হু হু করে বাড়ছে তিস্তা নদীর পানি, হুমকির মুখে বাঁধ

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৬:২১ পিএম

অতিভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি হু-হু করে বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। এতে তিস্তা নদীর দিক পরিবর্তনে আজ শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ভেন্ডবাড়ি এলাকায় তিস্তা নদীর ডানতীর প্রধান বাঁধ ও এক নম্বর স্পার বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ভারতের পূর্ব উত্তর প্রদেশ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে বিহার পর্যন্ত একটি ঘূর্ণাবর্তের অবস্থান উত্তরবঙ্গের আকাশে বিপুল পরিমাণ জলীয়বাষ্প আসছে। এরই ফলস্বরূপ বৃহস্পতিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাত থেকে শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়, নীলফামারীসহ ভারতের বিভিন্ন জেলায় অতিভারী বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, রাতভর বৃষ্টির মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশের পঞ্চগড় ও ভারতের জলপাইগুঁড়ি, দার্জিলিং, কোচবিহার। সকাল থেকেও আকাশ মেঘে ঢাকা। সকাল ৯টার পর বৃষ্টিতে ভিজছে বিভিন্ন এলাকা।

এদিকে অতিভারী বৃষ্টির জেরে উজানের ঢলে তিস্তা নদীর প্রবল স্রোতে ও দিক পরিবর্তনে নীলফামারীর ডিমলার ঝুনাগাছচাঁপানী ইউনিয়নের ভেন্ডাবাড়ি নামক স্থানে ডানতীর প্রধান বাঁধ ও ১৪০ ফিট দীর্ঘ একটি স্পার বাঁধ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সেখানে নীলফামারীর ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ শুক্রবার ভোর ৫টা থেকে ভাঙন রোধে জরুরি কাজ করছে। সচেতন মহল বলছেন অতিভারী বৃষ্টির দুর্যোগ ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।

নীলফামারী ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস সর্তকীকরণ কেন্দ্রের পানি পরিমাপক নুরুল ইসলাম মুঠোফোনে দেশ রূপান্তরকে জানান, তিস্তা নদীর পানি শুক্রবার ডালিয়া পয়েন্টে সকাল ৯টায় বিপৎসীমার (৫২.১৫) দশমিক ২৫ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। যা বেলা ১২টায় দশমিক ১২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার দশমিক ১৩ সেন্টিমিটার (৫২.০২) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও বেলা তিনটায় পুনরায় পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার দশমিক ১০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল এবং পানি বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল।

তিনি জানান, তবে খবর পাওয়া গেছে উজানের ভারতের তিস্তা নদীর সীমান্ত মেখলিগঞ্জ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বেলা ২টায় বিপৎসীমার (৬৫.৯৫) দশমিক ৩৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সে পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। দো-মহনী পয়েন্টে তিস্তার পানি বেলা ২টায় বিপৎসীমার (৮৫.৯৫) দশমিক ২৯ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি স্লুইচগেট খুলে রাখা হয়েছে।

এদিকে দেশের সবর্বোত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় ২০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিস ২০২ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করে।

অপরদিকে ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় জলপাইগুঁড়িতে ৪১৯ মিলিমিটার, দার্জিলিং ও শিলিগুঁড়িতে ২৪১ মিলিমিটার, কোচবিহারে ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রের্কড করা হয়। এ ছাড়া বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলা হয়েছে, মৌসুমী বায়ুর অক্ষের বর্ধিতাংশ উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমী বায়ু বাংলাদেশের ওপর মোটামুটি সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে।

দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্র নাথ রায় মুঠোফোনে দেশ রূপান্তরকে জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় তেঁতুলিয়ায় ২০২ মিলিলিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

এদিকে নীলফামারী সৈয়দপুর বিমানবন্দর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ লোকমান হাকিম দেশ রূপান্তরকে জানান, গতকাল সকাল ৯টার পর থেকে উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, দিনাজপুর, রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে অতিভারি বৃষ্টি শুরু হয়। তবে সকাল ৯টার পূর্ব পর্যন্ত পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ২০২ মিলিমিটার, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ২৭ মিলিমিটার, দিনাজপুরে ৩ মিলিমিটার, রংপুরে ২ মিলিমিটার, নীলফামারীর ডালিয়ায় ১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। তবে সকাল সারে ১১টার পর বৃষ্টিপাতের রেশ অনেকটা কমেছে বলে তিনি যোগ করেন।

তিস্তা নদীর দিক পরিবর্তনে ভাঙন শুরু

অতিভারী বৃষ্টি ও উজানের তীব্র স্রোতে তিস্তা নদী দিক পরিবর্তন করে ভয়াবহ ভাঙনের পরিস্থিতি সৃস্টি করেছে। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাঁপানী ইউনিয়নে ভেন্ডাবাড়ি নামক স্থানে এক নম্বর স্পার বাঁধে ধ্বস নেমেছে। সেখানকার ডানতীরে প্রধান বাঁধটিঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সেখানে ভোর ৫টা থেকে ভাঙনরোধে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, এলাকার শ্রমিক ও জরুরিভিত্তিতে ঠিকাদার জিও ব্যাগ, জিও টিউব, বাঁশ ও গাছের গুড়ির পাইলিং করে ভাঙনরোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে নীলফামারীর ডালিয়াস্থ তিস্তা ব্যারেজের ভাটি এলাকা হুমকির মুখে পড়েছে। প্রতি নিয়ম নদী ডান তীরে সরে আসছে। এতে ওই বাঁধ বিধ্বস্থ হলে তিস্তা নদী মূল প্রবাহের গতিপথ ছেড়ে ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছচাঁপানী, জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়ন ও জলঢাকা শহর ছুঁয়ে প্রবাহিত পারে বলে ওই এলাকার বসবাসকৃত মানুষজন শঙ্কায় রয়েছে।

সূত্র মতে, ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর সিকিমে ভয়াবহ বৃষ্টির জেরে বড় বন্যা হয়েছিল তিস্তায়। ওই সময় পলি পড়ে তিস্তায় নাব্যতা কমে যায়। নদী মাঝখানে আর নাই। নদীর দিক পরিবর্তনে কখনও বামতীর, কখনও ডানতীরে সরে যাচ্ছে।

স্থানীয়রা জানায়, পানির তলে শুধু বাড়িঘর নয়, এলাকার কৃষিজমি, ফসল ব্যাপকহারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাসের পর মাস পরিবার নিয়ে বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়ে থাকতে হচ্ছে। আজও অনেক পরিবার বসতঘর সরিয়ে নিতে বাধ্য হলো।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে জানান, সেখানে ১৪০ ফিট দীর্ঘ এক নম্বর স্পার বাঁধ ও ডান তীর প্রধান বাঁধ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। হঠাৎ করে এখানে তিস্তা নদী ডান তীরে দিক পরিবর্তন করে সরে এসেছে।

তিনি আরও জানান, নদীর তীব্র স্রোত আঘাত করছে এখানে। বৃষ্টির মাঝেই  অসংখ্য শ্রমিক নিযুক্ত করে ভাঙন মোকাবেলা করা হচ্ছে। অতিভারী বৃষ্টিপাতে তিস্তার পানি হু-হু করে বৃদ্ধির কারণে তিস্তা নদী ফুঁসে উঠেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত