শত শত বছরের ঐতিহ্যের প্রতীক জামনগরের শাঁখা, জিআই স্বীকৃতির পথে

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৩:০১ পিএম

নাটোরের বাগাতিপাড়ার জামনগর ইউনিয়নের শাঁখারীপল্লীতে এখন ব্যস্ততার চূড়ান্ত সময় পার করছেন শাঁখা কারিগররা। আর ক’দিন পরেই শারদীয় দুর্গাপূজা। এই পূজাকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি চাহিদা বাড়ে শাঁখার। তাই দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন এখানকার কারিগররা। তবে শাঁখা এখন আর শুধু পূজার অলঙ্কার নয়, এটি হিন্দু নারীদের ঐতিহ্য ও শুভলক্ষণ এর প্রতীক। বিবাহিত নারীর হাতে শাঁখা মানে সৌভাগ্যের চিহ্ন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন জামনগরের শাঁখারীরা। সম্প্রতি এই শাঁখাশিল্প “জি আই” পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকায় স্থানীয় কারিগরদের মাঝে তৈরি হয়েছে নতুন আশার আলো। 

জানাযায়, জীবন ও জীবিকার তাগিদে মান্না উপসাগরের তীর থেকে শঙ্খশিল্পীরা প্রথমে বসতি গড়ে তোলে বঙ্গোপসাগরের তীরঘেঁষা বাখেরগঞ্জে। ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁ হতে বাংলার রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরিত করা হয়। নতুন নগর প্রতিষ্ঠার দৃষ্টি ভঙ্গিতে তখন বিভিন্ন পেশার মানুষকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। সুবেদার ইসলাম খাঁ শঙ্খ শিল্পীদের বাখেরগঞ্জ থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে রাজধানী মুর্শিদাবাদে সরিয়ে নিলে ঢাকার গুরুত্ব কমে যায়, আর শঙ্খশিল্পীরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। এর একটি বড় অংশ নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলে। তাদের তৈরি শাঁখা ও গহনা আজও এই অঞ্চলে সমানভাবে পরিচিত ও সমাদৃত। 

শাঁখারীপল্লীর কারিগররা জানান, প্রায় ৬০-৭০ পরিবার বহু বছর ধরে এ পেশায় যুক্ত। মূল উপকরণ শঙ্খ ভারত ও শ্রীলঙ্কা থেকে আমদানি করা হয়। পুরুষ কারিগররা শঙ্খ কেটে বালা, আংটি ও শাঁখার আকৃতি দেন, আর নারীরা নিপুণ কারুকাজে সেটিকে আকর্ষণীয় করে তোলেন। এক জোড়া শাঁখা তৈরিতে খরচ হয় ২শত থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। আর যেগুলোতে স্বর্ণালংকার ব্যবহার করা হয় সেগুলো ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। শাঁখা তৈরি কারখানার মালিক পল্টন কুমার দাস (৫০) জানান, তার বাবা একজন ইমপোর্টার এবং শ্রীলংকা থেকে তারা শাঁখার কাঁচামাল আমদানি করেন, যা চট্টগ্রাম পোর্ট হয়ে দেশে আসে। শাখার বিভিন্ন জাত রয়েছে। কেটে প্রস্তুত করা হলে তাকে কাঁচা শাঁখা, আর কাটা শাখায় ডিজাইন করে তৈরি করা হলে পাকা শাঁখা বলা হয়। কারিগররা বিভিন্ন রকমের শাখা যেমন- পাথর শাঁখা, সোনা শাঁখা, সাদা শাঁখা, কড়ি শাঁখা, মোটা ও চিকন শাঁখা, চূড়া শাঁখা, বেসলেট শাঁখা, মান্তরা শাঁখা ইত্যাদি তৈরি করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনাামগঞ্জ ও চট্টগ্রামে এগুলো বিক্রি হয়। 

 তিনি জানান, নবাবদের আমল থেকে এই শিল্প দেশের এক স্থায়ী ঐতিহ্য হিসেবে চলে আসছে। সরকার এই পণ্যটিকে যেন জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এটাই তার কাম্য।

শাঁখালী পল্লীর একজন কারিগর নিরেন চন্দ্র সেন জানান, এই ব্যবসা তাদের পরিবারে শত বছর ধরে চলে আসছে। তার বাপ-দাদারা এই কাজ করেছেন, তিনি করছেন, এবং ভবিষ্যতে তার ছেলেরা করবেন বরে তিনি জানান।

