মেরুদণ্ড ছাড়া যেমন মানুষ দাঁড়াতে পারে না, তেমনি শিক্ষা ছাড়াও একটি জাতি উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে যেতে পারে না। বিশ্বের বুকে যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, সে জাতি তত বেশি উন্নত ও সমৃদ্ধ। শিক্ষা ছাড়া রাষ্ট্রের সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়। একটি জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে, শুধু এর শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিলেই চলে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখব একটি জাতিকে ধূলিসাৎ প্রকল্পে শিক্ষার ওপরই আক্রমণ হয়েছে আগে। ১৯৬২ সালে স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার তৎকালীন শিক্ষা সচিব এস.এম. শরিফের নেতৃত্বে একটি শিক্ষাকমিশন গঠন করে প্রণয়ন করল চরম বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি, যা ‘শরিফ কমিশন’ নামে পরিচিত।
‘টাকা যার শিক্ষা তার’ এ মূলমন্ত্রকে ধারণ করে শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করে, একটি বিশেষ শ্রেণির হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাবসহ একটি সাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতি এদেশের জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দিতে চাইল তৎকালীন আইয়ুব সরকার। এ চরম বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে সদাজাগ্রত ছাত্রসমাজ ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর হরতাল আহ্বান করে এবং এর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে পেশাজীবী, শ্রমিক, কৃষকসহ সর্বস্তরের মানুষ। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা দিবসের ৬৩ বছর পরও ছাত্রসমাজের সর্বজনীন শিক্ষার যে আকাক্সক্ষা, তা আজও পূরণ হয়নি। কিছুটা সংশোধন হলেও সেই ব্রিটিশ-পাকিস্তানি আমলে কেরানি ধাঁচের নির্মিত শিক্ষাব্যবস্থা এখনো বহালতবিয়তে রয়েছে। শিক্ষা ও ছাত্র আন্দোলনের তাৎপর্যপূর্ণ এ ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই অজানা রয়ে যাচ্ছে, ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের কথা।
শিক্ষা এখনো বাজারে ওঠে, চলে শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা। পার্থক্য একটাই আগে বিক্রি হতো খোলাবাজারে আর এখন বিক্রি হয় সুসজ্জিত শোরুমে। হু হু করে বাড়ছে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে পড়তে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন, যা দেশের অধিকাংশ মানুষের পক্ষে বহন করা অসম্ভব। তা ছাড়া এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই শিক্ষার গুণগতমান। অবশেষে উন্নতির পথে অগ্রসর হতে গিয়ে আমরা পেয়েছি জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০। যেখানে চমৎকার সাবলীল ভাষায় ও কৌশলে দেওয়া হয়েছে ‘শুভংকরের ফাঁকি’। শিক্ষা দিবসের চেতনায় ওঠে আসা সর্বজনীন, বৈষম্যহীন এবং একই ধারার বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে শিক্ষাকে করা হয়েছে বেসরকারিকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ। যার প্রভাবে সারা দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা সর্বস্তরেই চরম নৈরাজ্য চোখে পড়ছে। দেশে এখনো রয়ে গেছে শিক্ষক সংকট। এখনো বিভিন্ন ন্যায্য দাবিদাওয়া নিয়ে স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের আমৃত্যু অনশনে যেতে হয়, যা শিক্ষাদিবসের চেতনার পরিপন্থি। দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে হলে, সবার আগে প্রয়োজন সর্বজনীন মতামতের ভিত্তিতে একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা। যেখানে শিক্ষা হবে সবার জন্য অবাধ। ‘শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, শিক্ষা সবার অধিকার’ এটি সর্বস্তরে প্রতিফলিত হোক মহান শিক্ষা দিবসে।
আমাদের শিক্ষার মান বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার মান কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অপরাজনীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর অপশাসনে ভারাক্রান্ত দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব হলো শিক্ষার্থী। মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা বড় বড় স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে এসে এখানে অনিয়ম, অপশাসন, অব্যবস্থাপনার বেড়াজালে আটকা পড়েন। এসব বেড়াজালে অনেককেই জীবন বলি দিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হলো গবেষণা। অথচ এখানে নেই গবেষণা, নেই গবেষণার গুরুত্ব, অন্যের থিসিস চুরি করে ডিগ্রি নেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন পরিণত হয়েছে শুধু ‘আমলা-কেরানি’ তৈরির কারখানায়। এখানে মুক্তচিন্তার চর্চা নেই, মুক্তমতের স্বাধীনতা নেই, নেই সাংস্কৃতিক চর্চা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে দেখা যায় অস্বচ্ছতা; অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অনিয়মে ভারাক্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। রাজনৈতিক লবিংয়ে ছেয়ে গেছে উচ্চশিক্ষার উচ্চপদগুলো। ফলে শিক্ষা তার প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হচ্ছে।
বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে আমাদের অবস্থান দিন দিন তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। এখনই এসবের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে, উচ্চশিক্ষার পথ অচিরেই অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাবে। শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য, শিক্ষায় বৈষম্য দূর না করতে পারলে, একটি যুগোপযোগী কার্যকরী শিক্ষা কমিশন গঠন এবং এর বাস্তবায়ন না করতে পারলে শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব হবে না। সার্বিকভাবে শিক্ষা খাত পুনর্গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক সহিংসতা-মুক্ত করতে হবে। সর্বোপরি একটি মানসম্মত, যুগোপযোগী ও কল্যাণকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠুক এই প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
