিবাজ না সস্তা জনপ্রিয়তার কেউ? শিক্ষার উদ্দেশ্য কি সমস্যার সমাধান, নাকি অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানো? শিক্ষা কি আমাদের বিবেককে প্রসারিত করছে নাকি অন্ধ অনুকরণের পথে নিয়ে যাচ্ছে? মানুষ কি বিবেকের তাড়না, না হুজুগে চলছে? মুক্তচিন্তার প্রকাশ কোথায়? তরুণ সমাজের লক্ষ্য কী? শিক্ষা কি আজ মানুষকে রোবট বানাচ্ছে? সমাজের আলোচনার বিষয়বস্তু কী? আমরা শিক্ষিত হচ্ছি কুশিক্ষা না সুশিক্ষায়? একদিকে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বত্র মূল্যবোধের অবক্ষয়। অন্যদিকে নৈতিকতা আর উদারতা প্রায় ম্রিয়মাণ। সমাজ হয়ে পড়েছে দুর্নীতিগ্রস্ত, স্বার্থপর ও অসহিষ্ণু। দৃষ্টি শুধু স্বার্থের চোখে নিবদ্ধ, মানবিকতার চোখ কার্যত অন্ধ। আমাদের তরুণ সমাজের কাছে আজ সবচেয়ে বড় সংকট অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের। কাকে অনুসরণ করে স্বপ্ন বুনবে, কার চরিত্র অনুকরণ করবে, কার আদর্শে নিজেকে আলোকিত করবে তার কোনো সমাধান নেই। তাই আমরা দেখতে পাই, নৈতিকতা বিবর্জিত এই সমাজে, বড় অপরাধীরাও উঁচু ডিগ্রিধারী। অন্তত পুঁথিগত বিদ্যায় তারা অনেকটা এগিয়ে।
সমাজ জীবনে স্নেহ-প্রীতি-ভালোবাসা প্রায় অবলুপ্ত, মানবতা-নৈতিকতা-উদারতা বিলীন প্রায়, শ্রদ্ধা-বিনয় অদৃশ্য, দুর্নীতি ও ভ্রষ্টাচারে সামাজিক পরিম-ল কলুষিত। হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, অপহরণ, ইত্যাদি স্বাভাবিক জীবনকে ছন্দহীন করে তুলেছে। মাদক, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, শিশুধর্ষণ, নারী নির্যাতনের মতো অপরাধ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। অপকর্মের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। আমাদের শিশু-ছাত্র-যুবারা দিন দিন মানসিকভাবে আহত হয়ে বিপথগামী হতে চলেছে। এমন অবস্থা জাতির জন্য খুবই ভয়ংকর। তাই আজকের তরুণ প্রজন্মকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যে প্রজন্ম কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবে না তারা হবে ছোটদের প্রতি স্নেহশীল, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, দেশপ্রেমে উজ্জীবিত। তারা অন্যের বিপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে এবং সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ ঘটাবে। আলোকিত তরুণরাই হবে, আলোকিত ভবিষ্যৎ। একজন মানুষের চিন্তা, কর্ম, আচরণের মৌলিক প্রভাবের সুতিকাগার হচ্ছে পরিবার। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, নীতি- নৈতিকতা কিংবা অন্যের মতামত গ্রহণ করার মতো মানসিকতার শিক্ষা, পরিবার থেকেই নিতে হয়। শিশুর প্রথম শিক্ষালয় তার পরিবার এবং প্রথম শিক্ষক তার মাতা-পিতা। সেহেতু শিশুকে পারিবারিক মূল্যবোধ, উন্নত চরিত্র, সৎ আদর্শবান নাগরিক ও উন্নত চরিত্রের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রধান নিয়ামক হচ্ছে পরিবার। তাই শিশুদের নৈতিকভাবে বিকশিত করতে হলে, পরিবারের সদস্যদের নৈতিক গুণাবলি সম্পন্ন হতে হবে। কিন্তু বর্তমান সমাজব্যবস্থায় মানুষ যেমন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, তেমনি ধ্যান-ধারণা ও চিন্তায় এসেছে নানা পরিবর্তন। কিন্তু আমরা যদি নিজেরাই সততা ও নৈতিকতার মূর্ত প্রতীক কিংবা সহানুভূতির প্রতিচ্ছবি না হতে পারি, তবে তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করা কিংবা উন্নত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব। বাবা-মা এবং অভিভাবকরা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সন্তানকে নৈতিক শিক্ষার পরিবর্তে, সাটিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষায় প্রলুব্ধ করছে। সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর থেকেই, এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। কার সন্তান কত শিক্ষিত হলো, কার পরীক্ষায় কি রেজাল্ট হলো, কে কোথায় পড়ে, পড়া শেষে কী করবে, কার ছেলে বিজ্ঞানী হলো, ইঞ্জিনিয়ার হলো তা মুখ্য আলোচনার বিষয়বস্তু হলেও নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা, দেশপ্রেম কিংবা সত্যিকারের মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার বিষয়ে কোনো ধরনের আলোকপাত নেই।
শিক্ষকতা মহান পেশা। যারা মানুষের শ্রদ্ধা, আদর্শ ও অনুকরণের প্রেরণা। মহানুভবতা, ন্যায়পরায়ণতা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও সচ্চরিত্রের মতো মানবীয় গুণাবলির জন্য একজন শিক্ষক সবার অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় হয়ে ওঠেন। মানবিক মূল্যবোধের এসব গুণাবলি সমাজ জীবনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। শিক্ষক হয়ে উঠেন গুরু, ছাত্র হয় শিষ্য। শিক্ষক ছাত্রকে শুধু শিক্ষা নয়, সঙ্গে জাগ্রত করেন দীক্ষাও। কারণ শিক্ষকদের দায়িত্ব শুধু পাঠদান, সিলেবাসের প্রশ্ন শেখানো কিংবা পরীক্ষায় পাস করানো নয় বরং শিক্ষার্থীদের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ, মানবিক মানুষ তৈরি, বিবেকবোধ জাগ্রত করা এবং উন্নত চরিত্র গঠন। বিষয়টি তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিমুখতা, শিক্ষকের বিরুদ্ধাচরণ কিংবা শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন, দলাদলি আজকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক সাধারণ চিত্র। আবার অনেক শিক্ষকও হয়ে পড়েছেন বাণিজ্যমুখী। ফলে ক্লাস থেকে কোচিং-প্রাইভেটেই তাদের মনোযোগ বেশি। বিদ্যা আজ বাক্সবন্দি, পড়াশোনা শুধু পরীক্ষামুখী। বিদ্যালয়গুলো এখন শুধু পাসের হার, গ্রেড আর নম্বরের পেছনে ছোটাছুটি। কী শেখানো হচ্ছে আর কী শেখানো দরকার তা নিয়ে কোনো আয়োজন নেই; নেই কোনো লাগসই পরিকল্পনা। শিক্ষার্থীরা আজ অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যেমন আপন করে ভাবতে পারছে না, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও আগ্রহ বা আকর্ষণের জায়গা হিসেবে নিজেদের মেলে ধরতে পারছে না। পড়ালেখা যেন তাদের কাছে এক ধরনের বাধ্যবাধকতা, সার্টিফিকেট প্রাপ্তিই যার মূল উদ্দেশ্য। ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, পরীক্ষার আগে ও পরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাপ, হতাশা ও ক্লান্তি এমনভাবে প্রকট হয়ে উঠেছে যে, তারা কখনো কখনো পরীক্ষাকেন্দ্র ভাঙচুরের মতো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় লিপ্ত হচ্ছে। এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ও মানসিক দুর্বলতার প্রতিফলন। এ কারণেই শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধাবোধের স্থানটি আজ অনেকটা বিবর্ণ।
ছাত্রসমাজের সামনে আজ অনুকরণীয় অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বের বড় অভাব। পাঠদান শুধু পাঠ্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, বইয়ের বাইরে শেখা হচ্ছে না কিছুই। মানসম্মত শিক্ষক না থাকায়, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ শুধু অতীত স্মৃতি। সমাজে আদর্শবান ব্যক্তির অভাব, বিত্তবানরাই যেন আদর্শ আর পেশিশক্তির অধিকারীরা যেন সমাজপতি। তাই সমাজ আর গড়ে উঠছে না, উঠছে সাম্রাজ্য। চাকরি পাওয়া বা আর্থিকভাবে সচ্ছলতা আনতেই ব্যস্ত মুখস্থনির্ভর আজকের শিক্ষা। ফলে বিত্ত-বৈভব আর প্রাচুর্যে জীবনকে রাঙিয়ে তোলার প্রবল বাসনায় ব্যক্তি বা সমাজের জন্য মহৎ কিছ ুকরার স্বপ্ন, অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের মূল চালিকাশক্তি সততা ও নিষ্ঠার মতো মানবিক গুণাবলি। আমরা ভুলে যাই, জীবন শুধু একটি ভ্রমণযাত্রা, কোনো প্রতিযোগিতা নয়। শেষ পর্যন্ত একটি বিন্দুতে এসে থামতে হয়, না চাইলেও। আমরা যদি সত্যিই এক উন্নত, মানবিক ও ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে হতে হবে আনন্দময় ও অংশগ্রহণমূলক। যে শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীর নৈতিক মানদ-কে উন্নত করার পাশাপাশি, তার ভেতরকার মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকবে উৎসবমুখর পরিবেশ। শিক্ষকরা হবেন সবার অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। অভিভাবকদের লক্ষ্য শুধু ভালো ফলাফল হবে না, লক্ষ্য হবে সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার। প্রকারান্তরে তারা হবে মেধাবী, মানবিক, নৈতিকতাবোধসম্পন্ন ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এক প্রজন্ম যেখানে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে থাকবে না কোনো ভয়, থাকবে না শঙ্কা। সম্পর্কের ভিত্তি হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার। তখন জীবনের গভীর সৌন্দর্য্য নিজস্ব ভঙ্গিতে ফুটে উঠবে। ঠিক তখনই আগামী প্রজন্মের কাছে এ দেশ হবে নিরাপদ, ভ্রাতৃত্বসম্পন্ন। অর্জিত হবে স্বপ্নের কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ। কারণ আজকের তরুণরাই গড়বে আগামীর বাংলাদেশ।
লেখক: জেলা প্রশাসক, নারায়ণগঞ্জ