তিনি বলেন, শঙ্খটা গোটা আসে, এরপর সেটি ভাঙা, কাটা, পিস করা, ঘষামাজা ও ডিজাইন করার কাজ করতে হয়। এক কথায় পাঁচ ধাপের প্রক্রিয়ার পর শঙ্খ তৈরি হয়। তার কাছে হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২ শত পর্যন্ত দামের বিভিন্ন শঙ্খ পাওয়া যায়। তিনি জানান, রংপুর, দিনাজপুর, ঢাকা, খুলনা, সিলেটসহ সারা বাংলাদেশে তাদের শঙ্খ সরবরাহ করতে হয়। আগে পাটায় ঘষে এক দিনে পাঁচ জোড়া শঙ্খ করা যেত, এখন মেশিনে এক দিনে ৫০ জোড়া তৈরি করা সম্ভব। 

শাঁখারী কারিগর সুমতি রাণী জানান, তারা ভাইবোন এবং মা একসঙ্গে মিলে শাঁখা তৈরি করেন। প্রথমে তাদের মহাজনরা কাঁচামাল দিয়ে যান, এবং কাজ শেষে তৈরি শাঁখা মহাজনরা নিয়ে যান। তিনি বলেন, এই কাজের মাধ্যমে তাদের সংসার চলে এবং ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ মেটানো যায়। পূজার সময় তাদের কাজ অত্যন্ত বেশি থাকে। 

শাঁখারী পাড়ার আরেক কারিগর প্রতাপ কুমার ধর জানান, তারা বংশ পরাক্রমায় এ কাজ করে আসছেন তার বাবা করেছেন তারাও করছেন দিদিরাও করছেন। তারা বিভিন্ন রকম ডিজাইনের শঙ্খ তৈরি করে থাকেন। স্থানীয় চায়ের দোকানদার শান্ত কুমার পাল জানান, তিনি প্রায় ৩০-৪০ বছর ধরে এখানে চা বিক্রি করে আসছেন। জন্মের পর থেকেই তিনি দেখছেন এখানে শাঁখা তৈরি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে শাঁখা কিনতে আসে। এখানকার শাঁখা সারা দেশে ছড়িয়ে যায়।

শাঁখারীপল্লীর ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, “ শুধু দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এবার শাঁখাপল্লীতে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার শাঁখাপণ্য বিক্রির আশা করছি। জিআই স্বীকৃতি হলে বিদেশেও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।”

নাটোরের শাঁখারী পল্লীর একজন মহিলা কারিগর ইরানীসেন (৪০) জানান, তিনি গত ২০ বছর ধরে শাঁখারী তৈরি করছেন। তার কাছে ৫শত থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন দামের শাঁখারী পাওয়া যায়। তিনি অনলাইনের মাধ্যমে ব্যবসা করেন থাকেন এবং মানুষের চাহিদা অনুযায়ী তারা শাঁখা তৈরি করেন। বর্তমানে এখানকার অনেক কারিগর অনলাইনে ব্যবসা করছেন এবং এটি ভালোভাবে চলছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবসা হয় আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে। 

সাধারণ ব্যবসায়ী শ্রী রিন্টু কুমার ধর বলেন, তিনি শাঁখারীপল্লী থেকে শাঁখা ও বিভিন্ন সামগ্রী ক্রয় করে সারা দেশ ঘুরে বিক্রি করেন। চাহিদা ও গুণগত মানের ভিত্তিতে এসব পণ্যের দাম নির্ধারিত হয়, যা কখনও কয়েকশ’ টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকাও হতে পারে। তিনি জানান, শাঁখার স্থায়িত্ব কাঁচের মতো ভেঙে যেতে পারে, আবার যত্নে রাখলে ২০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে।

উপজেলার ২ নং জামনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী জানান, গ্রামে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি পরিবার শাঁখা শিল্পের সঙ্গে জড়িত। এরা মূলত নিম্নআয়ের মানুষ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে, প্রায় দেড় থেকে দুই শত বছর আগে থেকেই এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। চেয়ারম্যান হিসেবে তার প্রত্যাশা, এই শাঁখা শিল্প যদি জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তবে তা শুধু তার জন্যই নয়, সমগ্র জামনগরবাসীর জন্য এক বিরাট গৌরব হবে। একইসঙ্গে এটি বাগাতিপাড়া উপজেলা ও নাটোর জেলার জন্যও সুনাম বয়ে আনবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। 

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহীকর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন বলেন, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে শাঁখারীপল্লীর সার্বিক তথ্য সংগ্রহ করেছি। শাঁখাগুলোর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এগুলো জিআই পণ্য হিসেবে বাগাতিপাড়ার নামে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য। আমরা একটি ডকুমেন্টেশনও পাঠিয়েছি। এখন ওগুলো অনুমোদিত হলে বাগাতিপাড়ার শাঁখা জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত