আগামীকাল ১৫ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। এ দিবসের মূল লক্ষ্য হলো গণতন্ত্রের নীতি প্রচার ও সমুন্নত রাখা। যা স্বাধীনতা, আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও মানবাধিকার সমর্থন করে। এবারের মূল প্রতিপাদ্য: ‘গভর্নেন্স ও সিটিজেন এনগেজমেন্টের জন্য এআই নেভিগেট করা’, তথা সুশাসন ও নাগরিক অংশগ্রহণের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করা। আইনের প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করতে হলে, প্রযুক্তির উৎকর্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে। নানা সময় নানা উপায়ে, গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ৪২২ সালে ক্লিয়ান ডেমোক্রেসিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে ‘ÔThat shall be the democratic which shall be the people, for the people’ যার অর্থ হলো , এটাই হবে গণতান্ত্রিক যা হবে জনগণ, জনগণের জন্য। অনেক পরে আব্রাহাম লিঙ্কন November 19, 1863 তারিখে জনপ্রিয় সংজ্ঞা দেন। তিনি Pennsylvania state-এর গেটিসবার্গ বক্তৃতাতে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা দিয়েছিলেন এভাবে ‘Government of the people, by the people, for the people.’ যার অর্থ হলো ‘গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের অংশগ্রহণ, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য।’
অধ্যাপক গেটেলের মতে, ‘যে শাসনব্যবস্থায় জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগে অংশ নেওয়ার অধিকারী, তাই গণতন্ত্র। অ্যারিস্টটল গণতন্ত্র সম্পর্কে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করেছেন। তিনি গণতন্ত্রকে সরকারব্যবস্থার একটি রূপ হিসেবে দেখেছেন। যেখানে জনগণের ইচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তা সর্বদা সেরা বা ন্যায়সংগত সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না। তার বিখ্যাত উক্তি হলো ‘গণতন্ত্র তখনই হয় যখন দরিদ্ররা শাসন করে, সম্পদশালী ব্যক্তিরা নয়’। প্লেটো গণতন্ত্র সম্পর্কে বেশ সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। তিনি মনে করতেন যে ‘গণতন্ত্র জনসাধারণের আবেগনির্ভর সিদ্ধান্তের কারণে বিশৃঙ্খলায় পরিণত হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দিতে পারে।’ তার উল্লেখযোগ্য উক্তি ‘গণতন্ত্র এক মনোমুগ্ধকর সরকারব্যবস্থা, যা বৈচিত্র্য ও বিশৃঙ্খলায় পরিপূর্ণ; এবং এটি সমান ও অসম ব্যক্তিদের জন্য এক ধরনের সমতা প্রদান করে।’ অতিরিক্ত স্বাধীনতা রাষ্ট্র বা ব্যক্তির মধ্যে, এক সময় কেবলমাত্র অতিরিক্ত দাসত্বের দিকে নিয়ে যায়। স্বৈরতন্ত্র সাধারণত গণতন্ত্র থেকে জন্ম নেয় এবং চরম স্বাধীনতা থেকে সবচেয়ে কঠোর স্বৈরাচার ও দাসত্বের সৃষ্টি হয়। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে গণতন্ত্র হচ্ছে ‘আলোচনাভিত্তিক শাসন’ এই দর্শনটি বর্তমানে পাশ্চাত্যে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং গণতন্ত্রকামী উন্নত দেশগুলোতে এ ধারণাটি আজকাল বেশ ভালোভাবেই অনুসৃত হচ্ছে। শুধু অমর্ত্য সেনই নন, আরেক বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন যেমন বলেছেন ‘অবাধ, মুক্ত এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত’।