জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগে জামালপুর পৌরসভার বাসিন্দারা। বছরের অন্তত ছয় মাস তাদের নিত্যসঙ্গী দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা পানি। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি ঢুকছে লক্ষাধিক মানুষের বাড়িঘরে। পাঁচ বছর ধরে এই ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন তারা। নিয়মিত কর পরিশোধ করে এবং বারবার আবেদন করেও মিলছে না এর প্রতিকার।
শহরের চামড়া গুদাম, নয়াপাড়া, কাচারিপাড়া, ফকিরবাড়ি, বিসিক শিল্পনগরী, দড়িপাড়া, মিয়াপাড়া, সরদারপাড়া, পলাশগড়, মনিরাজপুর, পাথালিয়াসহ পৌরসভার ১২টি ওয়ার্ডে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক তলিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, পানি নিষ্কাশনের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থাগ্রহণ করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় পানি নিষ্কাশনের তেমন কোনো ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বছরের ছয় মাস যাতায়াতের সড়ক পানির নিচে তলিয়ে থাকে। বৃষ্টি হলেই তারা আতঙ্কে থাকেন। বাড়িঘরে পানি ঢোকে। এই পৌরসভার প্রায় লক্ষাধিক মানুষকে পরিবার নিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে রোগীদের যাতায়াতে ভোগান্তি চরমে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। পানির মধ্যে দিন কাটছে তাদের। ময়লা, দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে বসবাস করে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তারা। অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র ভাড়া বাড়িতে বসবাস করছেন। এখানে অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে পানি নিষ্কাশনের রাস্তা বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। এ নিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষ বারবার ধরনা দিয়েও কোনো কাজ হয়নি।
অপরদিকে শহরের চামড়া গুদাম, নয়াপাড়া, কাচারিপাড়া, ফকিরবাড়ি মোড়, বিসিক শিল্পনগরীসহ মিয়াপাড়া, সরদারপাড়া এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক তলিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজগামী শিক্ষার্থী, পথচারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
পৌরশহরের পলাশতলা এলাকার ছোট এক ঝুপড়ি ঘরে আশ্রয় হয়েছে ৮০ বছর বয়সী আবেদন বেগমের। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে ঠাঁই মিলেছে এখানে। কিন্তু গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে বছরের ছয় মাস ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি জমে থাকে তার ঘর এবং উঠানে। এখানেও শান্তি নেই এই বৃদ্ধার। তিনি বলেন, ‘পাঁচ মাস ধরে পানির মধ্যে ভাসতাছি। এল্লা প্রস্রাব, পায়খানা, গোসলের জায়গা নাই। এন্ধে (রান্না করে) খাবো কি জো নাই। কোনখান্দি যাবার পাই নে।’
এ নিয়ে পলাশতলা এলাকার তোতা মিয়া বলেন, ‘এখানে রেলের জমিতে একটি পুকুর করা হয়েছে। তার পুকুরের কারণে পানি বের হওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা অনেক জায়গায় গেছি। কিন্তু কোনো লাভ হয় নাই। আমরা এই দুর্ভোগ থেকে বাঁচতে চাই।’
এ বিষয়ে জেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্র নদের পাশেই জামালপুর পৌরশহরের অবস্থান। এ শহরের পানি সহজেই ব্রহ্মপুত্র নদে নিষ্কাশন করা যায়। কিন্তু অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। ফলে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। একটি পরিকল্পিত শহর গড়ার জন্য পানি ব্রহ্মপুত্র নদে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই জলাবদ্ধতা নিরসন হবে।’
এ প্রসঙ্গে পৌর প্রশাসক এ কে এম আব্দুল্লাহ বিন রশিদ বলেন, ‘অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফল হচ্ছে শহরের জলাবদ্ধতা। এ জলাবদ্ধতা নিরসনের আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। যেখান থেকেই জলাবদ্ধতার খবর পাচ্ছি, সেখানেই গিয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করছি। যেভাবে পানি নিষ্কাশন করা যাচ্ছে সেইভাবেই করা হচ্ছে। নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করাসহ শ্যালোমেশিন লাগিয়ে, আবার কোথাও কাঁচা ড্রেনের ব্যবস্থা করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পানি নিষ্কাশনে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
প্রসঙ্গত, দেড়শ বছরের পুরনো ও প্রথম শ্রেণির জামালপুর পৌরসভার অনেক এলাকায় এখনো নাগরিক সেবা পৌঁছায়নি। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা বড় ধরনের সমস্যা হয়ে উঠেছে। পৌর কর্তৃপক্ষ একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে এ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দেবেএমনটাই প্রত্যাশা পৌরবাসীর।