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গণতন্ত্রের ধারণার একজন শক্তিশালী প্রবক্তা ছিলেন। তিনি মনে করতেন, গণতন্ত্র কেবল রাজনৈতিকব্যবস্থা নয়, বরং মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক মুক্তি এবং আত্মবিকাশের একটি পথ। তিনি বিশ্বাস করতেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সর্বজনীন শিক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র সম্ভব নয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার মাধ্যমে স্বাধীনতার দাবি তুলে ধরেন এবং ভারতবাসীকে তাদের অধিকারের জন্য সোচ্চার হতে অনুপ্রাণিত করেন। তার শক্তিশালী লেখাগুলো মানুষকে অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সাহস জোগাত, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতারই একপ্রকার রূপ। তার লেখায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কোনো মানুষ বা সমাজ যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত না হয়। গণতন্ত্র এমন শাসনব্যবস্থার বিপরীত, যেখানে ক্ষমতা জনগণের হাতে থাকে না, যা স্বৈরাচারীব্যবস্থায় দেখা যায়। এমনকি স্বৈরাচারী দেশগুলোও নিজেদের গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে। তবে, ভি-ডেম এবং ইকোনমিস্টের গণতন্ত্র সূচক অনুযায়ী, ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বের অর্ধেকেরও কম মানুষ গণতন্ত্রে বাস করেছে। প্রজাতন্ত্র প্রায়ই গণতন্ত্রের সঙ্গে মিলে যায়। কারণ দুটোতেই জনগণের সম্মতিতে শাসন চলে। তবে প্রজাতন্ত্র মানেই গণতন্ত্র নয়, কারণ প্রজাতন্ত্রে জনগণ কীভাবে শাসন করবে, তা বলা থাকে না। এ সময় গণতন্ত্র শব্দটা সাধারণত রাষ্ট্রের জন্য ব্যবহৃত হলেও এর নীতি ক্লাব, সংগঠন বা কোম্পানির মতো জায়গাতেও ব্যবহার করা যায়। গণতন্ত্র এখন অনিশ্চিত মধ্যবয়সের সংকটে পড়েছে। এটাই মনে করছেন, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের প্রধান ডেভিড রাঞ্চিম্যান। গণতন্ত্রের অনেক দুর্বলতা রয়েছে। গণতন্ত্র মানুষের তৈরি গতানুগতিক একটি পদ্ধতি এবং এটি আদৌ নিখুঁত নয়। বহুদলীয় ব্যবস্থায় গণতন্ত্র কখনো পুরোপুরি সফল নয়। যখন দুটি দল একে অপরের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, তখন যে কোনো একটি জিততে পারে, আর কেবলমাত্র তখনই একটি শক্তিশালী সরকার গঠন সম্ভব হয়। মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো অধিকাংশ ব্যক্তি নিজে নেতা হতে চায়, ফলে মানুষ অসংখ্য দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এতে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই কারণে অনেক ক্ষেত্রে গণতন্ত্র ব্যর্থতার বৃত্তে আটকে থাকে।
গণতন্ত্রের আরও অনেক দুর্বলতা রয়েছে, যেমন এখানে অন্ধকার এবং আলোর মূল্য সমান। অর্থাৎ মূর্খ এবং জ্ঞানীর ভোটের মূল্য সমান। সবার জানা আছে, আলো এবং অন্ধকার একই সময়ে, একই স্থানে থাকতে পারে না। তারা দুটি ভিন্ন অবস্থা, একটি অন্যটির অনুপস্থিতির কারণে ঘটে। ‘অন্ধ’ ও ‘চক্ষুষ্মান’ কি সমান হতে পারে? ঠিক যেমন সমান হতে পারে না মূর্খ ও বিদ্বান। বিগত বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়নি। বিশ্বব্যাপী কয়েক প্রজন্ম গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা ও প্রয়োগ ছাড়াই একটি ভীতিকর ও কর্তৃত্ববাদী পরিবেশে বেড়ে উঠেছে। বিশেষ করে, তরুণদের উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নস্যাৎ করা হয়েছে। সবল ও শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়ে তোলার জন্য বিশ্বকে এখনো অনেক দূর এগোতে হবে। এ জন্যই তরুণ সমাজ এবং বিশেষ করে জেন-জিদের হাত ধরে দেশে দেশে বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হচ্ছে। আশা করা যায়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। যেখানে সব রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে, ভোটাধিকার প্রয়োগ করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক
